সমাজতান্ত্রিক কিউবায় শিক্ষাব্যবস্থা


।।কায়সুল খান।।

বিপ্লব-পূর্বকালে গৃহকর্ম, কৃষি ও অসম্মানজনক কিছু কাজেই কিউবান নারীদের জীবনযাত্রা সীমাবদ্ধ ছিল। বিপ্লবের পরে সেখানে নারীরা শিক্ষা লাভের অধিকার পেয়ে নানা রকম সম্মানজনক পেশা বেছে নেওয়ার সুযোগ পান। এ সময় শিক্ষাশিবিরে নারীকে শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। নারীশিক্ষা ও তাদের কর্মসংস্থানকে উৎসাহিত করতে ডে-কেয়ার, কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে সরকার। শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে নারীর স্বাস্থ্য খাতেও কিউবা সরকার দৃষ্টি দেয়।

ইউনেস্কো ১৯৯৮ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, দরিদ্র থাকার পরও শিক্ষাক্ষেত্রে কিউবা দারুণ সাফল্য অর্জন করেছে। দেশটির তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ভাষা ও গণিতে দক্ষতার ওপর একটি মূল্যায়নে দেখা যায়, তারা গড় মানের চেয়ে অনেক ভালো ফল করেছে। দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধের পরও কিউবার এই সাফল্য দেশটির অর্জনকে আরও মহিমান্বিত করে তোলে। কিউবাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:১২; যা লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশের তুলনায় অর্ধেক।

বর্তমানে দেশটিতে শিশু সাক্ষরতার হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি, লাতিন দেশগুলোয় যা অভাবনীয়। কিউবার সরকার মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের ব্যাপারে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। সকল শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষার সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ, স্কুলে শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের নিবিড় আচরণ, পরিবারের সদস্যদের মাঝে শিক্ষা সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি শিক্ষার প্রসারে রাষ্ট্রের ইতিবাচক ও কঠোর ভূমিকা গ্রহণ কিউবার শিক্ষাব্যবস্থাকে করে তুলেছে যুগোপযোগী ও শক্তিশালী। আজকের কিউবার শিক্ষাব্যবস্থা কোনো মিরাকল নয় বরং তা সুপরিকল্পনা ও তার সফল বাস্তবায়নের ফসল।

কিউবার শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজনীয়তা পূরণের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়। কিউবা সরকার মনে করে, পিতামাতাই সন্তানের প্রথম শিক্ষক। এ জন্য ওখানে অ্যাডাল্ট রিটারেসির দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিউবায় স্কুল-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নানা সামাজিক কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত করা হয়। এ ধরনের একটি স্কুলের নাম ‘লা কোলমেনিতা’। ওখানে নানা ধরনের ভিজ্যুয়াল আর্টস এবং সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। ওই স্কুলে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়ারা দারুণ সব স্কেচ তৈরি করে কিংবা সংগীত বা নৃত্য করে। এই স্কুলগুলো যে খুব আধুনিক তা নয়; কিন্তু একটি নির্ধারিত নীতিমালা মেনে এখানে শিশুদের প্রশিক্ষণ চলে। অভিভাবক, শিল্পী ও কর্মীরা ভলান্টিয়ারি ভিত্তিতে এখানে কাজ করে। জনশিক্ষা কিউবার শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এই ব্যাপক ও বিস্তৃত জনশিক্ষা নিশ্চিতের মাধ্যমেই কিউবা বিপ্লবের মাত্র ৩ বছরের মধ্যে নিরক্ষতার হার ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। কিউবার শিক্ষাব্যবস্থা দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আর উচ্চশিক্ষা দেখভাল করে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

কিউবার শিক্ষাব্যবস্থায় মোট ৫টি ধাপ রয়েছে। প্রাইমারি এডুকেশন, মিডল এডুকেশন, সেকেন্ডারি এডুকেশন, ভোকেশনাল এডুকেশন এবং টারশিয়ারি এডুকেশন। ওখানে প্রথম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত ৬ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুরা অফিসিয়ালি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে। এরপর শিক্ষার্থীরা সপ্তম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বেসিক সেকেন্ডারি এডুকেশন লাভ করে। বেসিক সেকেন্ডারি এডুকেশনকে মিডল স্কুলও বলা হয়। দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার নাম আপার সেকেন্ডারি এডুকেশন। ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করে। উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর কিউবান শিক্ষার্থীদের ‘ব্যাচেলেরাতো’ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। বেসিক সেকেন্ডারি সমাপ্তের পর শিক্ষার্থীদের প্রথাগত শিক্ষা এবং ভোকেশনাল শিক্ষার মাঝে একটিকে বেছে নিতে হয়।

যারা ভোকেশনাল শিক্ষা বেছে নেয় তারা কর্মমুখী নানা প্রশিক্ষণ লাভ করে। এই পর্যায়ে ২ দশমিক ৫ থেকে ৪ বছর মেয়াদি বিভিন্ন কোর্স করানো হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা দক্ষ টেকনিশিয়ান হিসেবে গড়ে ওঠে এবং আরও উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পাওয়ার উপযুক্ত হয়। ভোকেশনাল এডুকেশনের জন্য কিউবাতে রয়েছে উচ্চমানের টেকনোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট। অন্যদিকে যে সব শিক্ষার্থী প্রথাগত উচ্চশিক্ষা লাভ করতে চায় তারা আপার সেকেন্ডারি পর্যায়ে পড়াশোনা করে। আপার সেকেন্ডারির পরবর্তী শিক্ষার পর্যায় হলো টারশিয়ারি এডুকেশন বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা।

কিউবায় উচ্চশিক্ষার তিনটি পর্যায় রয়েছে। ব্যাচেলর, মাস্টার্স এবং ডক্টরাল স্টাডিজ। এখানে ব্যাচেলর কোর্সগুলো প্রধানত ৪ বছরের হয়। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং ও চিকিৎসাবিদ্যার ক্ষেত্রে তা ৫ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত হয়। শিক্ষার্থীরা ব্যাচেলর সম্পন্ন করার পর প্রফেশনাল ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট পায়। ব্যাচেলরের পর এখানে মাস্টার্স করার সুযোগ রয়েছে। কিউবার শিক্ষাব্যবস্থায় দুই বছর মেয়াদি মাস্টার্স কোর্স পড়ানো হয়। শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা, অভিসন্দর্ভ রচনা, ইন্টার্নশিপ ইত্যাদি সম্পন্ন করার পর মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করে। কিউবায় ৩ থেকে ৪ বছর মেয়াদি ডক্টরাল স্টাডির সুযোগ রয়েছে। ব্যাচেলর ও মাস্টার্সে ভালো ফল করার পর গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষার্থীরা ডক্টরাল ডিগ্রি নিয়ে থাকে। কিউবায় বেশ কিছু ভালোমানের বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব হাভানা, ইউনিভার্সিটি অব সান্তিয়াগো দ্য কিউবা, সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব লাস ভিলাস, ইউনিভার্সিটি অব ক্যামাগুয়ে, এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি অব হাভানা প্রভৃতি কিউবার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া কিউবায় চিকিৎসাবিদ্যার জন্য অনেক ভালোমানের মেডিকেল কলেজ রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ থেকে প্রতি বছর দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি তৈরি হয়।

কিউবার শিক্ষাব্যবস্থা মূলত দেশটির নিজস্ব জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রণীত। কিউবার শিক্ষার্থীরা নিজ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষা গ্রহণ করে। এখানে একজন কিউবান শিক্ষার্থী নিখরচায় যোগ্যতা অনুযায়ী যত খুশি উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারে। যদিও এখানে বিনামূল্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া বেশ কঠিন। শিক্ষার্থীদের নিজ যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে পরীক্ষা ও ইন্টারভিউ পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ মেলে।

বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কিউবা শিক্ষা গ্রহণ কিছুটা কঠিন করেছে। এখানে মাস্টার্স পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ রয়েছে। তবে এজন্য শিক্ষার্থীকে নূ্যনতম ব্যাচেলর ডিগ্রি ও স্প্যানিশ ভাষাজ্ঞান থাকতে হয়। কিউবায় চিকিৎসাবিদ্যা গ্রহণের জন্য বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা আসে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিউবার চিকিৎসা ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বিদেশ থেকে মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী আসার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কিউবা তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পশ্চিমা ধাঁচের শিক্ষার প্রসার ঘটাচ্ছে। ২০০৬ সালে কিউবা পার্শ্ববর্তী সমাজতান্ত্রিক বন্ধুরাষ্ট্র ভেনেজুলেয়ার সঙ্গে মিলে যৌথ শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে। এছাড়া ব্রিটেনের সঙ্গে কিউবা শিক্ষার্থী বিনিময় করে থাকে। পাশাপাশি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গেও কিউবা শিক্ষা-সংক্রান্ত চুক্তি সম্পন্ন করেছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবান শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে এসে পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মূলত কিউবান সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরের পুঁজিবাদী জগৎকে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করতে চায়।

মার্কিনিরা কিউবানদের কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে কিউবান নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিউবায় শিক্ষকদের মাসিক সম্মানী অন্যান্য পুঁজিবাদী দেশের মতো ততটা বেশি না। এখানে শিক্ষকরা সর্বনিম্ন ৮,২১০ পেসো বা ৪০০ মার্কিন ডলার থেকে সর্বোচ্চ ২৬,১০০ পেসো বা ১,২৭০ মার্কিন ডলার মাসিক সম্মানী পেয়ে থাকেন। তবে সর্বোচ্চ মাসিক সম্মানী লাভের উপযুক্ত হতে একজন কিউবান শিক্ষককে মাস্টার্স ডিগ্রি ও নূ্যনতম ২০ বছর শিক্ষক হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। কিউবায় অবশ্য শিক্ষকদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার সবচেয়ে বেশি।

সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় ওখানে নাগরিকের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্র বহন করে। ফলে ওখানকার পেশাজীবীদের অপেক্ষাকৃত নিম্ন আয় তাদের জীবনযাপনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। কিউবানদের জীবনে বিলাসিতার সুযোগ নেই; বরং রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত আয়েই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তবে মানবিক ও সুশিক্ষা লাভের ফলে কিউবার জনগণের মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা কম। কিউবার সরকার ঠিক করে দেয় জনগণ কীভাবে কোথায় বসবাস করবে। ফলে ওখানে বিভিন্ন জাতি, সম্প্রদায় ও বর্ণের মানুষ একত্রে বসবাস করে। কিউবার সমাজ ব্যবস্থায় তাই বর্ণবাদের স্থান নেই।

লেখক: প্রবাসী শিক্ষার্থী