সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বাস্থ্যসেবাকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি


ফজলে হোসেন বাদশা

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস মহামারির গভীর সংকট ছুঁয়েছে বাংলাদেশকেও। পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে সংক্রমণের ধারা এভাবে বাড়তে থাকলে দেশের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি দুটোই ধ্বংস্তূপে পরিণত হতে পারে। মার্চ থেকেই আমরা দেখেছি, লকডাউন ও কঠোরভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে দোদুল্যমানতা কাজ করেছে। এই মহামারি বিশ্বের বেশিরভাগ রাষ্ট্রের সক্ষমতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। আমাদের দেশেও স্বাস্থ্যসক্ষমতা ভীষণরকম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আর এর পেছনে সব থেকে বেশি কাজ করেছে, দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যখাতকে চরম অবহেলা করা ও এই খাতকে ঘিরে ‘নিজ কোলে লাভের ঝোলটানা বাহিনী’র দোর্দণ্ড ভূমিকা।

আমরা এই মহামারির মধ্যেও এসব নিয়ে নানা আলোচনায় নানা কথা শুনছি। কিন্তু রাষ্ট্র তার জনগণের স্বাস্থ্যসুরক্ষায় কোন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পথ চলছে এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে যদি কোনো বিচ্যুতি থাকে, তাহলে তার উৎস ঠিক কোনখানে, তা চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ সংহত করা সম্ভব নয়।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি যে দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তার মূলভিত্তিই বাহাত্তরের সংবিধান। এর ১৮ (১) অনুচ্ছেদে “জনস্বাস্থ্য” সংক্রান্ত বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থাপনা জনসাধারণের জন্য রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়বদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করা রয়েছে। শুধু তাই নয়, সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে অন্তর্ভুক্ত বিধানগুলি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে, বুঝতে কষ্ট হয় না যে, বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদিত নেতৃত্বে সংবিধানের কাঠামোকারীদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে দূরদৃষ্টি ছিলো এবং সে কারণেই প্রয়োজনের সময়ে জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নিয়ে কী করণীয় সে সম্পর্কে যথাসাধ্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন তারা।

ধরা যাক, সংবিধানের ১৫ (ঘ) অনুচ্ছেদের কথা। সেখানে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্যলাভের অধিকার।’ অর্থ্যাৎ সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ বলছে, সামাজিক নিরাপত্তা লাভের অংশ হিসেবে আরও বেশ কটি ক্ষেত্রের সঙ্গে রোগাক্রান্ত হলে সরকারি সহায়তা লাভের অধিকার নাগরিকের থাকবে। জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নিয়ে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের এমন দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা পেলে তা অবশ্যই কল্যাণরাষ্ট্রে উত্তরণের একটি নিয়ামক হয়ে উঠবে।

কিন্তু বাংলাদেশে আমাদের আফসোসের অন্ত নেই। একথা নতুন করে বলার আর কিছু নেই যে, ১৯৭৫ সালের পর থেকে নানাভাবে বাংলাদেশের উল্টোযাত্রা শুরু হয়। আর তারই ধারাবাহিকতায় এই সুদীর্ঘ সময়ে আমরা রাষ্ট্রের কল্যাণমুখি দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমে খসে পড়তে দেখেছি। সব মানুষের জন্য রাষ্ট্র গড়ার উদ্দেশ্যে প্রণীত সংবিধানকে বারবার উপেক্ষিত হতে দেখেছি। আর সে কারণেই সংবিধান-চর্চা ক্রমেই গুরুত্ব হারিয়েছে নানা মহলে। ফলে যেকোনো পরিস্থিতিতে সংবিধানের পুনর্পাঠ ও প্রয়োজনে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ ক্রমশ ফিকে হয়ে এসেছে। আর সেই চোরাগলি দিয়েই সুযোগসন্ধানী বিভিন্ন মহল রাষ্ট্রটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাবার পথে অনেকটাই সফল হয়েছে। আমাদের জনস্বাস্থ্যসেবা খাতটিও সেই তাদেরই খপ্পরে পড়ে খাবি খেতে খেতে মুখ থুবড়ে পড়তে বসেছে।

ভেবে দেখুন, পরিস্থিতি এমনই দাঁড়িয়েছে যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মস্তিস্কপ্রসূত একটি অসাধারণ উদ্যোগ কমিউনিটি ক্লিনিক সম্ভাবনার জন্ম দিলেও ভ্রুনেই থেকে গেছে। বিকশিত আর হতে পারেনি। সেটা হলেও হয়তো তৃণমূলে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটা ভিত্তি গড়ে উঠতো। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে হতাশার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। যেমন, শ্রীলঙ্কায় স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ, ভিয়েতনাম ২ দশমিক ৫৫, থাইল্যান্ড প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ আমাদের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ, যা ভারতের (০.৮%) চেয়ে কম, এমনকি পাকিস্তানকেও (০.৭%) অতিক্রম করতে পারেনি। এটা কি ন্যায্যতা?

আমি এখানে দুটো কারণে শ্রীলংঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, নিউজিল্যান্ড, কিউবা এবং ভারতের একটি রাজ্য কেরালার দিকে গভীর মনোযোগের দাবি করবো। কারণ দুটির মধ্যে একটি হলো, জনস্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি এবং দ্বিতীয়টি, আর্থিক বরাদ্দ ও সম্পদের যথাযথ ব্যবহার। আমাদের দেশের সাধারণ প্রচলন হচ্ছে, যাদের চিকিৎসা নেয়ার সক্ষমতা নেই, তারা সরকারি হাসপাতালে যান। যার কিছু সক্ষমতা আছে এবং মধ্যবিত্ত, তারা মূলত ভারতের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বাণিজ্যের খোরাক। আর যারা বিত্তবান তাদের জন্য এয়ারঅ্যাম্বুলেন্স আছে। সিঙ্গাপুর-থাইল্যান্ড মায় পৃথিবীর যেকোনো স্থানেই তারা চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন। এখন এই যে, জনস্বাস্থ্য নিয়ে রাষ্ট্রের যে দৃষ্টিভঙ্গি, তার নাগরিকদের যে অপ্রাপ্তি, সেটিকে দূর করতে হলে এই করোনাকালেই আমাদের সংবিধানটির পুনর্পাঠ জরুরি।

আমাদের সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ দুটি অংশের একটি হলো, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি আর অন্যটি হলো, মৌলিক অধিকার। সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগে রয়েছে মূলনীতি আর তৃতীয়ভাগে মৌলিক অধিকার। আমাদের আলোচ্য পুনর্পাঠে এই দুটি অংশকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা জরুরি। মৌলিক অধিকারে ভুক্ত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে সংবিধানের ২৬ (২) ধারায় স্পষ্ট করা হয়েছে, এই বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো আইন রাষ্ট্র প্রণয়ন করতে পারবে না এবং করলে তা বাতিল হবে। অর্থাৎ এই রক্ষাকবচ আমাদের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন রোধে আইনি ভিত্তি দেয়। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি সম্পর্কে সংবিধানের ৮ (১) ও (২) অনুচ্ছেদ স্পষ্ট করে যে, মূলনীতিতে ভুক্ত বিষয়গুলো রাষ্ট্র ও নাগরিকের কাজের ভিত্তি গঠন করলেও “বিচারিকভাবে প্রয়োগযোগ্য”হবে না। অর্থ্যাৎ আদালতের মাধ্যমে এর প্রয়োগ নিশ্চিত করার সুযোগ নেই।

এখন লক্ষ্যণীয় যে, আমাদের দেশের সংবিধানে স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকারে যুক্ত না করলেও, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে তা অন্তর্ভুক্ত। সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগ, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলো উল্লেখ করা আছে, তার ১৮ (১) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন।” আবার “চিকিৎসা” শব্দটিকে সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগেই রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ১৫ (ক) অনুচ্ছেদে খাদ্য, পোশাক, আশ্রয় ও শিক্ষার সাথে “জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ” হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

এখন যে মুশকিলটি দাঁড়িয়েছে, সেটি হলো, যেহেতু সংবিধানের তৃতীয়ভাগে অর্থাৎ মৌলিক অধিকারের মধ্যে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নেই, রয়েছে দ্বিতীয়ভাগে অর্থাৎ মূলনীতির মধ্যে, কাজেই এই দুটো ক্ষেত্রে যথাযথ প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত হলে সরাসরি আইনের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ থাকছে না। কাজেই করোনাকালের এই সংকট এবং ভবিষ্যতে এমন অনাগত আরও সংকট মোকাবেলার প্রশ্নে আমাদের রাষ্ট্রটিকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারে অন্তর্ভুক্ত করা একটি প্রাসঙ্গিক ও জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমরা স্পষ্টতই মনে করি, যে দর্শন নিয়ে এই রাষ্ট্রের জন্ম, তার সংবিধানই যেকোনো সংকটকালে উত্তরণের পথ দেখাতে পারে। শুধু চাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাধিকার দেয়া। হয়তো করোনা আমাদের অনেককিছু কেড়ে নেবে। তারপর আরও অনেক দুর্যাগের মতো করোনাকালেরও অবসান ঘটবে। একটি দুঃসহ স্মৃতি হয়ে এই কাল প্রজন্মান্তরে রয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমরা যদি জনস্বাস্থ্যসেবা এই রাষ্ট্রের সব মানুষের জন্য নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে অনাগত যেকোনো মহামারিতেও আমরা বুক চিতিয়ে লড়তে পারবো। আগামীর বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের উন্নয়ন-দর্শন নিয়ে এগিয়ে যেতে বাংলাদেশের জন্য যেটা ভীষণ ভীষণই জরুরি।

লেখক: রাজনীতিক ও জাতীয় সংসদ সদস্য