সরকারের করোনানীতি ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি


ড. রাজীব চক্রবর্তী: উচ্চশিক্ষার জন্য দীর্ঘদিন ধরে ভারতে অবস্থানের ফলে সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা, চিকিৎসা ও রাজনীতি সম্পর্কে বেশকিছুটা অভিহিত হয়েছি। সাম্প্র্রতিক সময়ে করোনা মোকাবিলায় দারুণ সাফল্য দেখিয়ে এই অঞ্চল এশিয়াতে মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। উন্নত বিশ্বের গণমাধ্যম বিবিসিতে এর জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সাক্ষাৎকারও দিতে দেখা গেছে। পেশায় একজন স্কুলশিক্ষক হয়েও স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ওখানে সবাই টিচার বলেই ডাকে। তিনি প্রথম থেকেই করোনা মোকাবিলায় বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিয়েছেন। আপৎকালীন সময়ে এই রাজ্যই প্রথম অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপন করেছে যাতে দীর্ঘমেয়াদে করোনা আক্রান্ত মানুষকে সেবা দেওয়া যায়। এর পেছনে কারণও আছে। এই অঞ্চলের সবচেয়ে বেশি দক্ষ জনশক্তি মধ্যপ্রাচ্যসহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাস করে। ফলে প্রবাসীদের মাধ্যমে ওখানেই প্রথমদিকে সবচেয়ে বেশি করোনা আক্রান্ত রোগীর খবর পাওয়া যায়।

পিএইচডি ডিগ্রি নেওয়ার সময় ওখানে হোস্টেলে থাকা অবস্থায় অনেক ইয়াং ডাক্তারের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে। ফলে খুব কাছ থেকে তাদের হাসপাতালগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়েছি। তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সত্যিই অন্যরকম এবং অনেক উন্নত। উপচেপড়া ভিড়ে পাবলিক বাসগুলোতে কি দারুণভাবেই পুরুষের পাশাপাশি মহিলা কন্ডাক্টররা ভাড়া আদায় করছে। ভাড়া আদায়ের মেশিনও বেশ আধুনিক ও ডিজিটাল। হকার পেপার দিতে আসে বাইকে করে। প্রফেসররা নিজেরা গাড়ি চালান। তাদের কোনো প্রাইভেটকারের-সামনে পেছনে বাম্পার নেই। আমি কিন্তু কোনো উন্নত বা অনেক দূর দেশের গল্প করছি না, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের একটি রাজ্যের গল্প করছি। অদ্ভুত এক রাজ্য এই কেরালা, যার সঙ্গে ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর ব্যবধান অনেক বেশি। জনসংখ্যার বিচারে ৫৪% হিন্দুর সঙ্গে ২৭% মুসলিম আর ১৯% খ্রিষ্টান হওয়া সত্ত্বেও সেখানে চার্চের আধিক্য দেখা যায়। তবে সব ধর্মের লোকের মধ্যে আছে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। অনেক সরকারি এইডেড কলেজ আছে যেগুলো মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান ম্যানেজমেন্ট দ্বারা পরিচালিত। ফলে সব রকমের কোয়ালিফাইড মানুষ যোগ্যতা অনুসারে চাকরি পায়।

বেশকিছু বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে জানলাম, কলকাতার অবস্থা খুবই খারাপ। বেশিরভাগ ঘরে করোনায় আক্রান্ত পেশেন্ট। ফোনে কথা বলার এক পর্যায়ে কলকাতার বন্ধু বলল, তোদের বাংলাদেশ বেশ ভালোভাবে করোনা মোকাবিলা করছে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ যখন টিকা পায়নি বাংলাদেশের মানুষ দ্বিতীয় ডোজের টিকা দিয়ে এখন লঞ্চে দড়ি বেয়ে উঠে বাড়ি যেতে মরিয়া। ভারত থেকে সরকার দ্রুত বেশকিছু টিকা আমদানি করেছে। এটা আসলে আমাদের কূটনৈতিক সাফল্য। তবে এই সফলতা এক দিনে আসেনি। ভারত যখন প্রতিনিয়ত প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত নির্ধারণের ঝামেলায় জর্জরিত তখন বাংলাদেশ সরকারের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশের জন্য সুনাম অর্জন করেছে। একই ধরনের খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও ঘনবসতিপূর্ণ পশ্চিমবঙ্গে যখন ভয়াল অবস্থা, সেখানে গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ মৃত্যুর সংখ্যা তিন অঙ্কের অনেক নিচে নেমে এসেছে। ফ্রান্স থেকে শুরু করে সব উন্নত দেশ করোনা মোকাবিলায় যে পদক্ষেপ নিয়েছিল বাংলাদেশ সরকারও এখন পর্যন্ত তাই করে যাচ্ছে।

করোনার চেইন ভেঙে দিতে লকডাউনই এখন পর্যন্ত জুতসই পন্থা হিসেবে বিশ্বে সর্বাধিক বিবেচিত। কিন্তু একশ্রেণির মানুষের, যাদের জীবনের চেয়ে পড়াশোনা বড়, জীবিকা বড়, তাদের জন্য টকশোগুলোতে অনেকেই দিনাতিপাত করছেন। হলগুলো খুলে দিন, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট খুলে দিন, পরীক্ষা নিয়ে নিন। এখন পাশের দেশের অবস্থা দেখে তারাই মুখে কুলুপ এঁটেছেন। ভারতের যে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আমাদের এতো আস্থা ছিল আমরা দেখলাম অল্পতেই কীভাবে তা ভেঙে পড়েছে। আমেরিকাতে করোনা পজিটিভ রোগীর পরিচিতি স্টেইট সার্ভারে চলে যায়। আর আমাদের এখানে গ্রামে আক্রান্ত ব্যক্তি করোনার মাইল্ড সিম্পটম নিয়ে রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায়। এত অসর্তকতার পরও বাংলাদেশ করোনা মোকাবিলায় পজিটিভলি চেষ্টা করে যাচ্ছে। ভারতের বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এটা নাকি দ্বিতীয় ঢেউ, তৃতীয় ঢেউও আসতে পারে, তাহলে কিন্তু বাংলাদেশের জন্য দুঃসংবাদ আছে।

করোনাকালীন রাজনীতিতে একটি ডায়ালগের ব্যবহার বাংলাদেশে তীব্রতর হয়েছে। মন্ত্রী-আমলা থেকে শুরু করে সবার একই কথা, প্রধানমন্ত্রী এটি সরাসরি দেখছেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। গত এক বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী সামনে থেকে করোনা মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ভারতীয় ভেরিয়েন্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আগেই পুনর্বার লকডাউনের প্রয়োজনীয়তা এখন আমরা হারে হারে বুঝতে পারছি। গত বছর সরকারের জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ২০০০ ডাক্তার নিয়োগ হাসপাতালগুলোর জনবল বৃদ্ধি করেছে; যার সুফল এখন আমরা পচ্ছি। করোনা আক্রান্ত আমার নিকটাত্মীয় জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসায় বেজায় খুশি। যেখানে করোনা মোকাবিলায় ভারতীয় হাসপাতালগুলোর বেহাল অবস্থা, সেখানে আমাদের সরকারি হাসপাতালগুলো করোনা মোকাবিলায় আস্থার প্রতীক হয়ে উঠছে।

সবাই ভেবেছিল টিকা নিয়ে দেশে একটা অরাজকতা সৃষ্টি হবে। অথচ কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই টিকা দেওয়ার কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। যখন আমার আত্মীয়রা আমেরিকাতে টিকা পায়নি, বন্ধু-বান্ধব ভারতে টিকা পায়নি, তখন আমার বাবা-মা করোনা টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া সম্পন্ন করেছেন বেশ আগেই। টিকা রাজনীতিতে অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার এবং এ কথা বলাই যায় টিকার রাজনীতিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে অনেক বেশি দূরদর্শিতার প্রমাণ দিয়েছেন। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প সরকারের পতনের ও বিজেপি সরকারের সাম্প্রতিক নির্বাচনে হেরে যাওয়ার কারণ হিসেবেও করোনা মোকাবিলার ব্যর্থতাকে দায়ী করা হয়।

করোনা-পরবর্তী বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছেন। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে। এর অংশ হিসেবে তার সঙ্গে সরকারকে হলমার্ক কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংক দুর্নীতি, পিকে হালদার অর্থ কেলেঙ্কারির দ্রুতবিচার করতে হবে।

গত রমজানে বেশিরভাগ মানুষই স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করেছে। করোনার সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের সাময়িক ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরেছে। ট্রাক থেকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি নিম্ন আয়ের মানুষের ভোগান্তি কমিয়েছে। তবে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে আরও বেশি করে ত্রাণের আওতায় আনতে হবে। করোনা নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা ও সতর্কতার বিকল্প নেই।

গবেষক ও লেখক

এসবি/জেআর