মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ৪ মন্ত্রণালয় পিছিয়ে

  • 8
    Shares

সাহেব-বাজার ডেস্ক : শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক বিষয় বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়গুলো মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পিছিয়ে রয়েছে। এমনকি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তদারকির দায়িত্বে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অনেক পিছিয়ে। এ তালিকায় রয়েছে অর্থ ও আইন মন্ত্রণালয়ও। বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের মন্ত্রণালয়ভিত্তিক পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। গত সোমবার এসব তথ্য মন্ত্রিসভা বৈঠকে এজেন্ডা আকারে উপস্থাপন করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করেন। এরপর ২১ জানুয়ারি প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠক করেন। এরপর থেকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে বাস্তবায়নাধীন ৩০০টি। এমনকি ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের নেওয়া ৮১টি সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়ন করেনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়।

গত সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠকে সুপারিশ করে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভায় গৃহীত ৮১টি সিদ্ধান্ত দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর এখনো মন্ত্রণালয়/বিভাগে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। গুরুত্ব বিবেচনা করে এসব সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন না থাকলে সেসব সিদ্ধান্ত দ্রুত মন্ত্রিসভায় এনে বাতিল করা উচিত। আর সংশোধন সাপেক্ষে বাস্তবায়ন করতে হলেও এসব সিদ্ধান্ত পুনরায় মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা দরকার।

খসড়া আইন ছাড়াও মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিভিন্ন নীতি, চুক্তি, সারসংক্ষেপ, কর্মকৌশল ও কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয় এবং মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং শেষে খসড়া আইন বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন করা হয়। বিভিন্ন কমিটির পর্যালোচনা শেষে এসব আইন সংসদে পাস হয়। এরপর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে সেগুলো আইনে পরিণত হয়।

রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী, মন্ত্রিসভা বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করার জন্য প্রতি তিন মাসে একবার মন্ত্রণালয়ভিত্তিক প্রতিবেদন প্রণয়ন করে তা বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গত সোমবার চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসের প্রতিবেদন মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করেছে। ওই প্রতিবেদনে গত বছরের ৭ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের তথ্য-উপাত্ত রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময় ৫৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সম্পর্কে ১ হাজার ৮৮২টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৮২টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ৩০০টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নাধীন অর্থাৎ এসব সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নাধীন রয়েছে এমন তালিকার শীর্ষে অবস্থানকারী মন্ত্রণালয়গুলো হচ্ছে অর্থ; স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ; শিক্ষা; স্বরাষ্ট্র; বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন; আইন ও বিচার; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে অর্থ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ। গত প্রায় দুই বছরে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের তালিকায় বাস্তবায়নাধীন সিদ্ধান্তে শীর্ষে রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ৩০০টির মধ্যে এই মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নাধীন সিদ্ধান্ত ২৮টি। এর মধ্যে অর্থ বিভাগের ৭টি, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ৯টি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ৭টি ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের ৫টি সিদ্ধান্ত রয়েছে।

এ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নাম। এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুটি বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের বাস্তবায়নাধীন সিদ্ধান্ত ১৩টি আর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিদ্ধান্ত ৭টি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ১১টি এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ৫টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের ৯টি এবং জননিরাপত্তা বিভাগের ৭টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নাধীন সিদ্ধান্ত ১৫টি। আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের ৬টি এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের বাস্তবায়নাধীন সিদ্ধান্ত ৮টি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নাধীন রয়েছে ১২টি। এর মধ্যে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের ৯টি এবং বিদ্যুৎ বিভাগের ৩টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নাধীন। এ ছাড়া ১০টি করে বাস্তবায়নাধীন সিদ্ধান্ত রয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এবং ডাক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের।

২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মন্ত্রিসভার বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মধ্যে ৩৪টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ওপর। এর মধ্যে ২৪টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়েছে। অবশিষ্ট ১০টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে ১৯৭৩ সালের দ্য বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন অর্ডারের আলোকে বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন আইন, ২০২০-এর খসড়া মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে।

খসড়া সংশোধন করে ভেটিংয়ের জন্য গত ১০ সেপ্টেম্বর লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রিসভা অনুমোদিত বাংকার বহি সাক্ষ্য আইনের চূড়ান্ত খসড়া গত ৮ সেপ্টেম্বর ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। দ্য নেগোসিয়েবল ইন্স্যুরেন্স অ্যাক্টের আলোকে বিনিময়যোগ্য দলিল আইন, ২০২০-খসড়া করা হয়েছে। খসড়াটি বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আইনের খসড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা সংক্রান্ত কমিটির বিবেচনায় রয়েছে।

২০১৯ সালে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রিসভার বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মধ্যে ৩৮টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ওপর। এর মধ্যে ২৩টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়েছে। অবশিষ্ট ১৫টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নাধীন। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে বাংলাদেশ বিমান করপোরেশন (রহিতকরণ) আইনের খসড়া গত ১৪ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভা বৈঠকে নীতিগত অনুমোদন হয়েছে। আইনের খসড়াটি ভেটিংয়ের জন্য লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইনের খসড়া জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে। গত ৪ অক্টোবর এ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় আইনটি পর্যালোচনা করা হয়।

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার কমেছে: করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে এ বছর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে মন্ত্রিসভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশ কমেছে। গত সোমবার মন্ত্রিসভার ভার্চুয়াল বৈঠকে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হারের তুলনামূলক এই প্রতিবেদন অনুমোদন করা হয়। পরে সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে মন্ত্রিসভার ৪৬ শতাংশ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়েছে। আর গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে বাস্তবায়ন হয়েছিল মন্ত্রিসভার ৫৮ শতাংশ সিদ্ধান্ত। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের বিরূপ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিদ্যমান অগ্রগতি আগের বছরের একই সময়ের তুলানায় কিছুটা ধীর হলেও আশাব্যঞ্জক।

এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, পুরো কেবিনেট (ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন নিয়ে) সন্তোষ প্রকাশ করেছে, যদিও গত বছরের তুলনায় (বাস্তবায়ন) একটু কম আছে। এক্ষেত্রে বাস্তব অবস্থা তো সবাই বুঝতে পেরেছে। নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, কভিড-১৯-এর জন্য যে কাজ জমে আছে, সেটা যেন খুব কুইকলি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে রিকভার করতে পারি।

এসবি/এমই


  • 8
    Shares