সড়কে ‘অবৈধ’ ভবন: বেড়ায় যখন ক্ষেত খায়


এটা খুবই দুঃখজনক যে, মহাসড়ক প্রশস্তকরণের জন্য অধিগ্রহণকৃত জায়গায় খোদ মহাসড়ক নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রণালয়টিই ‘অবৈধ’ ভবন তুলে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। আর এ অপকর্মটি ঘটে চলেছে মন্ত্রণালয়টির কর্তাব্যক্তিদের একেবারে নাগের ডগায় রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে। রোববার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিবকে উদ্ৃব্দত করে যেমনটা বলা হয়েছে, ঢাকা মাস্টারপ্ল্যান ১৯৫৮ অনুসারে মহাখালী জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের প্রবেশমুখ থেকে বনানী রেলক্রসিং পর্যন্ত পুব পাশের সড়কটি ৮০-৯০ ফুট প্রশস্ত করার লক্ষ্যে ওই এলাকায় জমি অধিগ্রহণ করা হয়; আর এই জমির ওপর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় তার অধীনস্থ ঢাকা সড়ক বিভাগ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ তথা বিআরটিএ ও সেতু বিভাগের কার্যালয় হিসেবে দুটি বহুতল ও একটি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করেছে।

এর ফলে আজকে যখন বনানী-মহাখালী করিডোরে বাড়তি যানবাহনের চাপ সামাল দিতে ওই সড়কটি প্রশস্ত করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, তখন তা করা যাচ্ছে না। ঢাকামুখী যানবাহনের মানুষকে ওই করিডোরে এসে যানজটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে। আরও দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র গত দেড় বছর ধরে ওই সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ওই ভবনগুলো অপসারণের দাবি জানানো সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়ছে না। উল্লেখ্য, বিদ্যমান মহাসড়ক আইন অনুসারে মহাসড়কের ১০ মিটারের মধ্যে কোনো স্থাপনা তৈরি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তা জেনেও ওই ভবনগুলো তৈরি করা হয়েছে। যাদের উদ্যোগে আইনটি তৈরি হয়েছে এবং আইনটির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা যাদের দায়িত্ব তারাই যখন আইনটির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন, তখন সড়ক-মহাসড়কে দীর্ঘদিন ধরে যে চরম অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্য চলছে তার কারণটি বুঝতে কারও বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই।

যানজট ঢাকা শহরের একটি সাংবাৎসরিক সমস্যা, এটা নতুন কোনো কথা নয়। এই যানজটের ফলে ব্যক্তিগত কিংবা গণপরিবহনে চলাচলকারী নগরবাসীর যে অপরিসীম দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তা-ও সবার জানা। এসবের পাশাপাশি যানজটের কারণে প্রতিবছর ব্যক্তি মানুষের পাশাপাশি দেশকেও কী পরিমাণ ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে বহু সমীক্ষা হয়েছে; আমরাও এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে তা বহুবার উল্লেখ করেছি। সমস্যাটা নিয়ে সরকারও যে ভাবিত নয়, তা বলা যাবে না। এই যে বিশেষজ্ঞদের অনেকের ভিন্নমত সত্ত্বেও হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে রাজধানীতে এত এত ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ইত্যাদি নির্মাণ করা হচ্ছে, তা সরকারের ওই ভাবনারই প্রতিফলন। পরিহাসের ব্যাপার হলো, যানজট নিরসনের লক্ষ্যে গৃহীত এসব প্রকল্পের বেশিরভাগ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনেই বাস্তবায়িত হচ্ছে। এখন তারাই যদি ঢাকা শহরে যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তাহলে যানজট নিরসনে তাদের আন্তরিকতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে তা বাতুলতা হবে না। তাছাড়া এমন পরিস্থিতিতে সড়ক-মহাসড়কে যান চলাচল নিরাপদ ও স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধনের কাজে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের যেভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা, তা-ও সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া বেড়া যখন নিজেই ক্ষেত খায়, তখন সে বেড়ার আর কার্যকারিতা থাকে না।

আমরা মনে করি, মন্ত্রীসহ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকরা সমস্যাটির গুরুত্ব অনুধাবন করবেন এবং কালক্ষেপণ না করে নিজেরাই আলোচ্য অবৈধ ভবনগুলো সরিয়ে বনানী-মহাখালী করিডোরে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে উদ্যোগী হবেন। তাদের বুঝতে হবে যে, তারা নিজেরাই যদি মহাসড়কের জায়গায় অবৈধ ভবন তোলেন, তাহলে সারাদেশে বহু স্থানে যে ভূমিদস্যুরা সড়ক-মহাসড়কের জায়গায় বাজার. মার্কেটসহ বিভিন্ন রকম অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলেছে, তারা আরও উৎসাহিত হবে। আমরা সরকারকেও সমস্যাটি নিরসনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। আমরা সরকারকে মনে করিয়ে দিতে চাই, ২০০৮ সালে যেভাবে বিজয় সরণির অবৈধ ২৩ তলা র‌্যাংগস ভবন ভেঙে তেজগাঁ ওভারপাস তৈরি হয়েছিল, কিংবা ২০১২ সালে আদালতের নির্দেশে হাতিরঝিলের মাঝখানের বিজিএমইএ ভবন ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, এ ক্ষেত্রেও প্রয়োজনে সে দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে হবে।

এসবি/জেআর