সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষায় শিক্ষক ও সাংবাদিকদের বিবৃতি


নিজস্ব প্রতিবেদক : করোনার সংকটকালে সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষার দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের বিভিন্ন  বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক এবং সাংবাদিকরা। এতে সরকারি-বেসরকারি খাত এবং গণমাধ্যম মালিক ও সম্পাদকদের আন্তরিক প্রয়াসের মাধ্যমে সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

বিবৃতিতে অন্যদের মধ্যে স্বাক্ষর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত আলী খান, সাবেক শিক্ষক ও সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম, অধ্যাপক ড. মফিজুর রহমান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস, অধ্যাপক ড. প্রদীপ কুমার পাণ্ডে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আলী আজগর চৌধুরী, মো. শহীদুল হক ও মো. আবুল কালাম আজাদ।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘কোভিড-১৯ ভাইরাস গোটা বিশ্বকে বর্তমানে একটি নজিরবিহীন বহুমুখী সংকট ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিক ও প্রতিটি খাত আজ সংকটের মুখোমুখি। এর শেষ কোথায় বিশ্বের কেউ জানে না। করোনা ভাইরাস মানুষের জীবনকে কত ধরনের বিপদের মুখে ফেলেছে ও ফেলছে তা আপনারা- আমরা সবাই জানি। হয়তো আরও অনেক অজানা বিপদ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এমন অনিশ্চিত মহাসংকটে যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, তা নিয়েই সবার পাশে সবাই দাঁড়াবে, সহযোগিতার হাত বাড়াবে, টিকে থাকতে শক্তি ও সাহস যোগাবে-এটাই মানব সমাজের ধর্ম এবং সব মানুষের কাছে প্রত্যাশিত।’

‘করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে আমরা শারীরিক দূরত্বের কৌশল নিয়েছি। কিন্তু বিপদে সুরক্ষা পেতে আমাদের সামাজিক মানসিক নৈকট্য ও পেশাগত বন্ধন এখন অতীব জরুরি।’

এতে আরও বলা হয়, ‘এমন এক বাস্তবতায় আমরা দেশের গণমাধ্যমের বর্তমান সংকট সম্পর্কে এমন কিছু খবর পাচ্ছি যা
আমাদেরকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। আমরা জানতে পেরেছি, কোভিড-১৯ মোকাবেলার জন্য মার্চ মাসের শেষে সাধারণ ছুটি ঘোষিত হবার এক মাসের মাথায় অনেক সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক/কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের ঈদের বোনাস না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সুপ্রতিষ্ঠিত ও লাভজনক এবং বাজারনেতা হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘকাল ধরে দেওয়া বোনাসের পরিমাণ চারভাগের তিনভাগ ছেঁটে ফেলা হয়। আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছি যে, কোনো কোনো গণমাধ্যম বেতন কমানোসহ বিনা বেতনে সাংবাদিকদের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো এমনকি বিপুল সংখ্যক সংবাদকর্মীকে চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে।’

‘আমরা সচেতন আছি যে, করোনা ভাইরাসের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্থ এবং বহুক্ষেত্রে স্থবির হয়ে পড়েছে। এর বিরূপ প্রভাব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়েছে, যেমন- বিজ্ঞাপন কমে গেছে, আয় কমেছে। ফলশ্রুতিতে লাভজনক শক্তিশালী গণমাধ্যম যেমন দুশ্চিন্তায় পড়েছে, তাদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপদ আরও বেশি। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে অনেক গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপনের টাকা বকেয়া রয়েছে, যা আদায়ও দুষ্কর হয়ে পড়েছে। সংবাদপত্রের বিক্রিতেও পড়েছে ভাটা। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে গণমাধ্যমের জন্য।’

কর্মীদের ছাঁটাই না করার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, সংবাদপত্র, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলসহ সকল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিক ও সম্পাদকের কাছে আমাদের আকুল আবেদন- আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ না করে, কোন সংবাদকর্মী ছাঁটাই না করে, কারও বেতন ভাতা না কমিয়ে কীভাবে এই মহাসংকটে সবাইকে সাথে রেখে প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব সেই উপায় ও কৌশল আপনারা সম্মিলিতভাবে বের করুন। নিজেদের ঐক্যবদ্ধ চিন্তাশক্তি, সৃজনশীল উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও আর্থিক সক্ষমতাকে কাজে লাগালে, আমাদের বিশ্বাস, কাউকে বাদ না দিয়েও এই কঠিন সময়ে আপনারা জয়ী হবেন। সংবাদকর্মী ছাঁটাই ও চাকরি থেকে অব্যাহতি আর্থিক সংকট মোকাবেলার সাধারণ পন্থা। আধুনিক চিন্তাচেতনা ও প্রযুক্তির এ সময়কালে ছাঁটাইয়ের মত পুরনো কৌশলের আশ্রয় না নিয়েও কী করে সকল সংবাদকর্মীর জীবন-জীবিকাকে নিশ্চিত রেখে আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করা যায় সেই ভাবনা এখন জরুরি। এই ঘোর সংকটে জরুরি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরা সরকারের কাছ থেকে সহজতম শর্তে ঋণ সহায়তা চাইতে পারেন, নিজেদের অন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সংকটকালীন সহায়তা তহবিল আনতে পারেন, গণমাধ্যম মালিকদের সংগঠনগুলো সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি যৌথ তহবিল গঠনের চিন্তা করতে পারেন। এসবের চাইতে আরও উন্নত সৃজনশীল চিন্তা মালিক-সম্পাদকদেরই আছে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।’

তারা বলেন, ‘যে কোনো সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজে শক্তিশালী স্বাধীন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা কতটা অপরিহার্য। সঠিক তথ্য ছাড়া প্রত্যেক নাগরিক অন্ধকারে। সরকারি ও বেসরকারি সকল খাতকে এগিয়ে নিতে সাংবাদিকতার গুরুত্ব যে অপরিসীম, তা কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। তাই সাংবাদিকতা, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের জীবন সুরক্ষায় সরকারি, বেসরকারি উভয় খাতেরই দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসা এই মহাসংকটে আরও জরুরি বলে আমরা মনে করি। আমরা সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একই সঙ্গে আহ্বান জানাতে চাই, আপনারা মূলধারার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিজ্ঞাপন কমানোর কোনো চিন্তা থাকলে তা পরিহার করুন। বরং সকলের স্বার্থে সাংবাদিকতার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে এবং সকল সংকটে সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমে আরও বেশি করে বিজ্ঞাপন দেওয়াসহ তাদের আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যথাসম্ভব সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখুন। জনকল্যানমুখী সাংবাদিকতা আপনাদের সুরক্ষায়ও বিশাল ভূমিকা রাখে। ফলে সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার সুরক্ষায় ভূমিকা রাখার অর্থ নিজের সুরক্ষাকেই সংহত করা। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তার ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বেসরকারি খাতের নেতৃত্ব দানকারী সংগঠনগুলোর সাথে যে কোনো ধরনের আলোচনা সার্থক করতে সাংবাদিকদের ইউনিয়নসহ অন্যান্য সংগঠন এগিয়ে আসবে বলেও আমরা মনে করি।’

‘আমাদের এসব চিন্তার একটাই উদ্দেশ্য-অন্তত এই সংকটকালে যেন একজন সংবাদকর্মীও বেকার না হন। এই সময় যিনি চাকরি হারাবেন তার পক্ষে আরেকটি চাকরি বা আয়ের উপায় খুঁজে বের করা বর্তমান বাস্তবতায় অসম্ভব। তখন সেই সংবাদকর্মী শুধু নয়, তাঁর গোটা পরিবারই হবে বিপন্ন। আপনারা সবাই সামান্য ত্যাগ স্বীকার করে হলেও প্রত্যেক সংবাদকর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জীবন, জীবিকা এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত রাখবেন, এটা আমাদের আকুল আবেদন। কারণ, সংবাদকর্মীরা টিকে থাকলেই তথ্যের প্রবাহ নিশ্চিত থাকবে। আর এই সঠিক তথ্য ও সৎ-সাহসী সাংবাদিকতা কত জরুরি তা আমরা সবাই অনুধাবন করতে পারছি।’

বিবৃতিতে আরও স্বাক্ষর করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক খান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুহাম্মদ যাকারিয়া, একেএম জিয়াউর রহমান, মো. আসাদুজ্জামান, রাজীব নন্দী, সুদীপ্ত শর্মা, রেজাউল করিম, মাধব দীপ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি শিক্ষক ড. শেখ শফিউল ইসলাম, ড. তৌফিক ইলাহি, গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ শিক্ষক ড. মো. অলিউর রহমান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মামুন আ. কাইউম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক উজ্জ্বল মণ্ডল, সুমাইয়া শিফাত, সালমা আহমেদ, শেখ আদনান ফাহাদ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহবুবুল হক ভূঁইয়া, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের শিক্ষক তপন মাহমুদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. মিনহাজ উদ্দিন, জাকারিয়া খান, জাকারিয়া খান, বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাবিউর রহমান প্রধান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মামুন অর রশিদ, ছোটন দেবনাথ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইমরান হোসেন, ফরহাদ উদ্দীন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাজী এম. আনিছুল ইসলাম প্রমুখ।

সাংবাদিকদের মধ্যে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন, নাদীম কাদির, সুকান্ত গুপ্ত অলক, জ. ই. মামুন, অশোক চৌধুরী, প্রণব সাহা, নজরুল ইসলাম মিঠু, মুন্নী সাহা, সাইফুল ইসলাম, আশিষ সৈকত, জুলফিকার আলি মাণিক, প্রভাষ আমিন, ফাহিম আহমেদ, তালাত মামুন, রঞ্জন সেন, দেবাশীষ রায়, দীপ আজাদ প্রমুখ।

এসবি/আরআর/এআইআর