মুখে মুখে উঠে এলো সংকটের কথা


নিজস্ব প্রতিবেদক: সুপেয় পানির সমস্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুণ্ডুমালা পৌরসভা এবং এর আশপাশের এলাকায়। কোথাও কোথাও ভূগর্ভের এক হাজার ১০০ ফুট নিচে গিয়েও মিলছে না পানির অস্তিত্ব। এ অবস্থায় নানামুখী সংকটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

তাঁদের সেই সংকটের কথা উঠে এসেছে পানি শুনানিতে। বিশ্ব জলবায়ু কর্মসপ্তাহ উদযাপন উপলক্ষে জলবায়ু পরিবর্তন ও খরার কারণে পানিসংকট দেখা দেওয়া এলাকার মানুষের জবানবন্দী হিসেবে বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই পানি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। মন্ডুমালা পৌরসভার আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এই শুনানির আয়োজন করে বেসরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ও বরেন্দ্র অঞ্চল যুব সংগঠন ফোরাম।

পানি শুনানিতে বিভিন্ন দাবি সম্বিলিত প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন নিয়ে নারী শিশু ও কৃষকেরা অংশ নেন। শুনানিতে মুন্ডুমালা মাহালীপাড়ার বাসিন্দা ক্রিস্টিনা হেমব্রম (৪৫) বলেন, এক কিলোমটিারের বেশি দূরে গিয়ে মাত্র এক কলস পানি সংগ্রহ করতে তাঁর কোমর ভেঙেছে। আর্থিক অনটনে ভালোভাবে চিকিৎসা করাতে পানেনি। পানির সমস্যা এত বেশি যে তাঁর বাড়িতে দূরের আত্মীয়-স্বজনেরা এলে এই পানির কারণে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।

পিরনপুকুর গ্রামের আঙ্গুরী বেগম (৩৮) বলেন, ‘তীব্র খরা এবং পানির অভাবে আমার একমাত্র সম্বল তিনটি ছাগল মারা গেছে।’ মিশনপাড়ার সুজল্লা মার্ডি (৪০) বলেন, তাপদহের কারণে তাঁরও একটি গরু মারা গেছে। দিনমজুর আলবিকুস হেমব্রম (৪৮) বলেন, একে তো পানির সংকট, তার ওপরে অনাবৃষ্টি। এতে মানুষের রোগ-বালাইও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এলাকার বাসিন্দারা বলেন, ‘মিথ্যে আশ্বাসে আমাদের আর বিশ্বাস হয় না। জনপ্রতিনিধিরা শুধুই কথা বলে। এই প্রকল্প আসে, সেই প্রকল্প আসে। কিন্তু আমাদের পানির সমস্যা সমাধান হয় না। আমরা চাই পানির সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন মুন্ডুমালা পৌরসভার মেয়র সাইদুর রহমানও। তিনি বলেন, ‘কয়েকবছরে পৌর এলাকায় ২৫০টি সাবমার্সিবল পাম্প বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ছে পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাওয়ার কারণে। এখন নতুন করে পাম্প বসাতে গেলে এক হাজার ফুট নিচেও কোথাও কোথাও পানির স্তর পাওয়া যাচ্ছে না। অন্য এলাকা থেকে কীভাবে পানি এনে সমস্যার সমাধান করা যায় সে বিষয়ে আমরা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করছি। কার্যকর প্রকল্প পেতে দেন-দরবার করে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, জলবায়ু পরির্বতনের জন্য দায়ী ধনী দেশগুলো আমাদের মিথ্যা আশ্বাস দেয়। তাঁদের কারণে আমাদের এলাকার প্রকৃতি-পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। আর্থিক মূল্য বিবেচনায় এই ক্ষতি অনেক। যাঁরা এই ক্ষতি করছে তাঁরা আমাদের দেশের জন্য প্রয়োজনীর ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের যে আর্থিক, স্বাস্থ্য এবং মানসিকসহ নানা ক্ষতির শিকার হচ্ছেন তার ক্ষতিপূরণ দাবি করেন মেয়র।

শুনানিতে গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, জলবায়ু পরির্বতনের নেতিবাচক প্রভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলে অনাবৃষ্টি, তীব্র তাপদহসহ কিছু কিছু এলাকায় পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আমরা মোটেও দায়ী নই। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আমাদের যে লস এবং ড্যামেজ হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ পাওয়া আমাদের ন্যায়সংগত অধিকার। এই অধিকার আদায়ে সরকারকেই বেশি তৎপর হতে হবে।

শুনানিতে কৃষিখাতে পানি সংকটের চিত্র তুলে ধরেন বরেন্দ্র অঞ্চল জনসংগঠন ফোরামের সভাপতি ও জাতীয় কৃষি পদকপ্রাপ্ত কৃষক নূর মোহাম্মদ। আরও বক্তব্য দেন- বারসিকের সমন্বয়কারী জাহাঙ্গীর আলম, বরেন্দ্র যুব সংগঠন ফোরামের আহবায়ক রুবেল হোসেন মিন্টু প্রমুখ। শুনানি পরিচালনা করেন বারসিকের বরেন্দ্র অঞ্চল সমন্বয়কারী ও গবেষক শহিদুল ইসলাম।

এসবি/আরআর/এআইআর