লাইসেন্স নিয়ে হরিণ পালনের সুযোগ


সাহেব-বাজার ডেস্ক : প্রকৃতির মধ্যে সুন্দরতম বন্য প্রাণীর নাম হরিণ। হরিণ পালন আমাদের সমাজে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। যে বাড়ীতে হরিণ পালন হয় সে বাড়ির মালিকের পরিচিতি সর্বত্র ছড়িয়ে যায়। এই পরিচিতিতে তিনি অবশ্যই আনন্দিত ও গৌরবান্বিত হন মনে মনে। সেই সাথে আগন্তুক বা জনসাধারনও বিনোদনের খোরাক পান। আর বিশেষ করে ছোট ছেলে মেয়েদেরতো সীমাহীন আনন্দের উৎস হয় এই হরিণ-হরিণী।

সারাবিশ্বে প্রাপ্ত হরিণের প্রজাতিকে পাঁচটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। এই শেণীতে ৬০টিরও অধিক উপপ্রজাতির হরিণ রয়েছে। বাংলাদেশে পাঁচ প্রজাতির হরিণ পাওয়া যেত। এগুলো হচ্ছে সাম্বার হরিণ, মায়া হরিণ, চিত্রল হরিণ, বারোশিঙা হরিণ ও পারা হরিণ। এদের মধ্যে শেষ দুটি প্রজাতি বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় দুই লাখ চিত্রল হরিণ রয়েছে। চিত্রল হরিণের মূল বসতি এলাকা সুন্দরবনে রয়েছে প্রায় দেড় লাখ। নিঝুম দ্বীপে রয়েছে ১২ থেকে ১৫ হাজার। এ ছাড়া চর কুকরিমুকরি, বাঁশখালীসহ উপকূলীয় বনে বিচ্ছিন্নভাবে হরিণের বসতি রয়েছে।

চিত্রল হরিণকে গভীর জঙ্গল ও তৃণাচ্ছাদিত ভূমিতে বিচরণ করতে দেখা যায়। এই হরিণ জন্মগতভাবে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার প্রাণী। এই হরিণের শরীর লালচে বাদামী বর্ণের লোম দ্বারা আবৃত থাকে। এছাড়াও সাদা বর্ণের ডোরাকাটা দাগ থাকায় এদের ডোরাকাটা হরিণও বলা হয়।

চিত্রল হরিণ ৩৫-৩৭ ইঞ্চি পর্যন্ত উচ্চতা বিশিষ্ট হয়। পুরুষ হরিণের শাখাযুক্ত অ্যান্টলার থাকে যা ৩৯ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এরা ঘাস, লতাপাতা ও ফলমূল খায়। এছাড়াও দিনে অন্তত একবার পানি পান করে। হনুমান ও বানর জাতীয় প্রাণীদের সাথে এদের বন্ধুত্ব রয়েছে। এসকল প্রাণীর ফেলে দেয়া পাতা ও ফলমূলের জন্য দলবেঁধে এই হরিণ গাছতলায় আসে। এছাড়াও কোনো বিপদের সম্ভাবনা বুঝতে পারলে প্রাণীগুলো উঁচু গাছ থেকে হরিণদের পালিয়ে যেতে সংকেত দেয়।

চিত্রল হরিণ প্রায় সারাবছরই প্রজননের জন্য প্রস্তুত থাকে। এদের গর্ভধারণকাল ২২৫-২৩৫ দিন পর্যন্ত হয়ে থাকে। এরা সচরাচর একটি বাচ্চা প্রসব করে। তবে কালেভদ্রে দুটি বাচ্চাও প্রসব করে। সংখ্যায় হ্রাস পেতে থাকলেও এখনও এই হরিণ প্রচুর সংখ্যায় রয়েছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অনুমতিক্রমে কিছু শর্ত সাপেক্ষে এই হরিণ পারিবারিকভাবে পালন করার অনুমতি রয়েছে।

চিত্রা হরিণ পালন বেশ লাভজনক। গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া এবং হাঁস-মুরগির মাংসের তুলনায় হরিণের মাংস অবশ্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল। সম্ভবতঃ সেটা অনেকটা দুষপ্র্যাপ্যতার কারণেই হবে। সে সুযোগটা কাজে লাগিয়ে বসতভিটায় হরিণ পালনের মাধ্যমে আয়-রোজগার করার ধ্যান-ধারণা তাই হয়েতো অবাস্তব কিছু হবে না।

বনের চিত্রল হরিণ এখন থেকে ঘরে ও খামারে পোষা যাবে। তবে এ জন্য পালনকারীকে হরিণের বসবাস উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এ জন্য একটি নীতিমালা অনুমোদন করেছে। এতে বন বিভাগকে হরিণ পোষার অনুমতির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং এর জন্য ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বন বিভাগ দেশের বিভিন্ন বন অফিস থেকে হরিণ পোষার অনুমোদন দিতেও শুরু করেছে।

পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, ঢালাওভাবে হরিণ পালনের অনুমতি দিলে এর অপব্যবহার হতে পারে। বন্য হরিণ আরও বিপন্ন হতে পারে। বাংলাদেশ বন্য প্রাণী আইন (সংরক্ষণ, সংশোধন), ১৯৭৪-এর আওতায় চিত্রল হরিণ পোষাসংক্রান্ত নীতিমালা-২০০৯ অনুমোদন করেছে সরকার। তবে চিত্রল ছাড়া অন্য কোনো হরিণ পোষা যাবে না। কেউ অন্য হরিণ পুষলে তার বিরুদ্ধে বন্য প্রাণী আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগে বন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় হরিণ লালন-পালনের অনুমোদন দিত। এ ক্ষেত্রে বন বিভাগের কাছ থেকে প্রাথমিক অনুমোদন নিতে হতো। এই নতুন নীতিমালায় চিত্রল হরিণ লালন-পালন ও ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে।

নীতিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে, চিত্রল হরিণ পাওয়া যায় এমন বনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে এই হরিণ পোষা যাবে না। ব্যক্তি পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১০টি চিত্রল হরিণ পোষা যাবে। এর বেশি হলে খামার হিসেবে অনুমতি নিতে হবে। বন বিভাগ ও চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী হরিণ বিক্রি করতে পারবে। তবে হরিণ কিনতে হলে বন বিভাগের কাছ থেকে ‘পজেশন সার্টিফিকেট’ নিতে হবে।

খামার ছাড়া অন্যত্র অর্থাৎ ব্যক্তিগতভাবে বা বাসাবাড়িতে চিত্রল হরিণ পোষার অনুমোদন ফি ধার্য করা হয়েছে ৫০০ টাকা। মহানগর এলাকায় প্রতি খামারের জন্য অনুমোদন ফি দুই হাজার টাকা। জেলা সদর এলাকায় প্রতি খামারের জন্য ফি আড়াই হাজার টাকা। অন্য এলাকায় খামারের জন্য ফি দুই হাজার টাকা। প্রতিটি হরিণের জন্য পজেশন ফি ১০০ ও নবায়ন ফি বছরে ১০০ টাকা।

খামারের হরিণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বন সংরক্ষক ও ব্যক্তিগত হরিণের ক্ষেত্রে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে বার্ষিক প্রতিবেদন দিতে হবে। হরিণ পরিণত হলে তার মাংস খাওয়া যাবে। তবে বাচ্চা প্রসব করলে বা মারা গেলে ঘটনা ঘটার ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের কাছে তা জানাতে হবে। হরিণের মাংস বা কোনো অঙ্গ স্থানান্তর করতে হলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে স্থানান্তর অনুমোদন নিতে হবে। কাউকে হরিণ দান করতে হলেও বন বিভাগকে অবহিত করতে হবে।

সুন্দরবনে অন্যায়ভাবে প্রতিদিন কত হরিণ শিকার হচ্ছে তার কোনো খতিয়ান পাওয়া যায় না। প্রাকৃতিক গুরুত্বের কারণে সুন্দরবনকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষণা করা হয়েছে। একটি সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখতে সর্বস্তরের জনগণের সচেতন প্রয়োজন। সুন্দরবনের হরিণ রক্ষার পাশাপাশি দেশের চিড়িয়াখানা ও খামারে ব্যাপকভাবে হরিণের প্রজনন ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার।

বর্তমানের চিত্রল হরিণ অন্যান্য প্রজাতির হরিণের মতন বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যেহেতু চিড়িয়াখানাগুলোতে চিত্রল হরিণ অত্যন্ত সহজে পোষা সম্ভব হচ্ছে সেহেতু বসতভিটায়ও হরিণ পোষা বাস্তব দিক থেকে সম্ভব।

 

এসবি/এমই