সিন্ডিকেট ভাঙছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে


সাহেব-বাজার ডেস্ক : সময়মতো কর্মী পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ায় ২৫ এজেন্সির সিন্ডিকেট অবশেষে ভেঙে যাচ্ছে। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর অনুমোদন পেয়েছে আরও ৫০টি রিক্রুটিং এজেন্সি। এ নিয়ে মোট ৭৫টি এজেন্সিকে অনুমোদন দিল মালয়েশিয়া সরকার।

আরও ২৫ এজেন্সি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সির মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ’ (বায়রা) জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে সব রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য মালয়েশিয়ার বাজার উন্মুক্ত করার চেষ্টা তারা অব্যাহত রাখবে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুরুতে অনুমোদন পাওয়া ২৫ রিক্রুটিং এজেন্সির অধিকাংশই নতুন ও অনভিজ্ঞ। এরা আগে কখনো মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠায়নি। এমনকি এসব এজেন্সির নিজস্ব ট্রেনিং সেন্টার কিংবা মেডিক্যাল সেন্টারও নেই। অনেকে নামমাত্র এজেন্সির লাইসেন্স নিয়েছেন। দুর্নীতির মাধ্যমে নাম তালিকাভুক্তি করলেও এরা আদৌ কর্মী পাঠানোর সক্ষমতা রাখে না।

অভিযোগ রয়েছে, ২৫ এজেন্সির এই সিন্ডিকেটের মূলহোতা রুহুল আমিন স্বপনের ৪টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলো হলো পাথ ফাইন্ডার ইন্টারন্যাশনাল (লাইসেন্স নম্বর ১২৯৮), সরকার ইন্টারন্যাশনাল (লাইসেন্স নম্বর ১৭১৫), আমিয়াল ইন্টারন্যাশনাল (লাইসেন্স নম্বর ১৩২৬) ও ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল (লাইসেন্স নম্বর ৫৪৯)। এ ছাড়া ২৫ এজেন্সির মধ্যে ১৪টি নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। নিজের ক্ষমতা পোক্ত করতে হাত করেছেন তিন সংসদ সদস্য এবং এক মন্ত্রীকে। অনভিজ্ঞ লোককে কাজ দিয়ে বেকায়দায় পড়েছে মালয়েশিয়া সরকার।

এদিকে এক ব্যক্তি কোন ক্ষমতার বলে, কাদের সহযোগিতায় একাই চারটি এজেন্সিকে সিন্ডিকেটের অন্তর্ভুক্ত করেছে, এ নিয়েও প্রশ্ন খাতসংশ্লিষ্টদের। এর আগেও সিন্ডিকেট করে রুহুল আমিন স্বপন দেশের সাধারণ মানুষকে মালয়েশিয়ায় নেওয়ার কথা বলে নিঃস্ব করেছেন। এবারও নিজের হাতেই তালিকা তৈরি করে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রীর মাধ্যমে নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীনের ছেলে রাফিত মালয়েশিয়ার কথিত ২৫ সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইম্পেরিয়াল রিসোর্সের লাইসেন্স তাদের। এই কোম্পানির পরিচালক তার ছেলে। এসব কারণে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের পদত্যাগের দাবি জানান খাতসংশ্লিষ্টরা। ১৩ ‘সোর্স কান্ট্রি’ থেকে যে প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় কর্মী যায়, বাংলাদেশ থেকেও একই প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানোর দাবি জানান তারা।

নতুন ৫০ এজেন্সি জনশক্তি রপ্তানি করার অনুমোদনের বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমেদ গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, বেশি এজেন্সি কর্মী পাঠালে বেশি কর্মী যেতে পারবে, এটা ভালো দিক। কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে গতি আসবে বলে আশা করা যায়।

এদিকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ ছালেহীন বলেন, ‘আপনি যেমন শুনেছেন, আমিও শুনেছি যে আরও কিছু এজেন্সিকে মালয়েশিয়া অন্তর্ভুক্ত করবে।’ তিনি বলেন, এর আগেও আমাদের পক্ষ থেকে ২৫টির জন্য সুপারিশ করা হয়নি। এখনো কারও বিষয়ে সুপারিশ করা হয়নি। আমরা স্বচ্ছতার সঙ্গেই কাজ করেছি।’

কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নতুন এজেন্সি অনুমোদনের বিষয়ে বায়রা মহাসচিব শামীম আহমেদ চেীধুরী নোমান বলেন, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে সিন্ডিকেট ভাঙতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। বৈধ সব রিক্রুটিং এজেন্সি যাতে কর্মী পাঠাতে পারে, সে জন্য এখনো চেষ্টা অব্যাহত আছে।

জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় যেতে পাঁচগুণেরও বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে কর্মীদের। গতি নেই কর্মসংস্থানেও। মালয়েশিয়ায় যেতে সরকার সর্বোচ্চ খরচ নির্ধারণ করে দিয়েছে ৭৮ হাজার টাকা। কিন্তু কর্মীপ্রতি গুনতে হচ্ছে সাড়ে তিন লাখ থেকে চার লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিন্ডিকেটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কর্মীরা। বাংলাদেশ থেকে ১৫ লাখ কর্মী যাওয়ার কথা মালয়েশিয়ায়। সিন্ডিকেটের কারণে বেড়েছে অভিবাসন খরচ। কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সি যদি কম থাকে, সে ক্ষেত্রে কর্মী কম যাবে এটাই স্বাভাবিক। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি বায়রার প্রত্যেক সদস্যসের জন্য উন্মুক্ত থাকলে অভিবাসন ব্যয় অনেক কমে যাবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, কম খরচে বেশি কর্মী পাঠানো এবং কর্মীর স্বার্থ রক্ষা করা। বৈধ লাইসেন্সধারী সব রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য বাজার উন্মুক্ত থাকলে অভিবাসন ব্যয় অনেক কমে যাবে। সিন্ডিকেটের কারণে গুটি কয়েকজন কর্মীদের জিম্মি করে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এর মূল কারণ হচ্ছে বাজারে প্রতিযোগিতা নেই। প্রতিযোগিতা থাকলে যে কম টাকায় কর্মী পাঠাবে, তার মাধ্যমেই সবাই যেতে চাইবে।

তারা বলছেন, মালয়েশিয়ায় দাতো শ্রী আমিন ও বাংলাদেশের রুহুল আমিন স্বপন সিন্ডিকেট করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়ে ১৫টি অযোগ্য, অনভিজ্ঞ ও নতুন এজেন্সিকে সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

এদিকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে রুহুল আমিন স্বপনের ব্যবসায়ী অংশীদার ২৫ সিন্ডিকেটের হোতা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান নাগরিক দাতো শ্রী আমিনকে সম্প্রতি দফায় দফায় কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ করে মালয়েশিয়ান দুর্নীতি দমন কমিশন। কথিত এই ২৫ রিক্রুটিং এজেন্সির বিষয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার ‘বেস্টিনেট’ অফিসে তল্লাশি চালিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাংলাদেশ হাইকমিশনের মালয়েশিয়া অফিসেও ২৫ এজেন্সি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। এসব এজেন্সির তালিকা বাংলাদেশ সরকার দিয়েছে কিনা এবং কিসের ভিত্তিতে এসব লাইসেন্স তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।

মালয়েশিয়ায় দাতো শ্রী আমিনকে আইনের আওতায় এলেও বাংলাদেশি রুহুল আমিন স্বপনকে কেন আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না এমন প্রশ্ন খাতসংশ্লিষ্টদের। অবিলম্বে রুহুল আমিন স্বপনকেও আইনের আওতায় এনে গ্রেপ্তারের দাবি জানান তারা।

বায়রার একটি বড় অংশ বরাবরই এ সিন্ডিকেটের হোতা হিসেবে মালয়েশিয়ান কোম্পানি বেস্টিনেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা ও কুয়ালালামপুরে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন অপতৎপরতায় লিপ্ত। এ অপকর্মে নেপথ্য থেকে মদদ দিচ্ছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান নাগরিক দতো শ্রী আমিন ও তার বাংলাদেশের ব্যবসায়িক অংশীদার রুহুল আমিন স্বপন।

বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্সের সম্ভাবনাময় এ শ্রমবাজার সাড়ে তিন বছর আগে বন্ধও হয়ে গিয়েছিল এ সিন্ডিকেটের অপতৎপরতায়। যে ৩৫টি মেডিক্যাল সেন্টার নিয়ে সিন্ডিকেশনের চেষ্টা চলছে, তার মধ্যে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নামে-বেনামে সরাসরি রুহুল আমিন স্বপন জড়িত। চক্রটি মেডিক্যাল সেন্টারের স্বত্বাধিকারীদের কাছ থেকে নিবন্ধনের নামে হাতিয়ে নিচ্ছে বিশাল অঙ্কের টাকা। বিতর্কিত সবকিছুই হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন ছাড়া।

এখন বেস্টিনেট মালয়েশিয়া সরকারের অনুমোদনের প্রলোভন দেখিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। অথচ মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য একমাত্র অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ফোমেমা, যার সঙ্গে বেস্টিনেটের কোনো চুক্তি বা সম্পর্কই নেই। মালয়েশিয়া যাওয়ার পর শ্রমিকদের দ্বিতীয়বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হয়, যার পুরোটাই ফোমেমার মাধ্যমে করা হয়। বাংলাদেশের মেডিক্যাল সেন্টারগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষার পদ্ধতি ও মান ফোমেমার সমমান না হওয়ায় অনেক কর্মীকে মেডিক্যালি আনফিট হয়ে শূন্য হাতে দেশেও ফিরতে হয়েছে।

এই ‘বেস্টিনেট’ দাতো শ্রী আমিন এবং রুহুল আমিন স্বপনের যৌথ মালিকানাধীন একটি আইটি প্রতিষ্ঠান, যারা মূলত বিভিন্ন ধরনের মনোপলি ব্যবসার ডিজিটাল দুর্নীতির নকশার বাস্তব রূপ দেয়। বেস্টিনেটের এ ডিজিটাল দুর্নীতির সর্বশেষ শিকার নেপাল ও বাংলাশে। ওয়েব বেজড অপারেটিং সিস্টেম এফডব্লিউসিএমএসের জালে নির্দিষ্ট কিছু রিক্রুটিং এজেন্টকে নামমাত্র উপস্থাপন করে সিস্টেম ফি নামে মোটা অঙ্কের অর্থ বাগিয়ে নেয়, যার ফলে অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়।

সাধারণভাবে মনোপলি এ সিস্টেমের সব দায়িত্ব ও দোষ রিক্রুটিং এজেন্টের কাঁধে চাপলেও সিংহভাগ অর্থ চলে যায়। এমনকি প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করার নামে শ্রমিকপ্রতি ১৫ হাজার টাকা হারে জোরপূর্বক আদায় করা হতো। বিপুল পরিমাণ এই অর্থের পুরোটাই আমিন-স্বপন ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যয় করে। নেপাল ও মালদ্বীপ সরকার একটু দেরিতে হলেও বুঝতে পেরে দ্রুত বেস্টিনেটকে কালো তালিকাভুক্ত করে দেয়। একই পদ্ধতি কাজে লাগাতে অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে দাতো শ্রী আমিন-স্বপন চক্র।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারপারসন ড. তাসনীম সিদ্দিকী বলেন, যে প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো হচ্ছে, তা পুরোটাই প্রশ্নবিদ্ধ। এখানে শুধু মালয়েশিয়া সরকার ও গুটি কয়েকটি সিন্ডিকেটভুক্ত এজেন্সির স্বার্থরক্ষা হচ্ছে। কর্মীদের কোনো স্বার্থরক্ষা হচ্ছে না। প্রতিযোগিতার বাজার থাকলে কর্মীরা দর-কষাকষির সুযোগ পায়। এর ফলে ব্যয় কমে যায়। কেউ একচেটিয়া বাড়তি টাকা নিতে পারে না।

তিনি বলেন, পুরো প্রক্রিয়াই এক অর্থে অবৈধ। যেখানে বৈধ লাইসেন্সধারী ১৫০০ রিক্রুটিং এজেন্সিকে পাশ কাটিয়ে মাত্র ২৫টি লাইসেন্স কাজ করবে, এটি কোনোভাবেই ঠিক নয়, যা হচ্ছে তা ব্যক্তিস্বার্থেই হচ্ছে।

 

এসবি/এমই