ভুঁইফোড় কোম্পানির ওজন কমানোর ফাঁদ


সাহেব-বাজার ডেস্ক : একটা সময় সমাজে প্রচলিত ধারণা ছিল উঁচু পেট বা মোটাসোটা শরীর আভিজাত্যের প্রতীক। স্বাস্থ্যবিজ্ঞান সে ধারণা বদলে দিয়েছে। এখন সবাই জানে, মেদ ভুঁড়ি বা অতিরিক্ত ওজন রীতিমতো বিপজ্জনক। শরীর সুস্থ রাখতে পরিমিত পরিমাণে খাবার খেতে হবে। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, হাঁটাচলা ও ব্যায়াম করতে হবে। নয়তো পড়তে হবে নানা রোগশোকে।

কিন্তু মানুষের যেন কষ্ট করতে না হয়, সে জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁদ পেতেছে নানা ভূঁইফোঁড় কোম্পানি। মাত্র সাত থেকে ১৫ দিনে ৮ থেকে ১০ কেজি ওজন কমিয়ে শরীর ফিট করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। এটি কতটা বিজ্ঞানভিত্তিক বা স্বাস্থ্যসম্মত, তা নিশ্চিত না হয়েই অনেকে পা দিচ্ছে এই স্লিম হওয়ার ফাঁদে। এতে প্রতারণার শিকার হচ্ছে মানুষ, কারও দেখা দিচ্ছে শারীরিক জটিলতা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওজন কমাতে বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে মানতে হবে বিজ্ঞানসম্মত নিয়মকানুন। পৃথিবীতে এখনো এমন কোনো ওষুধ তৈরি হয়নি, যা খেলে রাতারাতি ওজন কমে শরীর ফিট হয়ে যাবে। প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান বলেছেন, এভাবে ওজন কমানোর কোনো সুয়োগ নেই। এর কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যাও নেই। তাই এগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ওজন কমানোর বিজ্ঞাপন দিয়ে লোকজনকে আকৃষ্ট করছে নিউট্রিকোর বায়োসায়েন্স প্রাইভেট লিমিটেড (NUTRICORE BIOSCIENCES LTD.) নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি তাদের বিজ্ঞাপনে একটি প্লাস্টিক কৌটার ছবি দিয়ে লিখেছে, ‘হেলথঅক্সাইড, কিটো অ্যাডাভান্সড ওয়েট লস ক্যাপসুল, দাম ১৫৫০ টাকা (৬০ ক্যাপসুল), মেড ইন ইন্ডিয়া। বিস্তারিত জানতে অথবা অর্ডার করতে আমাদেরকে মেসেজ করুন। ঢাকার বাইরে অর্ডার করতে ১৫০ টাকা অগ্রিম প্রদান করুন। বিস্তারিত জানতে ০১৭৭ … ২৪৯ নম্বরে ফোন করুন।

এই ক্যাপসুল সম্পর্কে জানতে নির্দিষ্ট নম্বরে ফোন করা হলে স্বপন নামের একজনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, তাদের এই ক্যাপসুল শতভাগ প্রাকৃতিক পণ্য। এতে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। এই ক্যাপসুল প্রতিদিন দুটো করে এক মাস খেতে হবে। তা হলে ৫ থেকে ৮ কেজি পর্যন্ত ওজন কমবে। ওষুধ সেবনের সময় ভাতের পরিমাণ কমিয়ে খেতে হবে।

এই ওষুধ বিশেষ প্রক্রিয়ায় শরীরের সব ফ্যাট বার্ন করে (চর্বি ঝরিয়ে) এনার্জিতে (শক্তিতে) রূপান্তরিত করে। তিনি দাবি করেন, এটি সরকার অনুমোদিত একটি পণ্য। তারা বিগত চার বছর ধরে এটি আমদানি ও বিপণন করে আসছেন। তবে সরকারের কোন প্রতিষ্ঠান এটি অনুমোদন করেছে, তা বলতে পারেনি।

ফেসবুকে এ ধরনের আরও বিজ্ঞাপন রয়েছে। যেমন ‘লাইফস্টাইল শপ’ নামের আইডি থেকে বিজ্ঞাপন দিয়ে বলা হয়েছে, জুস খেয়ে মেদ ও ভুঁড়ি কমান সহজে, ৫ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত। বিস্তারিত জানতে ইনবক্স করুণ অথবা কল দিন ০১৮৩….. ২৩৬৯ নম্বরে। ‘দ্য হারবাল কমপ্লিমেন’ আইডি থেকে দেওয়া বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মেদ ভুঁড়ি কমান খুব সহজেই। মিনি কোর্স ওজন কমাবে ৮ থেকে ১০ কেজি, হাফ কোর্স ৮ থেকে ১২ কেজি এবং ফুল কোর্স ১২ থেকে ২০ কেজি।

একই ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়ে একটি আইডি থেকে বলা হয়েছে, ফ্যাট ঝরিয়ে ফিট করে তুলুন নিজেকে ন্যাচারাল ডায়েটের মাধ্যমে। মাসিক কোর্স ওজন কমাবে ৮ থেকে ১০ কেজি, হাফ কোর্স ১৫ থেকে ২০ কেজি এবং ফুল কোর্স ২০ থেকে ২৫ কেজি। কমলালেবুর ছবি দেওয়া এই বিজ্ঞাপনের নিচে যোগাযোগের একটি নম্বর দেওয়া আছে ০১৮৬…. ৭৬২। মেদ ভুঁড়ি ও ওজন কমাতে গ্রিন কফির বিকল্প নেই উল্লেখ করে একটি বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মাত্র ৭ থেকে ১০ দিনে ফলাফল। যোগাযোগের ঠিকানা ০১৮৭১… ১৩।

গ্রিন কফির আরেকটি বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে ৭ থেকে ১০ কেজি ওজন কমে মাত্র এক মাসে। যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে ০১৮৫৭…. ২৬ নম্বরে। এ ছাড়া রয়েছে চায়নিস জিঞ্জার অয়েলের ভিডিও বিজ্ঞাপন। সেখানে দেখানো হয়, সেই তেল পেটে মাখলেও শরীরের সব চর্বি মল হয়ে পায়ুপথে বেরিয়ে যাচ্ছে। রয়েছে ‘একটি কিনলে একটি ফ্রি’ অফার। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের জবাব পাওয়া যায়- তাদের পণ্য প্রাকৃতিক। এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।

এ ধরনের পণ্য ব্যবহারে ওজন কমানো যায় কিনা জানতে চাইলে প্রখ্যাত লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল বলেন, এইভাবে ওজন কমানোর কোনো সুযোগ নেই। শরীরের ওজন কমানোর বিজ্ঞানভিত্তিক প্রক্রিয়া আছে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। রাতে দেরি করে খাওয়া যাবে না। শর্করাজাতীয় খাবার ও ফাস্টফুড এড়িয়ে চলতে হবে। প্রতিদিন আধা ঘণ্টা হাঁটার অভ্যাস করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে পৃথিবীতে ওজন কমানোর এখনো কার্যকর কোনো ওষুধ নেই। কোনো ধরনের চা, জুস বা ক্যাপসুল খেয়ে ওজন কমানো সম্ভব নয়। বিজ্ঞাপন দিয়ে এসব পণ্য বিক্রি প্রতারণা ছাড়া আর কিছু না।’

হরমোন ও ডায়াবেটিক বিশেষজ্ঞ ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, একজন মানুষের ওজন বা মেদ বাড়ার কারণ হলো তিনি একদিনে যে পরিমাণ খাবার খান, তার তুলনায় পরিশ্রম কম করেন। ফলে প্রতিদিনই কিছু পরিমাণ ক্যালোরি জমা হতে থাকে। তাই শুধু খাবার খাওয়া কমিয়ে বা শুধু শারীরিক পরিশ্রম করে ওজন কমানো সম্ভব নয়। এ জন্য দরকার পরিমিত খাবার ও শারীরিক পরিশ্রম।

তিনি বলেন, ভারতীয় কিছু কোম্পনি ওজন কমানোর পণ্য বিক্রি করছে। এসব পণ্য শরীরের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া কোনো একটি পণ্য গ্রহণের পর যদি দশ কেজি ওজন দুই মাসে কমে এবং তা বন্ধ করে দিলে যদি আবার ওজন বাড়ে, তা হলে লাভ কী। তা ছাড়া কিটো ডায়েট অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ। এগুলো এক ধরনের প্রতারণা। এসব ফাঁদে পা দেওয়া ভুল হবে। এদের প্রতিহত করা খুবই জরুরি।

 

এসবি/এমই