ভিক্ষাবৃত্তি যখন নেশা ও পেশা

  • 1
    Share

সাহেব-বাজার ডেস্ক : জানেন কী, অন্যসব ভয়াল নেশার মতো ভিক্ষাও একটি ভয়ঙ্কর নেশা। ব্যতিক্রম হচ্ছে, এটি আবার মজার পেশাও বটে! যারে একবার নেশা এবং পেশাটি পায়, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভিক্ষাবৃত্তি তাকে ছুটি দেয় না!

স্বঘোষিত জ্যোতিষ সম্রাটদের কায়দায় ভিক্ষাবৃত্তির কৌশলও বহুমাত্রিক। ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী ধরণ বদলায়। কিছু উদাহরণ দিলে বুঝতে সহজ হয়।

প্রথমে জ্যোতিষীদের নিয়ে বলি। জ্যোতির্বিজ্ঞান বিজ্ঞানের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা। মহাকাশ বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে এর বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। কিন্তু জ্যোতিষ শাস্ত্রের নামে গ্রহ নক্ষত্রের চটি কেতাব ঘাঁটাঘাঁটি করে ভাগ্য গণনাকারী হাঁতুড়েরা ফুটপাত থেকে শুরু করে এসি মলে বসেও লোক ঠকায়। তোতাপাখির ঠোঁট বা বানরের নখরামিও ভাগ্য গননার সহজ মাধ্যম।

ভাগ্য বা রাশি গণনা এতবেশি জনপ্রিয়, বড় বড় গণমাধ্যম স্লট বা স্পেসও ব্যবহার করে অকাতরে! কাজেই হতাশ বা বড় দাও মারতে বহু মানুষ এদের দরজায় লাইন ধরে অ্যাপয়ন্টমেন্ট স্লিপ সংগ্রহ করে আগেভাগে। বড় বড় মক্কেলদের দৌড়, পদবী, ডিগ্রির অসংখ্য লেজুড়েমোড়া জ্যোতিষ সম্রাট বা মহারাজদের সুসজ্জিত এসি চেম্বারে। মোটা ফি দিয়ে এরা ভাগ্য গণনা, রাশিফল দেখে। নিদান নেয় দামি রত্ন-পাথরের। এই লাইনের সম্রাট, মহারাজরা একেকজন ধনে মানে ভাগ্য ও রত্ন বেচেই বহু কোটির মালিক। একবার পরিচিত একজনকে হাল্কা চ্যালেঞ্জ করি, ‘আচ্ছা আপনি রত্নযোগে অন্যের ভাগ্য গড়ে দেন। গ্রহবিভ্রাট বা বালা মুসিবত হঠিয়ে দেন। এত কষ্ট না করে রত্নতেজে একদিনেইতো নিজের ভাগ্য বদলাতে পারেন। করেন না কেনো?’

তিনি কানের লতি পর্যন্ত হাসির ঢেউ খেলিয়ে বলেন, ‘আরে ভাই এটা হচ্ছে জনসেবা। আত্মসেবায় কী জনসেবা হয়?’

আসলেই একদম ঠিক! ভাগ্য বদলে আগ্রহী সৌভাগ্যবান খদ্দেররা কী তোতা বা বানর সেবা নিতে পারেন? অসম্ভব! ‘সোশাল স্ট্যাটাস’র বেলুনে পিনের খোঁচা বলে কথা! রত্নগুণে ভাগ্য পাল্টানো কেউ এখন নিজের অনুসন্ধানী জালে ধরা পড়েনি। ব্যার্থতা অবশ্যই নিজের, সম্রাট বা ভাগ্য বদলিয়ের না! তোতা, বানর বা গণক ঠাকুর নিম্নবর্গীয়, আলোচনা অনাবশ্যক।

ফেরা যাক, পেশাদার ভিক্ষুক প্রসঙ্গে। এরাও বহুবর্গীয়। উচ্চ-অধঃ সব পর্যায়ে আছে সহি সালামতে। কেউ রাস্তায় জিন্দালাশে কাফন জড়িয়ে ভিক্ষার থলে ভারী করে। কেউবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন বা নিজ এলাকার বিশিষ্টের লেমিনেটেড সার্টিফিকেট গলায় ঝুলিয়ে। আবার মসজিদ, মাদ্রাসা কিংবা এতিমখানার দান ছদকার রশিদমূলেও। এরা সাধারণ ভিক্ষুক না, নেশাতুর। ভিক্ষা সাধারণত ভিক্ষুকের মূল পেশা, নেশা না।

আমাদের সাবজেক্টে আছে অসাধারণ ভিক্ষুক সকল। মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানার রশিদ ছাড়া এক শ্রেণীর ‘পেশাজীবি বা বুদ্ধিজীবী’ ভিক্ষুক আছে। এরা কেউবা চিরস্থায়ী রোগী, কেউ স্থায়ী দুস্থ ইংবা বেকার। এক সময়ে এরা ‘এই ছিল, ওই ছিল!’ মানে মোটামুটি সবাই কামেল জন। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল, দুস্থ সেবা তহবিল, সাংবাদিক বা পেশাজীবী ত্রাণ তহবিল থেকে নিয়মিত মোটা দাও মারে। আবার কারো অতীত না-কি এত বিখ্যাত, কিছু তবলচি এদের হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢোল তবলচিতে নিত্য মিঠে বোলও তোলে। পাশাপাশি নেশাতুর ভিক্ষুক মশাইরাও পছন্দের বিখ্যাত ধনীদের ‘রত্ন বা হীরে’ বানিয়ে কিছু পেপার, ম্যাগাজিনে নিবন্ধ ফাঁদে। ছাপা কাগজ বগলে নিয়ে ‘রত্ন-হীরে’র বাড়ির দর্জায় ধর্ণা পাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা!

অসুস্থতার অজুহাতে কিছু আদায় উশুল করে নেয় টানা ধর্ণার পর। পাশাপাশি বিদেশ চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ প্রেসক্রিপশন ও অতীত কীর্তির ফর্দের হার্ডকপি নিয়ে নেতা, ব্যাবসায়ী, প্রশাসনিক কর্মকর্তার অফিস থেকেও আদায় উশুল করে। মন্ত্রী এমপির ডি/ও নেয় বড় শিকার প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে থাবা বসাতে।

বড় তহবিল জমা হলে পর বউ পরিবার নিয়ে উড়াল দেয় বিদেশে। এদের কারো কারো অতীত বড়ই গ্লানির। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কাপালিক জুব্বাদাদা সিরাজুল আলম খানের হার্ডকোর ক্যাডারও বটে। বঙ্গবন্ধুর চামড়ায় জুতো সেলাইর স্লোগানে গলা কাঁপিয়েছে। ‘৭৫এর ১৫ আগষ্টের রক্তাক্ত ট্রাজেডির বীজতলা এরাই তৈরি করে দিয়েছে, এতই কীর্তিমান তারা! এখন ২৪ ঘন্টা বঙ্গবন্ধুর তজবীহ গলায়!

দুঃখজনক হলেও সত্য এদের অনেকেই স্বচ্ছল। নিজস্ব ফ্ল্যাট, বাড়িও আছে। ছেলে-মেয়েরাও প্রতিষ্ঠিত। ডাক্তার, ইন্জিনিয়ারও। কিন্তু ভিক্ষার পেশা ও নেশা এদের রক্তে মিশে গেছে। ছেলে-মেয়ে বা আত্মীয় স্বজনের সম্মানের ধারও ধারেনা। এতই ভয়ঙ্কর এই নেশা।

প্রতি ছ’মাস বা বছরে এরা অসুস্থ হয়, ভিক্ষার তোলা তুলতে দৌড়াতে হয়। বড় আমোদে পরের টাকায় দৌড়ায়-উড়ে-খায়-ফূর্তি-মউজ করে।

আল্লাহর ওয়াস্তে নেশাতুর পেশাদার মান্যবর ভিক্ষুক সামলান। বাঁচান প্রকৃত অসুস্থদের। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল আমাদের রক্ত-ঘামের দামে। পেশাদার ও নেশাতুর ভিক্ষুক ভণ্ড কাপালিক জুব্বাদাদার শিষ্যদের নিত্য খেদমতে কখনো নয়! আওয়ামী ঘরানার নেতা, রাজনীতিকরাও এদের থেকে দূরে থাকুন-প্লিজ।

এসবি/এআইআর


  • 1
    Share