৫০০ বছর আগে ভিঞ্চির আঁকা হৃদপিণ্ড, অ্যানাটমির বই থেকেও নিখুঁত

  • 1
    Share

সাহেব-বাজার ডেস্ক : হাসির সৌন্দর্যের উদাহরণে এখনো সবাই টেনে আনেন ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসাকেই। কে ছিল এই নারী? তা নিয়ে আছে নানান মতবাদ। কেউ বলেন রাজকন্যা ছিলেন মোনালিসা, কেউ বলেন রানি আবার কারো মতে ভিঞ্চির কল্পনায় ছিলেন এই নারী। সে যাই হোক, মোনালিসার ছবিতে ভিঞ্চি নিখুঁত হাসি এঁকেছিলেন। যা কিনা বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় হাসির একটি বলা হয়।

তবে এবার গবেষণায় উঠে এসেছে ভিঞ্চির আরেক আঁকা ছবি। যেটি কিনা হৃৎপিণ্ডের। এটি নাকি এতোটাই নিখুঁত যে,

অ্যানাটমির বইয়ের প্রিন্টের ছবিকেও হার মানায়। যুক্তরাজ্যের বায়োব্যাঙ্কের একটি গবেষণায় উঠে আসে এই তথ্য। এই প্রকল্পে ইএমবিএল এর ইউরোপীয় বায়োইনফরম্যাটিক্স ইনস্টিটিউট (ইএমবিএল-ইবিআই), কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরি, এমআরসি লন্ডন ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস, হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় এবং পলিটেকনিকো ডি মিলানো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সময়টা ১৫১১ সাল। আজ থেকে ৫০০ বছরেরও বেশি আগে। ইতালিতে তখন নবজাগরণের পাশাপাশি শুরু হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। সমস্ত যুগ বির্তনের সময়েই যা হয়। সেইসময় প্লেগের আক্রমণে মারা গেলেন এক চিকিৎসক। তার ছিলেন এক শিল্পী বন্ধু। বন্ধুর প্রয়ানে শিল্পী বন্ধুও শোকাহত।

তবে যখন চিকিৎসক বন্ধুর দেহ ব্যবচ্ছেদের সময় এল। তখন সব গোঁড়ামি সরিয়ে ফেলে সেই ঘটনার সাক্ষী থাকলেন নিজেই। ধর্মীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে যুক্তিবাদী মনন তৈরি করাই তাদের প্রত্যেকের জীবনের ব্রত। অন্যান্য চিকিৎসকরা মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করছেন, শিল্পী তখন তার নোটবুক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আর হৃৎপিণ্ডটা বের করতেই শুরু করে দিলেন স্কেচ।

সেই শিল্পী আর কেউ নন, পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। ভিঞ্চিকে বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ চেনে মোনালিসা, সালভাদার মুন্ডি বা লাস্ট সাপারের মতো ছবির জন্য। কিন্তু এসবের বাইরেও যে তার এক ধরনের বৈজ্ঞানিক মানসিকতা ছিল। তবে সে সবের খবর কেউই তেমন রাখেনি। অনেকের মতে ভিঞ্চিই নাকি তিনি তৈরি করেছিলেন এরোপ্লেন বা বাইসাইকেলের ডিজাইন। এছাড়াও অ্যানাটমির ক্ষেত্রেও তার রয়েছে বিরাট অবদান।

ভিঞ্চির অ্যানাটমি চর্চার কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় ভিট্রুভিয়ান ম্যানের কথা। একটা বৃত্তাকার ক্ষেত্রের মধ্যে মানুষের শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অনুপাত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছিলেন সেখানে। তবে অ্যানাটমির চর্চা সেই একটি ড্রয়িং-এ সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৫০৭-০৮ সাল নাগাদ নতুন একখানি নোটবুক নিয়ে শুরু করেছিলেন অ্যানাটমির চর্চা। আর এই কাজে সবসময় সাহায্য পেয়েছেন চিকিৎসক মার্কান্টোনিও ডেলা টোর-এর কাছ থেকে। তার অপারেশনের সময় পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্কেচ নিতেন ভিঞ্চি। মস্তিষ্ক, খাদ্যনালীর পাশাপাশি এই সময় তার সবচেয়ে বড় কীর্তি সুষুম্নাকাণ্ডের স্কেচ।

তবে এরপর প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন টোর। সেইসময় তার দেহব্যবচ্ছেদের সময় এঁকেছিলেন হৃৎপিণ্ডের স্কেচ। আর এই স্কেচকে ঘিরে ৫০০ বছর ধরে ঘিরে ছিল এক রহস্য। আমাদের চেনা বইতে হৃৎপিণ্ডের ছবি যেমন দেখি, তার থেকে এটা সামান্য আলাদা। এখানে একটা আলাদা পেশির অস্তিত্ব স্পষ্ট বোঝা যায়। সেটা কি শিল্পীর কল্পনা? অন্তত তেমনটাই মনে করতেন অনেকে। তবে সম্প্রতি নেচার প্রত্রিকায় প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছে। এই পেশি একেবারেই কাল্পনিক নয়। বরং মানুষের হৃৎপিণ্ডে সত্যিই অস্তিত্ব আছে এমন ট্রাবেকুলার। ভ্রূণাবস্থাতেই এই পেশির জন্ম হয়। তবে অন্যান্য পেশির আড়ালে তা চাপা পড়ে থাকে। তবে হাইপারটেনশন বা অন্যান্য রোগের ফলে ফুলে উঠতে পারে এই পেশি। তখন খালি চোখেও তার অস্তিত্ব বোঝা যায়।

সাম্প্রতিক এই আবিষ্কার নিঃসন্দেহে শিল্পীর কৃতিত্বকে বুঝতে সাহায্য করবে। তবে তারপরেও, সেইসময়ের ধর্মান্ধ সমাজে শবদেহ ব্যবচ্ছদ যখন ছিল রীতিমতো পাপ, তখন একজন শিল্পীর এমন কাজের মূল্যায়ন সত্যিই কঠিন। শিল্পকলার আড়ালে সেই বৈজ্ঞানিক মানসিকতা আদৌ প্রচারের আলো পাবে কিনা কেউ জানে না।

এসবি/জেআর

  • 1
    Share