ভর্তুকিতে লাগাম টানার চেষ্টা


সাহেব-বাজার ডেস্ক : চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে ৮২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রেখেছে সরকার। জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের জন্য এ ভর্তুকি রাখা হয়েছে। অর্থনীতির চলমান বাস্তবতায় বিশাল এ ভর্তুকি কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, আইএমএফ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চায় সরকার। এ ঋণ পেতে গেলে তাদের কিছু শর্তও মানতে হবে।

আইএমএফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইউক্রেনে যুদ্ধের জেরে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে এরই মধ্যে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অনুরোধে সাড়া দিতে আইএমএফ প্রস্তুত। আশা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য রেসিলিয়ান্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ট্রাস্ট (আরএসএফটি) ফান্ড সচল হয়ে যাবে। আর এ সময় আইএমএফ কর্মীরা প্রকল্প চূড়ান্ত করতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেবেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফ ইতিবাচক সাড়া দেবে ধরে নিয়ে এর আগেই কাজ শুরু করে দিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছর সরকার ভর্তুকি বাবদ ৮২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা রেখেছে। ঢাকা সফরকারী আইএমএফের প্রতিনিধি দল এত বেশি ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে ভর্তুকি কমিয়ে আনতে পরামর্শ দিয়েছিল।

চলতি অর্থবছরের মোট ৮২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা ভর্তুকির মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকাই যাবে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের বাড়তি দাম মেটাতে। আইএমএফের পক্ষ থেকে সারের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছিল। সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় না করলেও গত সোমবার ইউরিয়া সারের দাম কেজিতে ছয় টাকা বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের দাম ৮১ টাকা।

ছয় টাকা বাড়ানোর ফলে দেশের বাজারে এখন এ সারের দাম ১৬ থেকে ২২ টাকা হয়েছে। তার পরও সরকারকে ৫৯ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। তবে চাহিদার বিপরীতে সব রকম সারের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। আমন মৌসুম (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা আছে ছয় লাখ ১৯ হাজার টন। বিপরীতে মজুদ আছে সাত লাখ ২৭ হাজার টন।

বিপিসির সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ টন। এর ৭৩ শতাংশই ডিজেলে পূরণ হয়। গত শুক্রবার রাতে প্রতি লিটার ডিজেল ৮০ থেকে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পরও প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রিতে বিপিসির লোকসান গুনতে হচ্ছে আট টাকা ২৩ পয়সা করে। এক মাসে এ লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। এ লোকসান সমন্ববয় করতেই অকটেন ও পেট্রলের দাম বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে অকটেন লিটারে ৮৯ থেকে ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। এতে প্রতি লিটার অকটেন বিক্রিতে বিপিসির লাভ হবে ৪৬ টাকা। এ হিসাবে মাসে লাভের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৫৭ কোটি টাকা। পেট্রল লিটারে ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়েছে। এতে মাসে লাভ হবে ৭৪ লাখ টাকা। ফলে জ্বালানি খাতে আপাতত সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে না।

অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার কারণে জ্বালানি তেলের দাম ১৪০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে ধীরে ধীরে কমে গত সোমবার অপরিশোধিত ক্রুড অয়েলের দাম ৯৩ ডলারে নেমে এসেছে। বিশ্ববাজারে স্পট মার্কেটে (খোলাবাজার) তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দাম এখন আকাশচুম্বী। ১০ ডলারের এলএনজি এখন ৩৮ ডলার। প্রতি মিটার এলএনজি ক্রয়ে সরকারের ব্যয় ৫৯.৬০ টাকা। কিন্তু গ্রাহকদের কাছে সেটা এখন ১১ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এসব কারণে আপাতত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ রেখেছে সরকার। বাড়তি দামে এলএনজি আমদানির কারণে গত র্অবছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে সরকারের।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাড়তি দামের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে। সরকারি- বেসরকারি ৯০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে গত বছরের জুলাই থেকে গত মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে সরকার ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা কেন্দ্রভাড়া দিয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।

আইএমএফ এ খাতের বাড়তি ভর্তুকিকে সমর্থন করে না। তাই রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে আসা প্রতিনিধি দলটি বিদ্যুতের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে আনার পরামর্শ দিয়েছিল। সরকার সে পরামর্শ মেনে বিদ্যুতের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে কাজ শুরু করেছে।

তবে বিষয়টিকে ভালোভাবে দেখছেন না অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। ভোক্তার খরচ বাড়বে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই পড়বে বলে মনে করছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এখন কিছুটা নিম্নমুখী। তার পরও ভর্তুকি কমানোর কারণে সরকার দাম বাড়িয়েছে। এখন সরকারের উচিত হবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে এলে তা দ্রুত সমন্বয় করা।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বিশ্ববাজারের কম দামের জ্বালানি তেল দেশের বাজারে এলে দাম কমে যাবে। হঠাৎ এত মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা কী এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আশপাশের দেশগুলোর কী অবস্থা? এখানে যে দাম বাড়ানো হয়েছে লজিক ছাড়া তো বাড়ানো হয়নি। বারবার বলছি, যখন দাম বাড়ে আমাদের জনগণের প্রতি লক্ষ্য থাকে- তা হলো কতটুকু বাড়বে, কতটুকু সহ্য করতে পারবে।

 

এসবি/এমই