বোরো মৌসুমে সেচ খরচ বাড়বে ৭৫৬ কোটি টাকা

  • 1
    Share

সাহেব-বাজার ডেস্ক : বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান। আউশ, আমন ও বোরো- এ তিন মৌসুমে ধান চাষ করা হয় এখানে। এর মধ্যে দেশের উৎপাদিত চালের অর্ধেকেরও বেশি আসে বোরো থেকে, যা পুরোপুরি সেচনির্ভর মৌসুম। ধানের পাশাপাশি বেশকিছু ফসলও সেচনির্ভর। কিন্তু হঠাৎ করেই ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ায় কৃষকের মাথায় হাত।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বেড়ে যাবে ফসলের উৎপাদন খরচ, কমবে মুনাফা। অনেকের কাছে তো লাভ-লোকসানের হিসাব মেলানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক বোরো মৌসুমেই দেশের কৃষকদের সেচে বাড়তি খরচ গুনতে হবে ৭৫৬ কোটি ৬১ লাখের বেশি টাকা।

সরকার সর্বশেষ ২০১০ সালে বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ৯১ লাখ কৃষককে ডিজেলে ভর্তুকি হিসেবে ৭৫০ কোটি টাকা দেয়। এর পর থেকে বাজেটে সেচকাজে ডিজেলের জন্য ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখলেও ভর্তুকির সেই অর্থ চলে যায় সার আমদানিতে।

অনেক কৃষক বলছেন, বর্তমান সরকার কৃষি ও কৃষকবান্ধব বলে দাবি করলেও ডিজেলের দাম বাড়িয়ে তার উল্টো প্রমাণ দিল। এর চাপ শুধু কৃষকই নয়, সাধারণ মানুষকেও বইতে হবে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে মোট কৃষক রয়েছে ১ কোটি ৬২ লাখ। এদের প্রায় সবাই ধান চাষের সঙ্গে জড়িত। তবে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, কৃষি উপকরণের দামের ঊর্ধ্বগতিতে এমনিতেই দিশেহারা কৃষক।

করোনার কারণেও পরিস্থিতি নাজুক। এর মধ্যে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ায় কৃষি ক্ষেত্রে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কৃষক তো আর লোকসান দিয়ে জমি চাষ করবে না। ফলে সামনের বোরো মৌসুমে কমে যেতে পারে মোট উৎপাদন। এমন পরিস্থিতিতে তাই ডিজেলের ওপর ভর্তুকি ও কৃষিপণ্যের বাজারমূল্য বাড়ানোর সুপারিশের পাশাপাশি সেচ ব্যবস্থাপনায় ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়নে জরিপ ও পরিবীক্ষণ ডিজিটালাইজেশনকরণ প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ জাফর উল্লাহ জানান, সারাদেশে ২০১৯-২০ সালে বোরো মৌসুমে ডিজেল ও বিদ্যুৎচালিত ১৬ লাখ ৩৮ হাজার ৫৫৪টি সেচযন্ত্র ব্যবহার হয়েছে। এর মধ্যে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহার হয় ১২ লাখ ৬২ হাজার ৫৩৩টি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) জানায়, দেশে প্রায় ১৬ লাখ ডিজেলচালিত ছোট সেচযন্ত্র (শ্যালো মেশিন) রয়েছে। শীতকালীন সবজি, পুকুর ও ঘেরে মাছ চাষ, পণ্য পরিবহন, নৌযান চালানোর মতো কাজে সারা বছরই ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের ব্যবহার হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, এ বছর ৪৮ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ বা ৩৩ লাখ ৭৪ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হবে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র দিয়ে। আর বোরো মৌসুমে সারাদেশে প্রায় ১৬ লাখ টন ডিজেলের ব্যবহার হয়। প্রতি লিটার ডিজেলে ১৫ টাকা করে বাড়ায় কৃষককে বাড়তি খরচ গুনতে হবে ৭৫৬ কোটি ৬১ লাখের বেশি টাকা। বাকি ৩০ শতাংশ জমিতে সেচ দেওয়া হবে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্র দিয়ে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, প্রতি বিঘা জমিতে সেচ ও চাষ দিতে দরকার ২০ লিটার ডিজেল। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে এ বছর কৃষকের বিঘাপ্রতি ৩০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে। এতে করে কৃষকের ধান বিক্রিতে মুনাফা কমবে প্রায় ৩ শতাংশ।

কৃষিবিষয়ক সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবে, কৃষকের ধানের উৎপাদন খরচ প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সার ও কীটনাশকের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বাড়ছে কৃষি শ্রমিকের মজুরিও। সব মিলিয়ে প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন খরচ বছরে বাড়ছে এক থেকে দুই টাকা।

সরকারি হিসাবে, গত মৌসুমে বোরো ধানের কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ ছিল ২৭ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয় ১ হাজার ৮০ টাকা। এবার সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এতে করে ধান বিক্রিতে কৃষকের মুনাফা কমবে প্রায় ৩ শতাংশ।

কৃষক আমীনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রতিবছর বোরো মৌসুমে প্রায় ৬ বিঘা জমিতে ধান চাষ করি। পুরো জমিতেই সেচ দেওয়া হয় ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন দিয়ে। এ বছর ডিজেলের দাম বাড়ায় শুরু হয়েছে নতুন টেনশন। এমনিতেই ধান চাষের খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হয়। তার ওপর আবার ডিজেল লিটারে দাম বেড়েছে ১৫ টাকা। তাই কী করব বুঝে উঠতে পারছি না।’ আমীনুল ইসলামের সুরেই অনেক কৃষক হতাশার কথা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সাবেক সভাপতি ও গবেষক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সামনে বোরো মৌসুম। এ সময় ব্যাপকভাবে ডিজেল ব্যবহার হয়। খরচ বাড়ার কারণে কৃষক চাষাবাদ কমিয়ে দেবে। এতে আমাদের উৎপাদন বিঘ্নিত হবে।’

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কৃষকদের জন্য সরাসরি ভর্তুকির প্রস্তাব তুলে ধরে এ গবেষক বলেন, ‘২০১০ সালের পর থেকে কৃষিতে ডিজেলের ওপর ভর্তুকি বন্ধ আছে। এ মুহূর্তে সংকট নিরসনে ঢালাওভাবে ডিজেল ব্যবহারকারীদের ভর্তুকি দিতে হবে। বাড়তি খরচ দিয়ে ফসল উৎপাদনের পর কৃষক পণ্যের দাম না পেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে করে কৃষক চাষবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এক সময়।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক কৃষিবিদ মো. হামিদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সেচ ব্যবস্থাপনায় বিকল্প চিন্তা করতে হবে। সেচে পানির অপচয় কমাতে সরকার অবশ্য বেশকিছু কাজ করছে। এ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। পরিবেশবান্ধব সৌর বিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা প্রচলন বাড়াতে হবে। এ ছাড়া খাল খননসহ নানা উপায়ে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে সেচের ব্যবস্থায় ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে।’

কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (কেআইবি) মহাসচিব কৃষিবিদ মো. খায়রুল আলম (প্রিন্স) বলেন, ‘বোরো মৌসুমে ব্যবহৃত সেচযন্ত্রগুলো প্রায় সবই ডিজেলচালিত। এতে সেচ খরচ বেড়ে যাবে। কৃষির স্বার্থে তাই অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো সেচেও কৃষকদের কীভাবে স্বল্পমূল্যে ডিজেল দেওয়া যায়, সে বিষয়ে সরকার চিন্তাভাবনা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ, স্টেকহোল্ডার, কৃষকসহ সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করছি।’

এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘সরকার কৃষককে নানা রকম সহায়তা দিচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে সারের দাম বাড়লেও দেশে বাড়ানো হবে না। এ ছাড়া কৃষি যন্ত্রপাতিতেও বড় ধরনের ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। অনেক কৃষককে বিনামূল্যে বীজ ও কীটনাশক দেওয়া হচ্ছে। অন্যান্য ক্ষেত্রে কৃষককে ব্যাপকভাবে সহায়তা দেওয়ায় ডিজেলের দাম বাড়লেও কৃষিতে তার প্রভাব পড়বে না। তাই ডিজেলে ভর্তুকি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই আমাদের।’

এসবি/এমই


  • 1
    Share