সব করোনা রোগী ভর্তি হতে পারছেন না হাসপাতালে


নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী মহানগরীর ষষ্ঠিতলা এলাকার বাসিন্দা আবু সাঈদ (৪২) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। শরীরিক সমস্যা শুরু হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা গত মঙ্গলবার (১ জুন) রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।

কিন্তু আবু সাঈদকে হাসপাতালে ভর্তি না নিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়। স্বজনেরা তখন হাসপাতালের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোন করলেও রোগীকে ভর্তি করাতে পারেননি।

রাতে বাড়ি নেয়ার পর আবু সাঈদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। বুধবার সকালে তাঁকে আবারও হাসপাতালে নেয়া হয়। কান্নাকাটির পর বহুকষ্টে স্বজনেরা আবু সাঈদকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভর্তি করাতে পারেন। কিন্তু ওয়ার্ডে গিয়ে কোন শয্যা পাননি। রোগীকে মেঝেতেই ফেলে রাখা হয়েছিল। রামেক হাসপাতালে করোনার রোগীদের জন্য এ রকমই জায়গার সংকট।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, করোনা রোগীদের জন্য হাসপাতালে আর মাত্র ১০টি শয্যা আছে। তাই সব করোনা রোগীকেই ভর্তি নেয়া হচ্ছে না। যেসব রোগীর অক্সিজেন সাচুরেশন কম বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যা বেশি কেবল তাঁদেরই ভর্তি করা হচ্ছে। অন্য রোগীদের বাড়িতেই আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা নিতে হবে। এছাড়া এখন কোন উপায় নেই।

করোনা রোগী আবু সাঈদের বোন রত্না খাতুন বলেন, মঙ্গলবার রাতে তাঁর ভাইয়ের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তাই তাঁকে জরুরি বিভাগে নেয়া হয়। সেখানে থাকা একটি অক্সিজেন মাস্ক দেয়ার আধাঘণ্টা পর তাঁর ভাই কিছুটা ভাল অনুভব করতে শুরু করেন। তাই ভাল আছেন জানিয়ে চিকিৎসক আর তাঁকে ভর্তি নেননি। তাই তাঁরা আবু সাঈদকে বাড়ি নিয়ে যান। রাত ২টার দিকে তাঁর আবারও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তখন অনলাইন ঘেঁটে একটি মোবাইল নম্বর বের করে অক্সিজেনের সিলিন্ডার অর্ডার দেন। তখন দেখা যায়, আবু সাঈদের অক্সিজেনের মাত্রা ৮৯। তাই সকালে তাঁকে আবারও হাসপাতালে আনা হয়। কিন্তু এবারও ভর্তি নেয়া হচ্ছিল না।

রত্মা বলেন, ‘ভাইকে হাসপাতালে ভর্তির জন্য তিনদিনে দুইবার টিকিট কেটেছি। কিন্তু ভর্তি করাতে পারিনি। যখন কান্নাকাটি শুরু করলাম, তখন জরুরি বিভাগ থেকে বলা হলো- ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরে আসেন। যেখানে বেড আছে, সেখানে দিব। রোগী ফেলে আমি যেতে পারলাম না বলে ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে দিল।

রামেক হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টায় নয়জন করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সমধ্যের মধ্যে তাঁরা মারা যান।

হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মারা যাওয়া নয়জনই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। এদের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচজন, রাজশাহীর দুইজন এবং নওগাঁ ও পাবনার একজন করে রোগী ছিলেন। বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁরা মারা যান।

ডা. সাইফুল ফেরদৌস আরও জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তি ছিলেন ২২৪ জন। এদের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৯৬ জন, রাজশাহীর ১০১ জন, নওগাঁর নয়জন, নাটোরের সাতজন এবং পাবনার ছয়জন রোগী ছিলেন। ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন ২৯ জন।

এর মধ্যে পাবনার একজন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১১ জন, রাজশাহীর ১৪ জন এবং নওগাঁর তিনজন রোগী ভর্তি হয়েছেন। হাসপাতালে এখন করোনা ইউনিটে মোট শয্যার সংখ্যা ২৩২টি। রোগী ভর্তির জায়গা না হওয়ায় শ্বাসকষ্ট না থাকলে রোগীকে হোম আইসোলেশনে থাকতে বলা হচ্ছে।

এদিকে হোম আইসোলেশনে থাকা এসব রোগীদের চিকিৎসার পরামর্শ দিতে করোনাকালের শুরুতে গত বছরের মার্চে চিকিৎসকদের মোবাইল নম্বর প্রকাশ করা হয়। উপজেলা পর্যায়ে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মোবাইল নম্বর প্রকাশ করে বলা হয়, এসব নম্বরে কল দিলেই মিলবে প্রাথমিক চিকিৎসা। মহানগর এলাকার জন্য সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তার মোবাইল নম্বরে কল দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। এছাড়া রামেক হাসপাতালের পক্ষ থেকেও ১৫ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দিয়ে একটি কমিটি করা হয়। তাঁদের মোবাইল নম্বরও প্রচার করা হয়।

এখন হাসপাতালে সব করোনা রোগী ভর্তি নেয়া হচ্ছে না বলে মোবাইল ফোনেই চিকিৎসা নেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের ফোনে পাওয়া যায় না। রামেক হাসপাতালের ১৫ সদস্যের সেই বিশেষজ্ঞ কমিটিও ফোনে আগের মত বিনামূল্যে চিকিৎসা দেন না। এমন অবস্থায় রাজশাহীতে করোনা রোগীরা অসহায় হয়ে পড়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ১৫ সদস্যের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের প্রধান রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আজিজুল হক আজাদ বলেন, ‘আমরা তো আর ফোনে চিকিৎসা দেই না। আমাদের ওই কমিটি ইনভ্যালিড হয়ে গেছে।’

হাসপাতালে সব করোনা রোগী ভর্তি না নেয়া এবং ফোনে চিকিৎসা দেয়া কমিটি অকার্যকর হয়ে পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘ওই কমিটি যে ইনভ্যালিড হয়ে গেছে সেটা তো জানি না। ভাল কথা মনে করেছেন। দেখি, আমি এখনই কথা বলব। আবার আমাদের ফোনে চিকিৎসা দিতে হবে।’

তিনি জানান, হাসপাতালে কোন করোনা রোগী এলে জরুরি বিভাগের পাশের ৩৯ ও ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে নেয়া হয়। ওয়ার্ড দুটিকে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে রোগীর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা দেখা হয়। অক্সিজেন মাত্রা ৯০ এর নিচে নামলে তাঁকে ভর্তি নেয়া হয়। এর উপরে থাকলে নেয়া হয় না। একজন স্বাভাবিক মানুষের দেহে অক্সিজেনের মাত্রা থাকে ৯৩ এর উপরে।

হাসপাতাল পরিচালক জানান, রোগীর অক্সিজেন মাত্রা ৯০ থেকে ৯৩ এর মধ্যে থাকলে তাঁকে পর্যবেক্ষণ ওয়ার্ডে কিছুক্ষণ রেখে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। জায়গার অভাবে সবাইকে ভর্তি নেয়া যাচ্ছে না। হাসপাতালে কয়েকদিন পর পরই অন্য রোগীদের ওয়ার্ডকে করোনা ওয়ার্ড করা হয়েছে। এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। এটি করতে গেলে অন্য রোগী রাখার জায়গা মিলছে না।

উত্তরবঙ্গের বৃহৎ এই হাসপাতালে রাজশাহী ছাড়াও চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, জয়পুরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহের রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। এখানে মোট শয্যার সংখ্যা ১ হাজার ২০০।

এর মধ্যে ২৩২টি কোভিডের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এতেও জায়গা সংকুলান না হওয়ায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাজশাহী সদর হাসপাতালটি চালুর প্রস্তাব দিয়েছে রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাহলে সদর হাসপাতালে রামেক হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ড পাঠিয়ে দেয়া গেলে এখানে কোভিডের ওয়ার্ড বাড়ানো যাবে।

এ জন্য বৃহস্পতিবার দুপুরে বিভাগীয় কমিশনার ড. হুমায়ুন কবীর সদর হাসপাতাল পরিদর্শন করতে যান। এ সময় তাঁর সঙ্গে জেলা প্রশাসক আবদুল জলিল, রামেক হাসপাতালের পরিচালকসহ গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। এই হাসপাতালটি এবার চালু হতে পারে।

রামেক হাসপাতাল পরিচালক বলেন, রামেক হাসপাতাল ছাড়া রাজশাহীতে আর কোন হাসপাতালে ওয়ার্ডে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ লাইন নেই। থাকলে সেটাকে করোনার চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা যেত। তাই সব রোগীর চাপ রামেক হাসপাতালে। রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের রোগীরা এখানে আসছেন চিকিৎসা নিতে। এখন জায়গা সংকুলানই বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।

তিনি জানান, রাজশাহী সদর হাসপাতালটি চালু করা গেলে রামেক হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ড সেখানে স্থানান্তর করা যাবে। তাহলে রামেক হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ড বাড়ানো যাবে। সদর হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ লাইন নেই বলে সেখানে করোনার চিকিৎসা হবে না।

সর্বশেষ রামেক হাসপাতালের এক নম্বর ওয়ার্ডটিকে করোনা ওয়ার্ড করার চেষ্টা চলছে। এখন সাধারণ রোগী অন্যত্র না সরালে রামেক হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ড বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। এ কারণেই সদর হাসপাতালের দিকে নজর দেয়া হচ্ছে।

এসবি/আরআর/জেআর