সোনা ফেলে সবজির কাছে পুলিশ

  • 6
    Shares

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র সাহেববাজার এলাকার স্বর্ণপট্টিতে প্রতিরাতে পুলিশের একটি টহল দল থাকার কথা। কিন্তু ফাঁড়ি থেকে বেরিয়ে দলটি সোজা চলে যায় মাস্টারপাড়া কাঁচাবাজারে। সেখানে কাঁচামাল নিয়ে আসা প্রতিটি ট্রাক, মিনি ট্রাক, ভুটভুটি টেম্পু থেকে তোলা হয় চাঁদা। এমন চাঁদা আদায় রাতভর চলতে থাকে। মাঝে মাঝে দলটি স্বর্ণপট্টি ঘুরে আসে।

পুলিশের এই টহল দলটি নগরীর মালোপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির। জানতে চাইলে ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইফতেখার মো. আল-আমিন বলেন, ২০১৬ সালে একটা দুর্ঘটনার পর সিদ্ধান্ত হয় মালোপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির একটি টহল দল প্রতিরাতে স্বর্ণপট্টিতেই থাকবে। দলটি আর কোথাও যাবে না, কিন্তু চাঁদা তোলা তো দূরের কথা; স্বর্ণপট্টি ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়াটাই তাদের জন্য অপরাধ। বিষয়টির আমি সত্যতা খুঁজব। ঘটনা সত্য হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব।

গত কয়েক রাতে সরেজমিনে মাস্টারপাড়া কাঁচাবাজারে গিয়ে ব্যবসায়ী এবং গাড়ির চালক-হেলপারদের সঙ্গে কথা বলে পুুলিশের এই দলটির চাঁদা তুলে নিয়ে যাওয়ার সত্যতা পাওয়া গেছে। মাস্টারপাড়া কাঁচাবাজারে প্রায় শতাধিক সবজি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, আলুসহ অন্যান্য কাঁচামালের আড়ৎ রয়েছে। রাত ১১টার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কাঁচামাল বোঝাই গাড়িগুলো এখানে ঢুকতে থাকে। রাতে রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলা থেকেও ব্যবসায়ীরা গাড়ি নিয়ে এখানকার আড়তগুলোতে মালামাল নিতে আসেন। ফলে সারারাত বাজারটি সরগরম থাকে। ভোর হলেই আড়তগুলোর কেনাবেচা শেষ হয়। এরপর রাস্তার ওপরেই বসে খুচরা ব্যবসায়ীদের দোকানপাট। সন্ধ্যা পর্যন্ত বাজারটি জমজমাট থাকে।

গত শুক্রবার (০১ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া থেকে এখানকার এক আড়তে ১০০ বস্তা আলু আনে একটি মিনি ট্রাক। রাত সাড়ে ১১টার দিকে বস্তাগুলো যখন নামানো হচ্ছিল তখন ট্রাকেই বিশ্রাম করছিলেন চালক-হেলপার। তারা জানালেন, তাদের গাড়ি ঢোকার পরপরই পুলিশ ৫০ টাকা নিয়ে গেছে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ভুটভুটি টেম্পু দেখিয়ে তারা জানালেন, ভুটভুটির চালক পুলিশকে ১০ টাকা দিচ্ছিলেন। কিন্তু পুলিশ ২০ টাকার কম নেয়নি।

নওগাঁর মান্দা থেকে ২৪ বস্তা আলু আনা একটি পিকআপের চালক জানালেন, পুলিশের ওই সদস্য চা খাওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে ২০ টাকা নিয়ে গেছেন। ওই চালক জানান, তিনি প্রথমবারের মতো এসেছেন। রাস্তায় আসার পথে দুই জায়গায় পুলিশকে টাকা দিয়েছেন। কাঁচাবাজারে ঢুকে ভেবেছিলেন আর কাউকে টাকা দিতে হবে না। কিন্তু পুলিশ এসে তাকে বলেছে, এখানে যারা আসে তারা প্রত্যেকে পুলিশকে ‘চা খেতে’ দেয়। এটাই নিয়ম।

আরও বেশ কয়েকজন চালক-হেলপারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যারা এই বাজারে একবার এসেছেন তারা সবাই জানেন যে পুলিশকে টাকা দিতে হয়। চা খাওয়ার নাম করেই পুলিশ টাকা নিয়ে যায়। যারা বাজারটিতে নিয়মিত আসেন তাদের সঙ্গে পুলিশের কোন কথাও হয় না। পুলিশ সামনে এসে দাঁড়ালেই তারা টাকা বের করে দেন। পুলিশ চলে যায়। নতুনদের সঙ্গে পুলিশের কথা হয়। তখন পুলিশ তাদের বলে, চা খাওয়ার জন্য তারা টাকা নেন।

তবে শুক্রবার রাতে সাতক্ষীরার ভোমরা থেকে আদা ও হলুদ নিয়ে আসা এক ট্রাকচালক উল্টো চাঁদা নিতে আসা পুলিশ সদস্যের কাছেই চা খেয়েছেন। গল্পটা শোনালেন ওই চালক নিজেই। তার বাড়ি বগুড়ার শাহজাহানপুরে। তিনি জানালেন, ট্রাক নিয়ে তিনি কাঁচাবাজারে ঢুকলেই মাস্ক পরা এক পুলিশ সদস্য এসে তার কাছে চা খাওয়ার জন্য ১০০ টাকা চান। তিনি তাকে ৫০ টাকা দেন। কিন্তু ওই পুলিশ সদস্য আরও ৫০ টাকা চান। এই কথোপকথনের সময় ওই পুলিশ সদস্যের কণ্ঠ তার কাছে পরিচিত মনে হয়। চালক তখন বলেন, ‘আপনাকে পরিচিত মনে হচ্ছে। মাস্ক নামান।’ পুলিশ সদস্য মাস্ক নামালে দেখেন, তিনি আগে ওই চালকের এলাকার একটি পুলিশ ফাঁড়িতে ছিলেন। তখন তার সঙ্গে পরিচয় ছিল। ওই চালক বলেন, ‘তাকে চিনতে পেরে আমি বলি- আপনি আমার কাছে টাকা চান! তখন তো তিনি লজ্জা পেয়ে যান। এরপর আমাকেই নিয়ে গিয়ে চা খাওয়ান। তবে আগে নেয়া ৫০ টাকা অবশ্য ফেরত দেননি।’

পুলিশের এমন চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে মহানগর পাইকারী কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফাইজুল ইসলাম বলেন, রাতে টহল পুলিশের কথা কী বলব! দিনেই তো হাজার হাজার মানুষের সামনে ট্রাফিক পুলিশ টাকা নিয়ে যায়। কিছু তো বলতে পারব না। বললেই ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করে দেবে। নিয়ে গিয়ে জেলে ঢুকাবে। আপনারাই তদন্ত করেন। প্রকাশ করেন।

স্বর্ণপট্টি ছেড়ে পুলিশ অন্য কোথাও যাওয়ায় দোকানপাটের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির রাজশাহী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোখলেসুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা খুব অনিরাপদ। নাইটগার্ডের কাছে শুনতে পাই- পুলিশ সারারাত থাকে না। হয়ত এক সময় এলো, একঘণ্টা থেকে অন্যদিকে গেল। এভাবে রাতে কয়েকবার আসে। এভাবেই চলে।

জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র গোলাম রুহুল কুদ্দুস বলেন, রাতে পুলিশের টহল দলটা স্বর্ণপট্টিতেই থাকে। আমি নিজে কয়েকবার গিয়ে দেখেছি। সেই দল স্বর্ণপট্টি ছেড়ে কাঁচাজাবারে যায় কি না তা জানা নেই। এ রকম হলে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এসবি/আরআর/এমই


  • 6
    Shares