ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের ৪৯ শতাংশ মাত্র ৫ ব্যাংকে


সাহেব-বাজার ডেস্ক : ব্যাংক খাতের মোট সম্পদ ও খেলাপি ঋণ হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এ খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৪৯ শতাংশেরও বেশি কেন্দ্রীভূত রয়েছে মাত্র ৫টি ব্যাংকে। আর শীর্ষ ১০ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ রয়েছে সাড়ে ৬৪ শতাংশ। এ ছাড়া এককভাবে ৯টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ২০ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে শীর্ষ ৫ ব্যাংকে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে ৩১ শতাংশ। আর শীর্ষ ১০ ব্যাংকে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার পরিমাণ প্রায় ৪৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরভিত্তিক আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। গতকাল এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। তবে প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ধারাবাহিক খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে ব্যাংক খাতে সম্পদের মান ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। এতে ঝুঁকির মাত্রাও বাড়ছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্র্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা ও ঝুঁকির মাত্রা নিয়ে প্রতি তিন মাস পর পর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হারের দিক থেকে শীর্ষে থাকা ব্যাংকগুলোর মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এই ৯ মাসে নতুন করে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ১২২ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদায় অযোগ্য মন্দমানে পরিণত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৮৮ শতাংশের চেয়েও বেশি। শুধু পরিমাণের দিক থেকেই নয়, শতাংশ হিসাবেও এ সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। গত জুনে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণের শীর্ষে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও একটি বেসরকারি ব্যাংক। এগুলো হলো- সোনালী, জনতা, অগ্রণী, বেসিক ও ন্যাশনাল ব্যাংক। সূত্রগুলো বলছে- গত কয়েক বছরে এই পাঁচ ব্যাংকে বড় ধরনের ঋণ অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সোনালী ও জনতা ব্যাংকে ঘটেছে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা। সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর সময়ে বেসিক ব্যাংকেও বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। আর বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে প্রয়াত সংসদ সদস্য আসলামুল হকের চার প্রতিষ্ঠানকে বড় ধরনের অর্থায়ন করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীর্ষ এই পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের ৪৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকে ২০ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের ২৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রয়েছে সোনালী ব্যাংকের, ১২ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা বা ১৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ ১২ হাজার ১৮৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে অগ্রণী ব্যাংকের, যা তাদের মোট বিতরণ করা ঋণের ১৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। এ ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের ১১ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা বা ২৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ ও বেসিক ব্যাংকের ৭ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা বা ৫৮ দশমিক ৬২ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে।

এ ছাড়া ওই প্রতিবেদনে শীর্ষ ৯ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ২০ শতাংশের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই ৯ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ২০ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের হারে শীর্ষে রয়েছে বিদেশি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। ব্যাংকটি বিতরণ করা ঋণের ৯৭ দশমিক ৯০ শতাংশই এখন খেলাপি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৮৩ দশমিক ২০ শতাংশ। আর ৬৭ দশমিক ০৮ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চতুর্থ প্রজন্মের পদ্মা ব্যাংকে। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের ৫৮ দশমিক ৬২ শতাংশ, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৪৫ দশমিক ৪২ শতাংশ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ, জনতা ব্যাংকের ২৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ রয়েছে ৬টি ব্যাংকে। এ ছাড়া ২ শতাংশের বেশি কিন্তু ৩ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ রয়েছে ৫টি ব্যাংকে। এ ছাড়া ৩ শতাংশের বেশি কিন্তু ৫ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ রয়েছে ২২টি ব্যাংকে, ৫ শতাংশের বেশি কিন্তু ১০ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ রয়েছে ১১টি ব্যাংকে, ১০ শতাংশের বেশি কিন্তু ১৫ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ রয়েছে ৪টি ব্যাংকে, ১৫ শতাংশের বেশি কিন্তু ২০ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ রয়েছে ৩ টি ব্যাংকে।

প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৮৮ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে ৭৫ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন সংরক্ষণে ঘাটতি ছিল ১৩ হাজার ৫২৯ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার যোগ দিয়েই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পৃথকভাবে তদারকির উদ্যোগ নেন। এর অংশ হিসেবে ১০টি দুর্বল ব্যাংককে চিহ্নিত করা হয়। খেলাপি ঋণের মাত্রা, মূলধন পর্যাপ্ততা, ঋণ-আমানত অনুপাত ও প্রভিশন এই চার সূচকের ভিত্তিতে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে চিহ্নিত করা হয়। এগুলোর সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করার পর এরই মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইও করা হয়েছে।

 

এসবি/এমই