সেনারা হিমশিম খাচ্ছে রণকৌশল বদলেও


সাহেব-বাজার ডেস্ক : বাংলাদেশের প্রতিবেশী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমারে সংঘাতের বিস্তৃতি আরও বাড়ছে। সংঘাত দমনে রাজধানী নেপিদোসহ কিছু এলাকায় কারফিউ আরোপ করে এবং রণকৌশল বদলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী।

সম্প্রতি দেশটির সীমান্ত অঞ্চলে চলা সংঘাতের আঁচ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পড়ায় ও হতাহতের ঘটনা ঘটায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে গেছে ঢাকা। এরই মধ্যে ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে এক মাসের মধ্যে চারবার ডেকে সতর্ক করাসহ জাতিসংঘে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে বাংলাদেশ।

এ ছাড়া বিদেশি কূটনীতিকদের কাছেও পরিস্থিতি তুলে ধরে সাহায্য চেয়েছে ঢাকা। ফলে মিয়ানমারে সংঘাত নিয়ে আবার আলোচনা হচ্ছে আন্তর্জাতিক স্তরে। প্রশ্ন উঠেছে- দেশটিকে বিভিন্ন দেশের অস্ত্র সহযোগিতা নিয়েও। মিয়ানমারে চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতি নিয়ে বিবিসি এক বিষদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

এতে বলা হয়, মিয়ানমারের আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সামরিক বাহিনী বা সরকারের সংঘাতের ইতিহাস পুরনো হলেও এখন সেটি আরও বিস্তৃত হয়ে উঠেছে। আদিবাসী বা বিচ্ছিন্নতাপন্থি গ্রুপগুলোর সঙ্গে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে শুরু করেছে গণতন্ত্রপন্থি যোদ্ধারা। সীমান্ত বা দূরবর্তী অঞ্চলগুলোয় একসময় সংঘাতপ্রবণ হলেও এখন সেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলেও। পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, এখন যে অবস্থা চলছে, তাতে অচিরেই দেশটি পুরাদস্তুর গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।

মিয়ানমারের এ সংঘাতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও ভারতেও। বাংলাদেশের ঘুমঘুম ও উখিয়া সীমান্ত এলাকায় অব্যাহত গোলাগুলির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে মিয়ানমার থেকে অনেক মানুষ পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। দেশজুড়ে সংঘাত পরিস্থিতিতে রাজধানী নেপিদো এবং আশপাশের শহরগুলোয় রাতে কারফিউ জারি করেছে সামরিক জান্তা।

মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত শহরে চলাফেরা করা যাবে না। সেই সঙ্গে চারজনের বেশি একত্র হওয়া যাবে না। কোনোরকম বিক্ষোভ বা প্রকাশ্য বক্তব্য দেওয়া যাবে না। থাইল্যান্ডভিত্তিক মিয়ানমারের সংবাদপত্র দ্য ইরাবতি জানিয়েছে, কারফিউয়ের পাশাপাশি রাজধানীতে বাঙ্কার তৈরি করছে সামরিক বাহিনী। এ ছাড়া পুলিশের নতুন নতুন চৌকি তৈরি করা হয়েছে এবং বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তারক্ষীদের সংখ্যা। বিশেষ করে যেসব এলাকায় সামরিক বাহিনীর সদস্য বা পরিবার বসবাস করে, সেসব এলাকায় চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

ইরাবতির খবরে আরও বলা হয়, সহিংসতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের শীর্ষ সাতটি সশস্ত্র জাতিগত গোষ্ঠীর সদস্যরা ওয়া রাজ্যের পাংসাংয়ে গতকাল বৈঠক করেছে। কোভিড মহামারীর পর এই প্রথম এসব গোষ্ঠীর নেতারা একত্রে বৈঠকে বসছেন। এসব গোষ্ঠীর প্রায় ৩০ হাজার সদস্য রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আরাকান আর্মির একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রয়োজনের কারণেই তারা বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন এবং সেখানে মূল লক্ষ্য হবে নিজেদের মধ্যে একতা আরও বৃদ্ধি করা।

বিবিসির বার্মিজ সার্ভিস জানিয়েছে, এখন উত্তর রাখাইন রাজ্য, চীন রাজ্য, শান ও কাচিন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছে সেনাবাহিনী। তারা ভারী অস্ত্র ও ট্যাংকের সহায়তা অনেকগুলো শহরে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। সেনারা সেখানকার একাধিক গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে এবং গ্রামে গ্রামে অভিযান চালাচ্ছে। সাধারণ জনগণের ওপর সামরিক বাহিনীর ভারী অস্ত্র ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সামরিক সরকারের রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যেখানে সম্প্রতি এ হামলার ঘটনা ঘটেছে, সেখানকার বেশিরভাগ মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ বার্মান জাতিগোষ্ঠীর সদস্য। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীতে এই জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যাই বেশি। ফলে এদের মধ্যে থেকে বিদ্রোহী তৎপরতা শুরু হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে সামরিক সরকারের প্রতি তাদের মনোভাব বদলে যাচ্ছে।

আরাকান আর্মি দাবি করেছে, মিয়ানমারের একশ জনের বেশি সৈনিক ও অফিসার পক্ষ ত্যাগ করে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জন অফিসার রয়েছেন। আবার সেনাবাহিনী দাবি করেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত এলাকা থেকে আরাকান আর্মির কয়েকটি ঘাঁটি তারা দখল করে নিয়েছে। যদিও বিবিসির পক্ষ থেকে এসব তথ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে রাখাইনের মংডু ও পালেতয়া শহর ঘিরে সড়ক এবং নৌপথ অবরুদ্ধ করে রেখেছে সেনাবাহিনী। ফলে সেসব এলাকায় খাবার ও জরুরি সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব পিসের তথ্যানুযায়ী, মিয়ানমারের সহিংসতা এখন প্রায় একটি গৃহযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সেনাবাহিনী একের পর এক গ্রাম নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে জাতিগত বাহিনীগুলা ও পিডিএফ আরও বেশি এলাকায় নিয়ন্ত্রণ পাচ্ছে, তাদের সামর্থ্য- যোগাযোগ আর সক্ষমতা ও বাড়ছে। অনেক এলাকায় সরকারি শাসন ভেঙে পড়েছে। এর মধ্যেই ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করতে চায় সামরিক জান্তা। এর আগে তারা দেশে নিজেদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে বলে মনে করে ইনস্টিটিউট অব পিস।

এদিকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অস্ত্র সংগ্রহের ডিলার ড. তুন মিন লাতকে মাদক ও অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করেছে থাইল্যান্ডের পুলিশ। গত সপ্তাহে রয়েল থাই পুলিশ দেশটির তিন নাগরিকসহ মিয়ানমারের ব্যবসায়ী ড. তুনকে গ্রেপ্তার করে। থাই পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকালে তাদের কাছ থেকে ৫০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের বিভিন্ন প্রকারের ওষুধ ও সামগ্রী জব্দ করা হয়।

ড. তুন স্টার স্যাফায়ার গ্রুপ অব কোম্পানির মালিক, যা মিয়ানমার বিমানবাহিনীর জন্য ইসরায়েলি রিকনেসান্স ড্রোন এবং বিমানের যন্ত্রাংশ আমদানি করে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সামরিক মালিকানাধীন বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোরও সম্পর্ক ও অংশীদারিত্ব করেছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের এক রিপোর্টেও ড. তুনকে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর অর্থনৈতিক স্বার্থ সম্পর্কিত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

 

এসবি/এমই