মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজারে টাকার জোগান কমানো হবে


সাহেব-বাজার ডেস্ক : রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ সব ধরনের পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি, ডলারে হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে জিডিপির প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা, যাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া মুদ্রার বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও মুদ্রানীতির অন্যতম কাজ।

মহামারী করোনায় স্থবির অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে গত অর্থবছরের মতো চলতি মুদ্রানীতিও কিছুটা সম্প্রসারণমুখী করা হয়। বাজারে অর্থের জোগান বাড়াতে নেওয়া হয় নানা পদক্ষেপ। এসব পদক্ষেপের ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশ গতিও ফিরেছে। তাই নতুন অর্থবছরের মুদ্রানীতির ভঙ্গিমা সংকোচনমূলক করার চিন্তা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এজন্য বাজারে টাকার প্রবাহ কমাতে ব্যাপক মুদ্রার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে নির্ধারণ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে কমানো হচ্ছে বেসরকারি খাতে ঋণের লক্ষ্যও। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাশ্রয় ও আমদানি খরচ কমাতে টাকা ও ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখারও কৌশল নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন পরস্পরবিরোধী বিষয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ দুটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়ন করাটাই আমাদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জিং। এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে ধরে রেখে বিনিময় হারকে পড়তে না দেওয়ার চ্যালেঞ্জও আছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, মূল্যস্ফীতি আর বাড়তে দেওয়া ঠিক হবে না। এতে গরিব মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে। তাই এখন উচ্চ প্রবৃদ্ধির কথা চিন্তা না করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেই প্রাধান্য দিতে হবে। বাজারে টাকার প্রবাহ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে চলতি মুদ্রানীতির উপকরণগুলো সঠিকভাবে কাজ করছে না। চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে ব্যাপক মুদ্রার সরবরাহ (এম-২) ও এর কার্যকারক উপকরণগুলো প্রবৃদ্ধি মুদ্রানীতিতে প্রক্ষেপিত প্রবৃদ্ধি পথের অনেকটা নিচে অবস্থান করেছে। চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বাজারে রিজার্ভ মুদ্রা (এম-১) বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১০ শতাংশ। এর বিপরীতে জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে অর্জনের হার ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। তবে গত এপ্রিল পর্যন্ত বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৫১ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে ব্যাপক মুদ্রার সরবরাহের (এম২) লক্ষ্য রয়েছে ১৫ শতাংশ। এর বিপরীতে ১০ মাসে অর্জন ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর এপ্রিল পর্যন্ত বার্ষিক অর্জন ১০ দশমিক ৮৮ শতাংশ। মূলত আমদানি ব্যয়ের জোরালো প্রবৃদ্ধির বিপরীতে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কম হওয়া এবং রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হওয়াার কারণে নিট বৈদেশিক সম্পদের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হওয়ায় ব্যাপক মুদ্রার প্রবৃদ্ধি কম হয়েছে।

তবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট ভালো হয়েছে। চলতি বছরের বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এর বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ১২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এ সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

এর বিপরীতে ১০ মাসে অর্জিত হয়েছে ১৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। করোনার প্রভাব কাটিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পুরোপুরি গতিশীলতা ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকায় অর্থবছর শেষে বেসরকারি ও অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছবে বলে প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এদিকে আমদানিতে ডলারের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় গত বছরের আগস্ট থেকেই ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে ডলারের দাম। ফলে প্রতিনিয়ত ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাচ্ছে। তবে বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়িয়ে টাকার মান ধরে রাখার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের দাম এখন ৯২ টাকা ৯৫ পয়সা। খোলাবাজারে ডলারের দাম আরও বেশি, প্রায় ৯৬-৯৭ টাকা। টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়ায় আমদানিকারক ও সাধারণ মানুষ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ এতে আমদানি খরচ বেড়ে পণ্যমূল্যও বেড়ে যাচ্ছে।

 

এসবি/এমই