সড়কে এক হাতে সংকেত, অন্য হাতে ইফতার


সাহেব-বাজার ডেস্ক: বিদায় মাহে রমজান। আগামীকাল শুক্রবার (১৪ মে) পবিত্র ঈদুল ফিতর। রমজানের শেষ ১০ দিন রাজধানীতে ছিল কর্মব্যস্ততা। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে যানজটও। একদিকে মহামারি করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে গ্রীষ্মের তীব্র গরম বা হঠাৎ বৃষ্টি।

এর মধ্যেই মুখে মাস্ক পরে দায়িত্ব পালন। ঠিক সন্ধ্যা নামার আগে মানুষের যখন ঘরে ফেরার স্রোত নামে, তখন যানজট আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে। তবে ঘরমুখো মানুষ যেন ইফতারের আগেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে পারে, সেজন্য নীরবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেন তারা। সরব সড়কের এই নীরব কর্মীরা হলেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা।

প্রিয়জনদের সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের ইফতার করা হয় না। ইফতারের সময়ও তাদের ডিউটি চালিয়ে যেতে হয়। দায়িত্বের ফাঁকে কোনোভাবে রাস্তায়ই সেরে নিতে হয় ইফতার। আবেগ এড়িয়ে দায়িত্ব, দেশপ্রেম ও পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে দিনের পর দিন তাদের এ কষ্ট মেনে নেয়া।

তেমনি একজন আশফাক আহমেদ। ইফতারের আগ মুহূর্তে পরিবার-পরিজন তার জন্য অপেক্ষা করলেও হার মেনেছেন দায়িত্বের কাছে। আদরের মেয়ের সঙ্গে ইফতার না করতে পারলেও তৃপ্তি খুঁজে পান নিরাপদে অন্যদের বাড়ি পৌঁছে দেয়ার কাজ করে।

শুধু আশফাক নন, রাজধানীর মোড়ে মোড়ে চোখে এই চিত্র দেখা যায়। নিজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে ইফতার করতে না পারলেও খুব একটা দুঃখ নেই এই পুলিশ সদস্যদের।

তারা বলছেন, বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তানের বাইরে পুলিশের সহকর্মীদের নিয়েও একটি বড় পরিবার তাদের। কম সময় হলেও এই পরিবারে মিলেমিশে ইফতার করার মধ্যে আনন্দ রয়েছে।

রাজধানীর বেশ কয়েকটি মোড় ঘুরে দেখা গেছে, ডিউটিতে থাকা ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের ইফতারের জন্য আলাদা বরাদ্দ রয়েছে। বরাদ্দের মধ্যে থাকে খেজুর, ছোলা, মুড়িসহ বেশ কয়েকটি ইফতার আইটেম এবং একটি করে পানির বোতল। তবে বরাদ্দে পাওয়া ইফতারসামগ্রীর সঙ্গে নিজেদের পকেটের টাকায় আরও কিছু খাবার যুক্ত করেন তারা।

১১ মে ইফতারের আগ মুহূর্তে রাজধানীর শ্যামলী মোড়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন ট্রাফিক পুলিশের কনস্টেবল জাকির হোসেন। তার চোখে-মুখে ক্লান্তি স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘রোজা রাখছি। একটু টায়ার্ড (ক্লান্ত)। এভাবেই কাজের মধ্যেই ইফতার করতে হয়।’

আসাদগেটে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্য রমজান আলী বললেন, ‘ইফতার দাঁড়াইয়া করব না বইসা করব, তা নির্ভর করে গাড়ির ওপর। গাড়ির চাপ থাকলে দাঁড়াইয়া ইফতারও করি, কাজও করি।’

বিজয় সরণি মোড়ে সার্জেন্ট শাহীন আলমও জানালেন একই কথা। আর ব্যস্ততম কারওয়ান বাজার মোড়ে সার্জেন্ট সিরাজুম উদ্দিন যানজট দেখিয়ে বলেন, ‘দেখেন কেমন যানজট। আরামে পুলিশ বক্সে গিয়া ইফতার করলে তো প্যাঁচ লাইগা যাবে।’

প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা এবং দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দুই শিফটে দায়িত্ব পালন করেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। দুপুর দুইটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশদের জন্যই মূলত সরবরাহ করা হয় ইফতারসামগ্রী। একদিন পরপর বিকেলে দায়িত্ব পড়ে তাদের।

জাতীয় সংসদের সামনে দায়িত্বে থাকা পুলিশ কনস্টেবল হাসান আলী বলেন, ‘১০-১২ বছর ধরে এই পেশায় আছি। মানে ধরে নেন- এ সময়ে জীবনের অর্ধেক ইফতার হইছে রাস্তায় রাস্তায়।’

গুলশান এলাকার কনস্টেবল রাজীব হাসান বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে ইফতার করে দেখে যান, আমরা কেমনে ইফতার করি। আপনি শুধু ইফতারের সময় গুলশান আর মহাখালী এলাকায় ঘুরে যাবেন। আমাদের ইফতারের সময়টা কতটা কষ্টের তা আরও বুঝতে পারবেন।’

গুলশান-বাড্ডা লিঙ্ক রোড মোড়ে যেতে যেতেই ইফতারের সময় হয়ে যায়। ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা একে একে হাত-মুখ ধুয়ে নিচ্ছেন। কয়েকজন তখনও রাস্তায়।

ইফতারের ব্যাপারে জানতে চাইলে ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক জামাল উদ্দিন মুচকি হেসে বলেন, ‘প্রায় সময় এক হাতে ইফতারের খাবার খাই। আরেক হাত দিয়ে বাঁশি বাজাই। রাস্তায় ইফতার করতে কষ্ট লাগে। তবে সবাই মিলে ইফতার করি, এটাতেও একটা আনন্দ আছে। এটা অন্য রকম জীবন।’

রমজানের শুরু থেকে বিকাল বেলায় রাস্তায় অতিরিক্ত যানবাহন ও যাত্রীদের চাপ থাকে বলে জানিয়েছেন ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বশীলরা। ঘরমুখো মানুষের ফেরার পথে যানজট নিরসন করে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে যেন মানুষ বাড়ি ফিরতে পারে, সে ব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ।

নগরে চলমান মেট্রোরেলের কাজ, ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি, বিশৃঙ্খল যান চলাচল—এগুলো যানজট নিরসনে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই বাধাগুলো অতিক্রম করে ঘরমুখো মানুষের চলাচল অনেকটাই স্বাভাবিক, নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ।

রাজধানীর একটি ট্রাফিক পয়েন্টে দায়িত্বরত একজন পুলিশ সদস্য জানান, সকল উৎসবে সবাই যখন তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দ করে, আমরা তখন সবকিছু ভুলে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করি। ট্রাফিক পুলিশের ইফতারিতে তেমন কোনো সুস্বাদু খাবার থাকে না। খাবারের তালিকায় থাকে সামান্য ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপি ও পানি।

শুধু ইফতার নয়, ঈদের জামাতেও নামাজ পড়তে পারেন না অনেক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য। কোনো একটি ঈদ জামাতের পাশেই রাস্তার মোড়ে দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের। ইউনিফর্মের আড়ালে ট্রাফিক পুলিশও একজন মানুষ। অথচ সেই মানুষটির গায়ে ঈদের দিনেও থাকে না নতুন জামা, তার গায়ে জড়ানো থাকে সেই দায়িত্বের ইউনিফর্ম।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) ইফতেখায়রুল ইসলাম বলেন, ‘করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই পুলিশের প্রতিটি সদস্য তাদের নিজেদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চটুকু দেয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমান সময়ে তাপদাহ, মাহে রমজান ও করোনার আক্রমণ এসব দিক থেকে ট্রাফিক পুলিশের চাকরি কিছুটা কষ্টদায়ক।’

তিনি বলেন, ‘রমজানে ডিএমপির প্রতিটি ট্রাফিক বিভাগ থেকে আলাদা আলাদা ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একইসঙ্গে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নিজের মতো করে যতটুকু দায়িত্ব পালন করা যায়, যথাসম্ভব তা পালন করছেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা।’

এসবি/জেআর