রাজশাহীর হিমাগারে পঁচছে ৬০ লাখ বস্তা আলু

  • 1
    Share

নিজস্ব প্রতিবেদক : আলুর মৌসুমের সময় চলছিল লকডাউন। সে সময় দামও ছিলো কম। আলুচাষিরা লাভের আশায় হিমাগারে ৯৪ লাখ বস্তা আলু মজুদ করেছিলেন। এখন রাজশাহী হিমাগারগুলো ৬০ লাখ বস্তা আলু রয়েছে। কিন্তু সেই লাভের আশা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজশাহীর মাঠে মূলত কার্ডিনাল, ডায়মন্ড ও অ্যাস্টেরিক জাতের আলু বেশি চাষ হয়। এসব আলুর ফলনও বেশি। এসব আলু এক বছরের বেশি হিমাগারে রাখাও সম্ভব নয়। তার ওপর আরেকটা আবাদ মৌসুম আসন্ন। এখন হিমাগার মালিকরা আলু সরিয়ে নেওয়ার জন্য তাগাদা দিচ্ছেন। ফলে কয়েক হাজার আলুচাষি মজুত আলু নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়েছেন।

রাজশাহীর আলুচাষিরা জানিয়েছেন, মৌসুমে কম দামের কারণে হিমাগার ভাড়া করে আলু রাখা হয়। হিমাগার থেকে আলু ছাড়িয়ে বাজারে বিক্রি করার সাহস পাচ্ছেন না। এবার বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছেন যাচ্ছেন। দাম কমে যাওয়ায় হিমাগার ভাড়ার টাকাও পরিশোধ করতে পারছেন না। রাজশাহীর কয়েক হাজার আলুচাষি অর্থ সঙ্কটে আসন্ন মৌসুমে আবাদ করতে পারবেন কিনা-তাও অনিশ্চিত।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্র থেকে জানা গেছে, গত মৌসুমে রাজশাহীতে ৩৯ হাজার ৬২৯ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়। মৌসুম ভালো থাকায় আলুর ফলন হয়েছিল ৯ লাখ ৭৫ হাজার টন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতি মৌসুমের মতো গত মৌসুমেও চাষিরা রাজশাহীর ৩৭টি হিমাগারে ৯৪ লাখ বস্তা আলু মজুত রেখেছিলেন। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে বছরের অধিকাংশ সময় হাটবাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সামাজিক-রাজনৈতিক অনুষ্ঠানাদি বন্ধ ছিল। ফলে রাজশাহী থেকে রাজধানী ঢাকাসহ অন্য জেলাগুলোতে আলুর চালান হয়নি। ফলে মজুত আলুর বেশির ভাগই হিমাগারে পড়ে আছে।

শিক্ষকতার পাশাপাশি আলু চাষ করেন আফজাল হোসেন ও মামুনুর রশীদ। তারা হিমাগার ভাড়া করে এবারও ৩০০ বস্তা আলু রেখেছিলেন। এ বছর আলুর দাম অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কেজিপ্রতি ৪ টাকা হারে প্রায় ২৫ হাজার কেজি মজুত আলুতে তাদের ক্ষতি হবে ১ লাখ টাকা।

তানোরের বাণিজ্যিক আলুচাষি হারুনুর রশীদ ও শরিফুল ইসলাম বলেন, প্রকারভেদে প্রতি বস্তায় আলু থাকে ৬০ থেকে ৮০ কেজি। গত মৌসুমে তারা হিমাগার থেকে নিম্নে ৩০ টাকা ও ঊর্ধ্বে ৪০ টাকা কেজিদরে আলু বিক্রি করেছিলেন। এ বছর হিমাগারে সর্বোচ্চ দাম মিলছে কেজিতে ১২ থেকে ১৩ টাকা। এক কেজি আলু আবাদে তাদের খরচই হয়েছে ১১ থেকে ১২ টাকা। তার ওপর এক বস্তা আলুর পরিবহণ খরচ ৩০ টাকার সঙ্গে ২৫০ টাকা হিমাগার ভাড়া রয়েছে। গত মৌসুমে ৮০ কেজির প্রতি বস্তা গড়ে বিক্রি করেছেন ২ হাজার ৮০০ টাকা দরে। এ বছর এখন পর্যন্ত ৮০ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে ৯৬০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা করে। ফলে প্রতি বস্তায় তাদের ক্ষতি দাঁড়াচ্ছে অন্তত হাজার টাকা।

মোহনপুরের আলুচাষি আব্দুল মজিদ প্রামাণিক জানান, তিনি একটি হিমাগারে হাজার বস্তা আলু রেখেছিলেন। এখন আলু বিক্রির মৌসুম হলেও অধিকাংশ আলু হিমাগারেই আছে। ক্রেতা নেই। বাজারে আলুর খুচরা কেজি ২০ থেকে ২২ টাকা। আর পাইকারি দাম ১১ থেকে সাড়ে ১২ টাকা। আবাদ মৌসুম শুরু হলে কিছু আলু বীজ আকারে বিক্রি হবে, কিন্তু এখনই মজুত আলু বিক্রি করা দরকার। হিমাগার ভাড়া পরিশোধ না করলে কর্তৃপক্ষ নিলাম করে ভাড়ার টাকা তুলে নেবে। আমার মতো অনেক আলুচাষি এখন পড়েছেন বিপাকে।

মজুত আলু নিয়ে হিমাগার মালিকরাও বিপাকে আছেন জানিয়ে রাজশাহী কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশানের সভাপতি আবু বাক্কার বলেন, স্থান ও এলাকাভেদে খুচরা বাজারে আলু প্রতি কেজি ২২ থেকে ২৫ টাকা বিক্রি হলেও পাইকারি বাজারে দাম মাত্র ১২ থেকে ১৩ টাকা। ফলে চাষিরা বিপুল পরিমাণ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিপুল পরিমাণ মজুত আলু নিয়ে হিমাগার মালিকরাও বিপাকে আছেন। কারণ আগামী এক মাসের মধ্যে হিমাগার খালি করতে হবে। এখনো হিমাগারগুলোতে ৬০ লাখের বেশি বস্তা মজুত রয়েছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কেজেএম আব্দুল আউয়াল বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে লাগাতার লকডাউনসহ নানা সমস্যায় বাজারে আলু বিক্রি কমেছে। তবে আবাদ মৌসুম পুরোদমে শুরু হলে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে আলুর দাম কিছুটা বাড়তে পারে। তবে এ বছর চাষিরা বেশি লাভের মুখ দেখবে না।

এসবি/এমই


  • 1
    Share