শতবর্ষী ভবনে হাতুড়ির আঘাত

  • 7
    Shares

নিজস্ব প্রতিবেদক: একে একে রাজশাহীর প্রায় সব পুরনো স্থাপনাই ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এবার হাতুড়ির আঘাত পড়ছে লক্ষ্মীপুর বহুমুখী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের একটি শতবর্ষী ভবনে। দোতলা এ ভবনটির ওপরের তলা ইতোমধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে। এখন নিচতলার ছাদ ভাঙার কাজ চলছে।

স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা জানান, প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর এ ভবনটি একটি বাড়ি ছিল। বাড়ির মালিক ছিলেন জোতদার মনি বাবু। দেশভাগের পর মনি বাবু ও তাঁর ভাই দেবল বাবু স্বপরিবারে ভারতে চলে যান। ১৯৬০ সালে মনি বাবুর বাড়িটি স্কুল হয়।

এরপর শুধু দোতলা ওই ভবনেই পাঠদান চলত। ১৯৯৩ সালে ওই বাড়ির পাশে থাকা আরও জমিতে নতুন ভবন ওঠে। তারপর আরো কয়েকটি স্কুলের ভবন করা হয়েছে মনি বাবুর রেখে যাওয়া জমিতে। এখন ছয়তলা নতুন ভবন করতে মনি বাবুর স্মৃতি চিহ্নটুকু বিলিন করে দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে স্কুলের শিক্ষকদের মাঝেই ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক আইরিন জাফর বলেন, ‘ভবনটার বয়স ১০০ বছরেরও বেশি। শুনেছি, মনি বাবু নামে একজন ব্যক্তির বাড়ি ছিল এটা। এখন বর্ষায় পানি চুইয়ে পড়ত। ২০১১ সালে আমি এখানে এসেছি, নিচতলায় আমার অফিস থাকলেও ভেঙে পড়ার ভয়ে কোনদিন দোতলায় উঠিনি। এখন নতুন ভবন করার জন্য ভাঙতে হচ্ছে।’

বুধবার সকালে স্কুলটিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকের পাশেই এই ভবনটি ভাঙার কাজ করছেন কয়েকজন শ্রমিক। বড় হাতুড়ি আর শাবলের আঘাতে আঘাতে ভাঙা হচ্ছে ছাদ। সুরকি আর ইটের মোটা দেওয়ালের ওপরের ছাদের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে লোহার স্লিপার। দোতলাটি ইতোমধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে।

নিচতলায় ঢুকে দেখা গেল, ছয় দরজার দৃষ্টিনন্দন বারান্দাটি পার হয়ে ভেতরে ঢুকলেই একটা বড় ঘর। এর ডানদিকে একটা ছোট ঘর। বামে আরও দুটি ঘর এবং একটি শৌচাগার। এই জায়গাটি থেকে একটু সামনে এগোলে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। সিঁড়ির দু’পাশে আরও দুটি বড় বড় ঘর। সিঁড়ির সামনে পেছনের দিকে চার দরজার লম্বা বারান্দা। ভেতরের ঘরগুলোর একটি থেকে আরেকটিতে যাওয়ার জন্য রয়েছে দরজা।

নিচতলার ঘরের একটা দেয়ালে এখনও ক্যালেন্ডার ঝুলছে। প্রধান শিক্ষকের কক্ষটির দরজার সামনে ঝুলছে নামফলকও। একজন শিক্ষক জানালেন, ভবন ভাঙার কাজ শুরু করার পর নিচতলার আসবাবপত্র সরানো হয়েছে। ১০ দিন আগে হঠাৎ করেই তাঁরা দেখছেন, শ্রমিকেরা এসে ভবন ভাঙার কাজ শুরু করেছেন।

ভবন ভাঙার কাজ তদারকি করছিলেন ঠিকাদার আসগর আলী। তিনি বলেন, ‘ভবনটা দর্শনীয় ছিল। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণও ছিল। আমি টাকা দিয়ে ভবনের সবকিছু কিনে নিয়েছি।’ প্রধান শিক্ষক জানান, ভবনের মূল্য নির্ধারণ হয়েছিল ৪ লাখ ৮৯ হাজার। তিনি ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। ঠিকাদার তাঁর শ্রমিক দিয়ে ভেঙে সবকিছু নিয়ে যাবেন।

এ ধরনের একটা পুরনো ভবন ভেঙে ফেলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হেরিটেজ রাজশাহীর প্রতিষ্ঠাতা মাহবুব সিদ্দিকী। তিনি রাজশাহীর ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করেন। মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘আমাদের দেশ বলেই এত পুরনো ভবনটা ভেঙে ফেলা হলো। অন্য দেশ হলে এটা সংষ্কার হতো, বছরের পর বছর এটা টিকে থাকত। প্রত্নতত্ব বিভাগ চাইলেই এটাকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে পারত।’

স্কুলের প্রধান শিক্ষক আইরিন জাফর জানান, এ বিষয়ে তিনি কখনও প্রত্নতত্ব বিভাগের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে এই জায়গায় নতুন ভবন করার সিদ্ধান্ত হলে শতবর্ষী ভবনটার বিষয়ে তিনি জেলা প্রশাসক আবদুল জলিলকে জানিয়েছিলেন। জেলা প্রশাসক বলেছেন, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি যা সিদ্ধান্ত নিবে সেভাবে কাজ করা যাবে। তারপর ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভবনটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক আবদুল জলিল বলেন, ‘শতবর্ষী কোন ভবনের সঙ্গে যদি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি জড়িয়ে থাকে তাহলে সেটি বিবেচনা করা হতো। আর কোন ভবন যদি প্রত্নতত্ব বিভাগের গেজেটভুক্ত হয়, তাহলে সেটা ভাঙা যায় না। এটার ক্ষেত্রে এমন কিছু নেই। সে কারণে ম্যানেজিং কমিটির ওপরেই সবকিছু ছেড়ে দেওয়া হয়।’

শতবর্ষী এ ধরনের ভবন ভেঙে ফেলার খবর শুনেই অবাক হন প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা। তিনি বলেন, ‘এ রকম শতবর্ষী ভবনের কথা তো আমাদের জানানোই হয়নি। জানলে আমরা সংরক্ষণ করতাম। তাও এখনই আমি একজন কর্মকর্তা পাঠাচ্ছি। সংরক্ষণের মতো হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এসবি/আরআর/এমই


  • 7
    Shares