ভাড়া বৃদ্ধিতে বিশ্লেষণ কমিটির অযৌক্তিক অজুহাত


সাহেব-বাজার ডেস্ক : জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর রাজধানীর ভেতরে ও দূরপাল্লার ক্ষেত্রে বাসের নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫২ আসনের দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ২০ পয়সা নির্ধারণ করা হলেও ৪০ আসনের ক্ষেত্রে তা হবে ২ টাকা ৮৬ পয়সা। আসন কমলে ভাড়া আরও বাড়বে।

এ ক্ষেত্রে নগর পরিবহনের বাসে ৯৫ শতাংশ এবং দূরপাল্লার বাসের ৭০ শতাংশ যাত্রী পূর্ণ হয় ধরে এই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও বাস্তবতা হলো, নগর পরিবহনের বাসগুলোয় আসন খালি তো দূরে থাক, যাত্রীরা গাদাগাদি করেই গন্তব্যে যান।

সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভাড়া পুনর্র্নিধারণ কমিটির ব্যয় বিশ্লেষণে এসব খরচ ধরা হয়েছে। জানা গেছে, এতে রাতে রাস্তায় পার্কিং করা হলেও ঢাকার বাসে মাসে গ্যারেজ ভাড়া ৬৫ হাজার টাকা এবং দূরপাল্লার বাসে গ্যারেজ ও টার্মিনাল খরচ দুই লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে চলা বাসের ক্ষেত্রে খরচ দেখানো হয়েছে ১৬ রকম। এর মধ্যে দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে খরচের ১২ খাত দেখানো হয়েছে। ঢাকায় চলাচল করা বাসের দাম ধরা হয়েছে ৩৫ লাখ টাকা।

দূরপাল্লার বাসের দাম ধরা হয়েছে ৮০ লাখ টাকা। বাসের আয়ুষ্কাল ১০ ধরে ব্যাংক ঋণের সুদ, রেজিস্ট্রেশন ফিসহ অন্যান্য কর যোগ করে বিনিয়োগ বাবদ ঢাকার বাসের বার্ষিক খরচ দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। দূরপাল্লার ক্ষেত্রে তা ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এতে আরও বলা হয়, ঢাকা শহরে চলা লক্কড়ঝক্কড় বাসগুলো মেরামতে বছরে ছয় লাখ ৭০ টাকা খরচ হয়। প্রতি তিন মাস অন্তর লাগানো হয় ২৬ হাজার টাকা দামের টায়ার টিউব।

বছরে টায়ার টিউবই লাগে ৩ লাখ ১২ হাজার টাকার। ইঞ্জিন ওভার হোলিংয়ে লাগে দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা। রেনোভেশনে লাগে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এ ছাড়া চালক শ্রমিকদের বেতন বাবদ বছরে ৪ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। কিলোমিটারপ্রতি ডিজেল খরচ দেখানো হয় ৪৫ টাকা ৬০ পয়সা। ডিজেলের দাম লিটারে ৩৪ টাকা বাড়ার আগে এ খরচ ছিল কিলোমিটারে ৩২ টাকা। এ ছাড়া যেসব খরচ দেখানো হয়েছে তাও অতিরঞ্জিত।

সড়ক পরিবহন আইনে বাসের চালক শ্রমিককে মাসিক বেতনে নিয়োগপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক। টাস্কফোর্সের শেষ সভাতেও শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, নিয়োগপত্র দেওয়ার নজির নেই। ভাড়া নির্ধারণে ঢাকা বাসে বছরে ৬ লাখ ৭০ হাজার এবং দূরপাল্লার বাসে ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা মজুরি দেখানো হয়েছে। সড়ক পবিহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেছেন, মালিকরা মাসিক বেতন ও নিয়োগপত্র দিচ্ছেন না।

নিয়মানুযায়ী বাসের আয়ুষ্কাল ২০ বছর। গত ২৭ জুলাইয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্সের সভায় বাসের আয়ুষ্কাল ২৫ করার আবেদন জানিয়ে বিফল হন মালিকরা। কিন্তু ভাড়া নির্ধারণের সময় কিন্তু আয়ুষ্কাল ধরা হয় মাত্র ১০ বছর। যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, ঢাকার ৯৮ ভাগ বাস চলাচলের অযোগ্য। দূরপাল্লার ৪৮ শতাংশ বাস ২০ বছরের বেশি বয়সী। আজগুবি খরচ দেখিয়ে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

ভাড়া নির্ধারণে খরচের খাতে দেখানো হয়েছে, নগর পরিবহনের বাসে প্রতি ২৫ দিনে একবার ইঞ্জিন ওয়েল (মবিল) বদল করা হয়। এতে ৫ হাজার ৮৮০ টাকা লাগে। মবিল, দুই ধরনে ফিল্টার পরিবর্তন ও গ্রিজিংয়ে মাসে খরচ ১১ হাজার ৬৮০ টাকা। প্রতি তিন মাসে এক বার ক্লাচ প্লেট, চার জোড়া ব্রেকশো পরিবর্তনে ২৭ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে পরিবহন মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, ছয় মাসে একবার মবিল বদল করা হয়।

ব্যয় বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে, ঢাকার বাস প্রতি পাঁচ বছরে একবার রেনোভেশনে (পুনর্র্নিমাণ) সাড়ে ৬ লাখ টাকা খরচ হয়। বছরে লাগে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। দূরপাল্লার বাসে বছরে রেনোভেশন খরচ ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

নগর পরিবহনে বছরে ২৬ হাজার টাকা দামের ১২টি টায়ার টিউব পরিবর্তনে তিন লাখ ১২ হাজার টাকা এবং দূরপাল্লার বাসে ৩৩ হাজার টাকা দামের ১৪টি টায়ার টিউব পরিবর্তনে বছরে চার লাখ ৬২ হাজার টাকা খরচ হয়। যদিও পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার বাসে বছরে একবারের বেশি টায়ার বদল করা হয় না। একাধিক মালিক বলেছেন, দাম বেড়ে যাওয়ায় টায়ার ‘রিট্রেডিং’ বা ক্ষয় হয়ে যাওয়ার পর ওপরে প্রলেপ দিয়ে চালানো হয়। বছরে এক লাখ ২০ হাজারের টাকা বেশি টায়ারে খরচ হয় না।

ঢাকার বাসে বছরে একবার পুরো ইঞ্জিন খুলে তা মেরামতে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। দূরপাল্লার বাসে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও ইঞ্জিন ওভার হোলিংয়ে বছরে খরচ দেখানো হয়েছে সাড়ে ৬ লাখ টাকা!

 

এসবি/এমই