রাজশাহীর সাড়ে ছয় হাজার ছাত্রীর বাল্যবিয়ে

  • 71
    Shares

নিজস্ব প্রতিবেদক : সবে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেছিল পাপিয়া আকতার। করোনাকালে যখন স্কুল বন্ধ হয়ে গেল, তার কিছুদিন পরই বাবা রেজাউল করিম মেয়েটির বিয়ের আয়োজন করলেন। এখন পাপিয়ার কোলে এক বছরের পূত্রসন্তান। স্কুল খুলেছে, কিন্তু পাপিয়া আর স্কুলে যায় না। স্বামীর সংসার আর সন্তান সামলাতেই ব্যস্ত সে।

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কলিকাপুর নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলো পাপিয়া। স্কুলের পাশেই তাঁর বাবার বাড়ি। এখন পাপিয়া মাঝে মাঝে শ্বশুর বাড়ি থেকে বাবার বাড়ি বেড়াতে আসে। বাড়ির পাশেই কোলের সন্তান নিয়ে বসে সহপাঠীদের স্কুলে যেতে দেখে। সহপাঠীদের কেউ কেউ পাপিয়ার কাছে গিয়ে তাঁর ছেলেকে কোলে নেয়। আদর করে। কিন্তু পাপিয়ার আরও অনেক বান্ধবীর খোঁজ নেই। তাঁরাও বাল্যবিয়ের শিকার। এখন তাঁরাও আর স্কুলে আসতে পারে না।

কালিকাপুর নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সেলিনা আকতার বানু জানান, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করোনা মহামারি শুরুর আগে তাঁর স্কুলে ছাত্রীর সংখ্যা ছিলো ৭০ জন। এঁদের মধ্যে ৩০ জনই বাল্যবিয়ের শিকার। এর মধ্যে ১০ জন বিয়ের পরও স্কুলে আসছে। ২০ জন আসে না। স্কুলটিতে এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ জন। সেলিনা আকতার বানু বলেন, ‘একেবারেই গ্রাম তো। অভিভাবকদের বুঝিয়েও কাজ হয় না। স্কুল বন্ধ হওয়ার পরই একে একে ৩০ জনের বিয়ে হয়ে গেল।’

করোনা মহামারির প্রায় দুই বছরে রাজশাহীতে মাধ্যমিক পর্যায়ের সাড়ে ছয় হাজারের বেশি ছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। এঁদের কেউ কেউ স্কুলে এলেও বেশিরভাগই ঘর-সংসার সামলাতে ব্যস্ত। পাপিয়ার মতো সন্তানও জন্ম দিয়েছে কেউ কেউ। সম্প্রতি প্রতিটি নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্কুল থেকে বাল্যবিয়ের শিকার শিক্ষার্থীদের তালিকা নিয়েছেন রাজশাহী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দীন। তবে প্রাথমিকের পরিস্থিতি কী সে তথ্য সংগ্রহ করেনি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়।

জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, করোনাকালের শুরুতে ৫৪৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিলো ২ লাখ ১২ হাজার ১৬৩ জন। এর মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ছিলো ১ লাখ ৩ হাজার ৪০৭ জন। এই ছাত্রীদের মধ্য থেকে ৬ হাজার ৫১২ জনের বিয়ে হয়ে গেছে। এর ফলে রাজশাহীতে বাল্য বিয়ের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ দশমিক ২৯ শতাংশে। জেলায় সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭৮৫ জনের বিয়ে হয়েছে বাগমারা উপজেলায়। এখানে মোট ছাত্রী ছিলো ২১ হাজার ৩৯০ জন। বাগমারায় বাল্য বিয়ের হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে। ৯ উপজেলার মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ।

এ ছাড়া রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় ৩ হাজার ৪৫৭ জন ছাত্রীর মধ্যে ১২১ জন, চারঘাটে ৯ হাজার ৩১ জনের মধ্যে ৬৮৪ জন, দুর্গাপুরে ৬ হাজার ৬০২ জন ছাত্রীর মধ্যে ৪৯০ জন, গোদাগাড়ীতে ১২ হাজার ৯৯২ জন ছাত্রীর মধ্যে ৮৭৩ জন, মোহনপুরে ৬ হাজার ৫৬০ জন ছাত্রীর মধ্যে ৫০১ জন, পবায় ১১ হাজার ২৯৬ জনের মধ্যে ৮৩০ জন, পুঠিয়ায় ৭ হাজার ৫৮৭ জনের মধ্যে ৪৬৫ জন, তানোরে ৮ হাজার ৪৪২ জনের মধ্যে ৬৮০ জন এবং রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়া থানা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের অধীনে থাকা ৭ হাজার ২৫০ জনের মধ্যে ১৯ জন ও মতিহার থানার অধীনস্থ ৮ হাজার ৮০০ জনের মধ্যে ৬৪ জন ছাত্রী বাল্য বিয়ের শিকার হয়েছে।

বাঘায় বাল্য বিয়ের হার ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ, চারঘাটে ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ, দুর্গাপুরে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ, গোদাগাড়ীতে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ, মোহনপুরে ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ, পবায় ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ, পুঠিয়ায় ৬ দশমিক ১২ শতাংশ, তানোরে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ, বোয়ালিয়ায় ০ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং মতিহারে ০ দশমিক ৭৩ শতাংশ ছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে।

বাগমারা উপজেলার মচমইল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ মো. আলী হাসান জানান, তাঁর স্কুল থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে এ রকম তিনজন শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। সামনে পরীক্ষা, তাই তাঁরা স্কুলে আসছে। তবে দুর্গাপুরের দাওকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাফিজুর রহমান জানান, তাঁর স্কুলের বাল্য বিয়ে হওয়া ছাত্রীদের কেউ স্কুলে আসে না। তাঁর স্কুলে নবম শ্রেণির সাতজন এবং দশম শ্রেণির ছয়জন ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে। এঁরা খুব একটা মেধাবী ছিল না বলে প্রধান শিক্ষকের মন্তব্য।

তবে দুর্গাপুরের গোপালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজাদ আলী কারিগর জানান, তাঁর স্কুলের আটজন ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে। এঁদের চারজনই অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলো। তিনি বলেন, মুখচেনা যেসব ভালো শিক্ষার্থীর নাম সামনে এসেছে, কেবল তাঁদেরই নামের তালিকা করে শিক্ষা অফিসে পাঠানো হয়েছে। খুঁজতে গেলে আরও পাওয়া যাবে। করোনাকালে ছাত্রীদের বাল্যবিয়ে ঠেকাতে স্কুলের পক্ষ থেকে কোন কার্যক্রম ছিলো না বলেও জানান প্রধান শিক্ষক আজাদ আলী কারিগর।

রাজশাহী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দীন বলেন, কতজন ছাত্রীর বাল্য বিয়ে হয়েছে তা ঊর্দ্ধতন কোন কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছে চায়নি। তবে বিষয়টা জেনে রাখার জন্য তিনি নিজে থেকেই এ উদ্যোগ নেন। সে অনুযায়ী স্কুলে স্কুলে তথ্য চাওয়া হয়। সে তথ্য সম্প্রতি পাওয়া গেছে। এতে বাল্যবিয়ের এ ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ‘বিয়ের পরও কেউ কেউ স্কুলে আসে, যাঁদের সামনে এসএসসি পরীক্ষা। এর নিচের ক্লাসের যাঁদের বিয়ে হয়েছে, তাঁদের বেশিরভাগই আসে না।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুস সালাম বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রীদের বাল্যবিয়ে কম হয়। সে কারণে আমরা এ রকম তথ্য সংগ্রহ করিনি। এখন আমাদের স্কুলে শিক্ষার্থীদের ৮০ শতাংশ উপস্থিতি। বাকি ২০ শতাংশ একদিন আসে, আরেকদিন আসে না। হয়তো কেউ একেবারেই আসে না। কারও বাল্য বিয়ে হয়েছে কি না সে তথ্য আগামী পরীক্ষার সময় পাওয়া যাবে।’

এসবি/আরআর/এআইআর


  • 71
    Shares