স্বাধীন মত প্রকাশ ও স্বচ্ছ নির্বাচন টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত

  • 3
    Shares

।। মনোয়ারুল হক ।।

অনুন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে নতুন একটি রাজনৈতিক দর্শন প্রচার করা হচ্ছে। এই দেশগুলোতে সর্বতোভাবে দুর্বল গণতন্ত্র এবং গণমাধ্যম প্রায় ক্ষেত্রেই শাসকদের নিয়ন্ত্রণে। এই নিয়ন্ত্রণের নানান কায়দা আছে শাসকরা গণমাধ্যমকে জানান অনৈতিক সুবিধা প্রদান আর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তাদের অনুকূলে রাখেন। এ ধারা থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে দেশগুলোও মুক্ত নয়।

সাম্প্রতিক কালে ভারতের রিপাবলিক টিভি নামক একটি টিভি স্বত্বাধিকারীকে বোম্বের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, টিআরপি সংক্রান্ত জালিয়াতি, কিন্তু মূলত ঘটনাটি ছিল; ওই টেলিভিশন চ্যানেলে মহারাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নানান তথ্য প্রকাশ করতো।

ভারতীয় উপমহাদেশের অপর দুটি দেশ বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের অবস্থা, এসব দেশেও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণবাদী দর্শন প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে । পর্দার অন্তরাল থেকে সেনা শাসন চলছে পাকিস্তান দেশটিতে “উন্নয়নের জন্য।

ক্ষমতার ধারাবাহিকতা দরকার” তার প্রধান কারণ; আলোচিত দেশগুলোর উন্নয়ন কর্মসূচি জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে শতভাগ প্রণয়ন হয় না। অথচ টেকসই উন্নয়নের এর অন্যতম শর্ত হচ্ছে সমাজের উন্নয়নকে টেকসই উন্নয়নে রূপান্তরিত করে গণতন্ত্রহীনতা দূর কড়া অথবা গণমাধ্যমের অধিকার রক্ষা।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার স্বল্পতা এবং তার উপর নিয়ন্ত্রণের ফলে এই উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো সব সময় দলীয় মত-নির্ভর হয়। অর্থাৎ, এ উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোতে বিরোধী দল কিংবা ভিন্নমতের কোন অংশীদারিত্ব থাকে না। এর ফলে যেটা হয়, পূর্বের সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের গৃহীত উন্নয়ন কর্মসূচি বাতিল হয়ে যায়, আর নতুন চিন্তা সামনে আসে, যা আমরা আমাদের দেশে একাধিকবার দেখেছি।

এদেশে উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যাপক পরিবর্তন কিংবা স্তিমিত হয়ে যাওয়ার হাত ধরেই এই মতবাদ জোরালো হচ্ছে যে, উন্নয়নের স্বার্থে সরকারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার নির্বাচন ব্যবস্থা প্রচলিত হয়েছে ।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে এধরনের ঘটনা উপমহাদেশের বাইরেও উদাহরণ হিসেবে দেখতে পাওয়া যায়। যেমন; মালয়েশিয়ায় ঘটেছে প্রাক্তন সরকার বিদায় হওয়ার পরে মাহাথির মোহাম্মদ আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই পূর্ববর্তী সরকারের একাধিক প্রকল্প বাতিল করেন।

এরকম নীতি মালয়েশিয়া ছাড়াও শ্রীলংকা-পাকিস্তান দেখতে পাওয়া যায়। বিষয়টা উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য গণতন্ত্রকে সুসংহত করার পরিবর্তে গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার যে ধারা পৃথিবীব্যাপী দেখা যায় তারই পরিণতি।

পৃথিবীর কোথাও ভালো কিছু হয়নি ২০০৬-০৭ সনে সেই মহাবিতর্ক তুলে বাংলাদেশের ক্ষমতার সামরিকায়ন হয়েছিল। এবং সামরিক সরকারের দ্বারা মানুষও প্রভাবিত হয়েছিল।

রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে একের পর এক দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু সেই দুই বছরের শাসন শেষে যখন একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর সেই দুই বছরের সেনাশাসনের অন্ধকার দিকগুলো সামনে আস্মাতে থাকে।

আমাদের দেশে ২০০৬ এর সরকার ব্যবস্থা দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা প্রশ্ন তুলে এমন একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করেছিল; যে নির্বাচন কমিশনের প্রতি বিরোধী দলের কোনো আস্থা ছিল না। বিচারপতি এম এ আজিজ ছিলেন সেই নির্বাচন কমিশন প্রধান। বিচারপতি আজিজের নেতৃত্বকে নিয়ে বিতর্কিত হয়ে পড়ে তখনকার নির্বাচন কমিশন এবং বিচারপতি যে বিএনপি সমর্থিত ব্যাক্তি ছিলেন তা প্রমাণিত হয় ২০০৯ সালে।

এই বিচারপতি ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিএনপি কর্তৃক মনোনীত, যিনি ২০০৯ সালের নির্বাচনে বিএনপি’র মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তেমনিভাবে, আজও আমাদের নির্বাচন কমিশন নানাভাবে বিতর্কিত হয়ে পড়ছে।

পৃথিবীর পৃথিবীর বহু দেশে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে ধারাবাহিক সরকার প্রয়োজন এমন ধারণা আবার খুঁজে পাওয়া যায় না। উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া যেকারণে সরকারের উচিত সর্বস্তরের মতামতের ভিত্তিতেই তা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এতে করে, সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে উন্নয়নের উদ্যোগ বাতিল হয় না।

আর আমাদের দেশে সেতুর নাম, প্রতিষ্ঠাণের নাম ইত্যাদি ইত্যাদিও পরিবর্তন হয় সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে। তবে মনে রাখা দরকার, সামাজিক উন্নয়নের পূর্বশর্তগুলো প্রয়োগ না করলে উন্নয়ন কখনো টেকসই হবে না। কারণ তখন উন্নয়ন হয় নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে। অপ্রয়োজনীয়’ উন্নয়ন প্রকল্পও প্রাধান্য পায়। যেমনটি আমরা দেখেছি মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে।

তাই সমাজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার, যা রক্ষিত হলে উন্নয়নের ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত হয়।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক


  • 3
    Shares