সমাজের উচ্ছৃঙ্খলতার দায় কেন পশ্চিমা সংস্কৃতির

  • 17
    Shares

মনোয়ারুল হক

বাংলাদেশের গণমাধ্যম কোন রাস্তায় হাঁটছে- তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা সময় এসেছে। নানান ইস্যুতে গণমাধ্যম যেভাবে সংবাদ পরিবেশন করে তা সমাজকে কতটা এগিয়ে নিয়ে যায়, সে প্রশ্ন সর্বস্তরে এমনকি গণমাধ্যমকর্মীরাও সে আলোচনা করে থাকেন।

বাংলাদেশের তরুণ সমাজের মধ্যে নানান ধরনের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ লক্ষ্য করা যায় যা গণমাধ্যমকর্মীরা বর্ণনা করেন ‘পশ্চিমা ধাঁচের’ আচার-আচরণ বলে। ‘পশ্চিমা ধাঁচের’ আচার আচরণ বলতে কি বোঝায়? সমাজের উচ্ছৃঙ্খলতা যদি পশ্চিমা ধাঁচের আচার-আচরণ হয়ে থাকে, তাহলে পশ্চিমা দেশগুলোকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করি?

পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং ধর্মের স্বাধীনতা; সমাজগুলোকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। ওই সমাজের কোনো অংশের কোনো নিকৃষ্ট মানসিকতার মানুষের কোনো আচরণ, সেই দেশের সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে বর্ণনা করা একটা ভয়ঙ্কর ভুল। তরুণ সমাজকে প্রভাবিত করছে পশ্চিমাসমাজ, এই ব্যাখ্যা এদেশের মৌলবাদী ধর্ম প্রচারকরা সাধারণত প্রচার করে থাকেন।

আমাদের দেশের হেফাজত ইসলামের সাম্প্রতিককালে ভাস্কর্য বিরোধী মন্তব্যসমূহ এচিন্তা দ্বারাই প্রভাবিত। ভাস্কর্য নিয়ে তারা যত কথাই বলেছে, তাতে একে পশ্চিমা সংস্কৃতি হিসেবেই তুলে ধরেছে। কাজেই এধরনের প্রচারণার ফলে পশ্চিমাসমাজের যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধগুলো আমরা ধারণ করার চেষ্টা করি সেগুলো অন্তরালে চলে যায়।

পশ্চিমা ধাঁচের সংস্কৃতির এই প্রচারণার সঙ্গে ধর্মতত্ত্বের সম্পর্ক আছে। অথচ আমাদের দেশের যেকোন স্তরের মানুষই পশ্চিমা সমাজে জীবন প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্নে বিভোর। উচ্চবিত্তরা তাদের সন্তানদেরকে শিক্ষা এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য জন্য যা যা করা দরকার- তাই করে থাকেন। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত এরা সবাই, এমনকি দেশের নানা প্রান্তে যারা সারাক্ষণ ধর্মতত্ত্ব বয়ান বা বিস্তারের কাজে নিয়োজিত, তারা যদিও উচ্ছশৃঙ্খলতার জন্য পশ্চিমা সমাজকে দায়ী করেন, গালি দেন এবং পশ্চিমা সমাজের নিকৃষ্ট দিকগুলোকে তুলে ধরেন—কিন্তু তারাও অন্তরের গভীরে স্বপ্ন লালন করেন, যেন তারাও ওই সব দেশে বসবাস করার সুযোগ পান।

গণমাধ্যমকর্মীদের সতর্ক হওয়া উচিত, সর্বক্ষেত্রেই যেকোনো উচ্ছৃঙ্খল আচরণ মানেই সেটা পশ্চিমা আচরণ নয়। গত কয়েক বছর যাবৎ আমরা অব্যাহতভাবে দেখি, তরুণ-তরুণীদের যেকোন উচ্ছৃঙ্খল আচরণকে আমরা সবাই পশ্চিমা আচরণ বলে উদাহরণ দেই। হ্যাঁ, একথা সত্য, পশ্চিমা তরুণ-তরুণীরা অনেক স্বাধীনভাবে জীবন-যাপন করে এবং পরিবার বা পিতা-মাতা তাদের সামগ্রিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সন্তানদের নিয়ন্ত্রণ করেন না। সন্তান স্বাধীনভাবে তার ব্যক্তিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে; শিক্ষা, কর্মজীবন, বৈবাহিক জীবন ইত্যাদি ক্ষেত্রে।

একটা সমাজ কতটা উন্নত তা পরিমাপ করার সুনির্দিষ্ট কোনো বিধিবদ্ধ নীতিমালা নেই। কিন্তু, যেসব জায়গা থেকে সমাজকে বিশ্লেষণ করা হয়, যার প্রেক্ষিতে আমরা পশ্চিমা সমাজকে উন্নত সমাজ হিসেবে ব্যাখ্যা করে থাকি, তার মধ্যে অন্যতম হলো; তরুণ প্রজন্মের স্বাধীন চিন্তা করার ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

গণমাধ্যমকর্মীরা যেভাবে পশ্চিমা সংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা করেন, রেডিও-টেলিভিশনের বক্তারা, ধর্মতত্ত্ববিদরা পশ্চিমা সমাজের খারাপ অংশগুলোকে তুলে নিয়ে এসে তাকে ‘পশ্চিমা সমাজ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, এটা যথার্থ নয়। সেকারণে গণমাধ্যমকর্মী এবং আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজের সবাইকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। অন্ধকার দিক নিয়েই শুধু পশ্চিমা সমাজ নয়। পশ্চিমা সমাজ হচ্ছে, মানুষের প্রতি মানুষের সম্মানবোধ, প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সম্পর্কে নিশ্চয়তা প্রদান, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্ম পালনের স্বাধীনতা, রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মকে ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা—এগুলো তাদের সমাজের উৎকৃষ্ট দিক।

সাম্প্রতিককালের পৃথিবীর একজন বিখ্যাত ব্যক্তি ধর্মতত্ত্ব ও ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা প্রদান করতে গিয়ে, যে ধারণা পশ্চিমা সমাজ সম্পর্কে দিয়েছেন- তা যথার্থ নয়। নিজ ব্যাখ্যায় তিনি বলার চেষ্টা করেছেন: পশ্চিমা সমাজের ধর্মনিরেপক্ষতা, সমাজকে ধর্মহীনতার দিকে পরিচালিত করছে! পশ্চিমা সমাজ সম্পর্কে এ ধরনের ধারণা আমাদের সমাজে অহরহ প্রদান করা হয়। আসলে পশ্চিমা সমাজে ধর্ম সম্পর্কিত অবস্থানটা পরিষ্কার। রাষ্ট্রের সকল অংশের মানুষ তার নিজস্ব ধর্ম চর্চা করবেন, কিন্তু রাষ্ট্র ধর্ম প্রচার-প্রসার অন্যান্য বিষয়ে কোনো অর্থ ব্যয় করবে না। এই হচ্ছে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা।

এখন এর বাইরের যে ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে আজকাল, তা পশ্চিমা সমাজ বহু আগেই পরিত্যাগ করেছে। তারা সমাজের অভ্যন্তরের লড়াইয়ের ভেতর থেকেই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে, রাষ্ট্র ধর্ম থেকে আলাদা থাকবে। ধর্ম নিজের, ধর্মীয় আচার আচরণের জন্য একজন মানুষ নিজে দায়বদ্ধ। দায় কোনভাবে সমাজের নয়, এমনকি পারিবারেরও নয়। সেকারণে ধর্মনিরপেক্ষতার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার বাইরে ভারতীয় যে ব্যাখ্যা: পশ্চিমা সমাজকে ‘ধর্মহীন’ বলে প্রকাশ করে তা যথার্থ নয়।

সম্প্রতি পোল্যান্ডে নারীদের ‘গর্ভপাত বিরোধী’ একটি আইন তৈরি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আইন রচনার পেছনে যুক্তি হিসেবে বলেছেন, সমাজের জনসংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাওয়ার অন্যতম কারণ নারীদের গর্ভপাত। এর বাইরে খ্রিস্টান ক্যাথলিক মতালম্বীদের ধর্ম বিশ্বাসে গর্ভপাত নিষিদ্ধ। সেকারণে, পোল্যান্ড রাষ্ট্র কী ধর্ম দ্বারা পরিচালিত হলো? সরকারের প্রণীত আইন কি ধর্মীয় বিধি-বিধানের জায়গা থেকে, নাকি তাদের জনসংখ্যা হ্রাস ঠেকানোর জায়গা থেকে?

সেখানকার নারীরা আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। যদিও এখনো পর্যন্ত সে আইনের কোনো পরিবর্তন ঘটানোর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কিন্ত, একথাও সত্য, পশ্চিমা অনেকগুলো দেশেই জনসংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। সে দেশগুলো জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য ধর্মীয় বিধি-বিধানকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে, তবে তা মানুষের অধিকার খর্ব করে নয়।

বাংলাদেশের যুব সমাজ অথবা তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বাসকে অনেক সময় উচ্ছৃঙ্খল হিসাবে সমাজের একটি অংশের মানুষ বর্ণনা করে থাকে। তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বাস কি আদৌও উচ্ছৃঙ্খল? আর সেই উচ্ছ্বাস যদি উচ্ছৃঙ্খলতা হয়- তা কী করে আমরা পশ্চিমা সমাজের কাঁধে তুলে দেবো!

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক


  • 17
    Shares