রোমানিয়া এসেও থাকতে চাইছেন না বাংলাদেশিরা


সাহেব-বাজার ডেস্ক : সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ উপায়ে রোমানিয়া সীমান্ত পার হতে গিয়ে বা কাজে যোগ না দেওয়ায় গ্রেপ্তার হচ্ছেন বাংলাদেশিরা। বুখারেস্টে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের অভিযোগ- ঢাকা থেকে দেশটিতে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াতেই রয়েছে ত্রুটি। অন্যদিকে অভিবাসীরা বলছেন, তাদের দেওয়া আশ্বাস আর বাস্তবতায় বিরাট ফারাক। খবর ডয়েচে ভেলের।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দক্ষ ও অদক্ষ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে বর্তমানে আকর্ষণীয় দেশে পরিণত হয়েছে রোমানিয়া। বিদেশি কর্মীদের জন্য কয়েক হাজার ভিসা চালু করেছে দেশটির সরকার। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যভুক্ত দেশটিতে আসছেন বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিকরা। রোমানিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত দাউদ আলী ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানান, দেশটিতে গত দুই বছরে ভিসা

পয়েছেন ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি। রাষ্ট্রদূতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণ, সেবা, জাহাজ-নির্মাণশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে তারা ৪০০ থেকে এক হাজার ইউরো বেতনে চাকরি পেয়েছেন। এর সঙ্গে অনেক চাকরিদাতা থাকার ব্যবস্থা, খাওয়ার ভাতা এবং আলাদাভাবে বাড়তি সময়ের মজুরিও দিচ্ছেন, যার কারণে অভিবাসীরা তাদের আয়ের বেশির ভাগই বাংলাদেশে পাঠানোর সুযোগ পান বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তারপরও রোমানিয়া ছাড়ছেন তারা

এই সুবিধাগুলোর পর অনেক বাংলাদেশি রোমানিয়ায় আসার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য দেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছেন। তাদের বড় অংশের লক্ষ্য ইতালি। রোমানিয়ায় নির্দিষ্ট কোম্পানির কাজের চুক্তিপত্র নিয়ে বৈধভাবে আসার পরও শেষ পর্যন্ত তারা অবৈধ উপায়ে দেশটিতে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছেন। ১৬ আগস্ট রোমানিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইনফোমাইগ্রেন্টকে জানিয়েছে, বর্তমানে সেখানে ১ হাজার ৬৭৬ জন বাংলাদেশি বৈধভাবে বসবাসের অনুমতি নিয়ে আছেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৫০৬ জনের চাকরি রয়েছে। কিন্তু দেশটিতে ভিসা নিয়ে আসা মোট অভিবাসীদের তুলনায় এই সংখ্যা অনেক কম।

রোমানিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হলেও শেঙ্গেনভুক্ত নয়। বিশেষ ভিসায় আসা বাংলাদেশি কর্মীদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য দেশে যাওয়ার অনুমতি নেই। কিন্তু নিজেদের লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা ট্রাকে করে ইতালিতে যাওয়ার জন্য মানবপাচারকারীদের দ্বারস্থ হন। ইনফোমাইগ্রেন্টসকে এক অভিবাসী জানান, মানবপাচারকারীরা এই যাত্রার জন্য জনপ্রতি সাড়ে তিন হাজার ইউরো করে নেন।

পরিণামে গ্রেপ্তার

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অবৈধ উপায়ে রোমানিয়া সীমান্ত পার হতে গিয়ে কয়েক ডজন বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের কয়েকজনকে অভিবাসন বিধিভঙ্গের অভিযোগে দেশেও ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত দাউদ আলী। রোমানিয়া থেকে এভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য দেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করায় বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ইনফোমাইগ্রেন্টসকে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘অনেক বাংলাদেশি রোমানিয়ায় আসছেন এই লক্ষ্য নিয়ে যে, যখনই সুযোগ পাবেন তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য দেশে চলে যাবেন। এই ইইউ দেশটিতে বৈধভাবে আসা সহজ। এরপর সহজেই সড়কপথে কেউ অন্য দেশে চলে যেতে পারেন।’

কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় গলদ

রোমানিয়া গত বছর ৪০ হাজার বিদেশি কর্মীকে ভিসা দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এরপর চলতি বছর এই সংখ্যা এক লাখে উন্নীত করা হয়। বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান ও ভিয়েতনাম থেকে কর্মী আনার চিন্তা করেই এই উদ্যোগ নেয় দেশটির সরকার। কিন্তু দাউদ আলী মনে করেন, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা নিয়োগ প্রক্রিয়া। শুধু রোমানিয়ায় কাজ করতে আগ্রহীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে সরকারের আরও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, ‘বাংলাদেশ যত বেশি সম্ভব কর্মী পাঠাতে চেয়েছে। কিন্তু ঢাকা থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়ার সময় কোনো চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স ছিল না। রিক্রুটমেন্ট সংস্থাগুলো এই ক্ষেত্রে কারা রোমানিয়ায় কাজ করতে ইচ্ছুক, কারা নন সেটি যাচাই করেনি। তারা শুধু যারা টাকা বেশি দিতে রাজি ছিল তাদের পাঠিয়েছে।’

রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন তিনি।

অভিবাসীরা যা বলছেন

একটি কারখানায় কাজ নিয়ে কয়েক মাস আগে রোমানিয়া আসেন রিফাত হোসেন ইরান। তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে যেমনটা শুনে তিনি এসেছেন তার সঙ্গে বাস্তবতার বিরাট ফারাক রয়েছে। কাজ অনুযায়ী বেতন না পাওয়া, সময়মতো বেতন না দেওয়া, সেই সঙ্গে রিক্রুটিং এজেন্সিকে নিয়মিত কমিশন দিতে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। বলেন, ‘ইউরোপে কাজ করলেও আমাদের সঙ্গে এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যেন আমরা মধ্যপ্রাচ্যে আছি।’

এই অভিবাসী জানান, আসার আগে তাকে মাসিক ৬০০ ইউরো বেতন ও ওভারটাইমের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু একটি ওয়্যারহাউসে কাজ করে তিনি এখন মাসে মাত্র ৪০০ ইউরো আয় করেন, যা তার জন্য যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশি এই অভিবাসী জানান, কাজের অনুমতিপত্র পেতে রিক্রুটিং এজেন্সিকে সাড়ে সাত লাখ টাকা দিয়েছেন তিনি, যার পুরোটাই ঋণ করেছেন। এই টাকার তার তিন বছরের মধ্যে শোধ করার কথা ছিল। হতাশ ইরান বলেন, ‘রোমানিয়া এক মরীচিকা, এখানে আশার পর আমি সেটা বুঝতে পেরেছি।’ তিনি জানান, তার অনেক বন্ধু এরই মধ্যে ইতালি চলে গেছেন। ভবিষ্যতের তিনিও একই উপায় বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

তবে বুখারেস্টে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রোমানিয়াকে মোটেও মরীচিকা মনে করেন না। কেন বাংলাদেশিরা দেশটি ছেড়ে যেতে চান সেটিও তার বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, রোমানিয়ায় কাজের অনেক সুযোগ আছে। কিন্তু কিছু অভিবাসী সেখানে কাজ করতে চান না। তারা চান, অবৈধ পথে অন্যত্র চলে যেতে।

 

এসবি/এমই