মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দেশে নীরব বিপ্লব


সাহেব-বাজার ডেস্ক : দেশে মোবাইল ব্যাংকিং (এমএফএস) দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। প্রতিদিনই এ সেবায় হাজারো গ্রাহক যুক্ত হচ্ছেন। এরই মধ্যে এ সেবায় গ্রাহক সংখ্যা সাড়ে ১৮ কোটি ছাড়িয়েছে, যা দেশের বর্তমান জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। প্রতিদিন লেনদেন হচ্ছে আড়াই থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পরিবার-পরিজনের কাছে টাকা পাঠানোসহ বিভিন্ন সুবিধার কারণে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মোবাইল ব্যাংকিং। ফলে প্রতিদিনই গ্রাহক বৃদ্ধির সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণও বাড়ছে। বলা যায়, দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন বলছে, দেশের জনসংখ্যা এখন সাড়ে ১৬ কোটির কিছু বেশি। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৮ কোটি ১৭ লাখ এবং নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৩৩ লাখ। গত এক দশকে দেশে জনসংখ্যা বেড়েছে দুই কোটি ১১ লাখের মতো।

তবে এই জনসংখ্যার সবারই মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট রয়েছে, এমনটিও নয়। মূলত একই গ্রাহকের একাধিক অপারেটরে অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ থাকায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক দেশের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি দেখাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যেকটি অপারেটরে জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে একজন গ্রাহকের সর্বোচ্চ ১টি করে অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ রয়েছে। আগে একটি এনআইডির বিপরীতে একই অপারেটরে একাধিক অ্যাকাউন্টও খুলতে পারতেন গ্রাহকরা। যদিও এনআইডি নিয়ে একটা সমস্যা রয়েছে।

কারণ প্রথম যখন এনআইডি দেওয়া হয়, তখন সেটি ছিল ১৩ ডিজিটের। পরে জন্মতারিখ ও সালসহ এনআইডি সংশোধন করা হয়। এরপর দেওয়া হয় স্মার্ট এনআইডি কার্ড। ফলে ব্যক্তি এক থাকলেও নম্বর আলাদা হয়ে গেছে। আবার অনেকের নামেরও পার্থক্য আছে। এ কারণে বর্তমানে একই অপারেটরে একজন ব্যক্তির একাধিক মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থাকা অস্বাভাবিক নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, যে কোনো সেবায় অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে সাধারণ প্রবণতা হলো প্রত্যেক গ্রাহক গড়ে ১.৫টি অ্যাকাউন্ট চালান। অর্থাৎ দেশে যদি ১২ কোটি মানুষ থাকে, তাহলে ১৮ কোটি অ্যাকাউন্ট হবে। এর থেকে কমবেশিও হয়। মোবাইল ফোনের গ্রাহকের (সিম) ক্ষেত্রেও প্রতি গ্রাহকের বিপরীতে গড়ে ১.৫টি সিমকার্ড রয়েছে। আর সিমের বিপরীতেই এমএফএস অ্যাকাউন্ট খোলা হয়ে থাকে। তিনি আরও জানান, আগামীতে এমএফএস অ্যাকাউন্ট খোলার গতি এমনিতেই কমবে। এর কারণ, এখন অ্যাকাউন্ট নেই এমন সিম খুব কমই আছে। তা ছাড়া ব্যাংক এমএফএস ও পিএসপির মধ্যে তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তরের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘ইন্টার অপারেবল ডিজিটাল ট্রানজেকশন প্ল্যাটফর্ম’ বিনিময় চালু হওয়ার কারণে প্রত্যেক অপারেটরে আলাদা আলাদা অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন হবে না। সেক্ষেত্রে একটা অপারেটরে অ্যাকাউন্ট থাকলেই অন্যদের সঙ্গেও লেনদেন করার সুযোগ পাবেন গ্রাহকরা।

২০১১ সালের মার্চে বাংলাদেশে মোবাইলের মাধ্যমে আর্থিক সেবার যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ১৩টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে জড়িত আছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৫২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৩২ জন। এর মধ্যে পুরুষ গ্রাহক ১০ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার ৫৪ জন। আর নারী গ্রাহক ৭ কোটি ৭৫ লাখ ৩২ হাজার ৭৮২ জন। এ সময়ে মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ১২৮ জন। জানা যায়, বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রায় অর্ধেক অ্যাকাউন্টই নিষ্ক্রিয় হিসেবে আছে। নিয়মানুযায়ী, কোনো অ্যাকাউন্ট থেকে টানা তিন মাস কোনো ধরনের লেনদেন না হলে, তা নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়। আর তিন মাসের মধ্যে একটি লেনদেন হলেই তা সক্রিয় হিসেবে বিবেচিত। অবশ্য বড় কোনো অনিয়ম না পাওয়া গেলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে না ব্যাংক।

বর্তমানে শুধু অর্থ পাঠানো নয়, নতুন নতুন অনেক সেবাও মিলছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল পরিশোধ, কেনাকাটা, বেতন-ভাতা প্রদান ও বিদেশ থেকে টাকা পাঠানোসহ (রেমিট্যান্স) বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে এই মাধ্যমে। এসব সুবিধার কারণে দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ৮৭ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয়েছে দুই হাজার ৯২১ কোটি টাকা। এর আগের মাস অর্থাৎ আগস্টে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন হয় ৮৭ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় টাকা জমা পড়ে (ক্যাশ ইন) ২৬ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা। আর ২৩ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা উত্তোলন (ক্যাশ আউট) হয়। এ মাসে কেনাকাটার বিল পরিশোধ হয় ৩ হাজার ১২৩ কোটি টাকা। একই সময়ে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করে ব্যক্তির হিসাব থেকে আরেক ব্যক্তির হিসাবে ২৫ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা পাঠানো হয়েছে। কর্মীদের বেতন-ভাতা প্রদান ২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানিসহ বিভিন্ন সেবার বিল পরিশোধে ২ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। মোবাইলে টকটাইম কেনা হয় ৮৩৮ কোটি টাকার। এ ছাড়া সরকারি পরিশোধ হয়েছে ২০ কোটি টাকার।

 

এসবি/এমই