বেআইনি ‘আপসে’ ফাঁসছে অনেকে

  • 1
    Share

সাহেব-বাজার ডেস্ক : ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায় উল্লেখিত ৬১টি অপরাধের মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সম্মতিতে আসামি পক্ষের আপস হতে পারে। এর বাইরে হত্যা ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে কোনো আপস বেআইনি। কিন্তু তারপরও হত্যা ধর্ষণসহ গুরুতর অপরাধের মামলায় আপস হচ্ছে। কখনো আর্থিক লোভে, কখনো বা প্রভাবশালীদের চাপে পড়ে এ ধরনের আপস হয়। আর এতেই ফেঁসে যাচ্ছেন বাদীপক্ষসহ আপসের সঙ্গে জড়িত অনেকেই। সম্প্রতি হাইকোর্টে এ ধরনের বেশ কয়েকটি বেআইনি আপসের ঘটনা ধরা পড়েছে। এর কারণে ওসব মামলার বাদীপক্ষ উল্টো মামলায় জড়িয়েছেন।

কেস স্টাডি-১
চার বছরের শিশু সন্তানকে হত্যার অভিযোগে করা মামলার আসামির জামিনে অনাপত্তিপত্র দিয়ে ফেঁসেছেন বাবা খসরু মিয়া। গত ২ ফেব্রুয়ারি খসরু মিয়াকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া খসরু মিয়ার বিরুদ্ধে মামলারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ সিলেটের বিয়ানীবাজার থানার ওসিকে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলেন।

গত বছর ৭ জুন সিলেটের বিয়ানীবাজারে ওই শিশুকে হত্যার ঘটনায় সদর থানায় মামলা করেছিলেন খসরু মিয়া।

অভিযোগ করা হয়, আসামি ইব্রাহিমের সঙ্গে চাচির অবৈধ সম্পর্ক দেখে ফেলায় শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় শিশুটির চাচি সুরমা বেগম ও ইব্রাহিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দেন সুরমা। এর পরই গত বছর নভেম্বরে এ মামলায় সিলেটের আদালতে জামিনের আবেদন করেন ইব্রাহিম। ওই আবেদনের সঙ্গেই জমা দেওয়া হয় খসরু মিয়ার অনাপত্তিপত্র। কিন্তু আদালত ওই জামিন আবেদন খারিজ করে দিলে হাইকোর্টে আবেদন করেন ইব্রাহিম। কিন্তু হাইকোর্টও আবেদন খারিজ করে উল্টো মামলার বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

কেস স্টাডি-২
গত বছর ২২ অক্টোবর টাঙ্গাইলের সারুটিয়ায় ভাড়া বাসায় ধর্ষণের শিকার হন এমন অভিযোগ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আলী হোসেনের বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলা করেন এক নারী। মামলার বিবরণে বলা হয়, বাসা পরিবর্তনের সময় ওই নারীর স্বামীকে টাকা ধার দিয়েছিলেন আলী হোসেন। একদিন পাওনা টাকা চাইতে এসে বাদীর স্বামী বাসায় না থাকার সুযোগে আলী হোসেন ধর্ষণ করেন ওই নারীকে। বর্তমানে মামলাটির তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় গত ৮ ডিসেম্বর আসামির সঙ্গে ২৫ হাজার টাকায় আপস করে অঙ্গীকারনামা দেন বাদী। সে অনুযায়ী আলী হোসেন হাইকোর্টে জামিন নিতে আসেন। আগাম জামিন আবেদনে আপসের বিষয়টিও উল্লেখ করেন। গত ২৮ ডিসেম্বর বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি কেএম জাহিদ সারওয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চ ক্ষোভ প্রকাশ করেন আপসের বিষয়টি দেখে। পরে আদালত আসামির সঙ্গে আপসের বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পেলে ওই নারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে টাঙ্গাইল সদর ওসিকে নির্দেশ দেন। এ ছাড়া উচ্চ আদালতে জামিন আবেদনে বাদীর দাখিলকৃত অঙ্গীকারনামার সত্যতা পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়।

কেস স্টাডি-৩
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায় সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে কারাগারে আছেন ৭২ বছর বয়সী ফজলু দফাদার। গত ১১ জানুয়ারি ফজলু দফাদার কারাগারে অসুস্থ উল্লেখ করে জিন্নাগড় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে এ মামলার বাদী ও বিবাদীপক্ষ আপস করে। এতে মামলার বাদী আলী আকবর ছাড়াও জিন্নাগড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হোসেন মিয়া এবং তিন ইউপি সদস্যসহ ৬ জন উপস্থিত ছিলেন। আপসনামায় তারা উল্লেখ করেন, আসামির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকায় তার জামিন পেতে কোনো আপত্তি নেই বাদীপক্ষের। এ আপসনামা সংযুক্ত করে ফজলু দফাদারের পক্ষে হাইকোর্টে জামিন আবেদন করা হয়। গত বছরের ২৭ আগস্ট আসামির জামিন শুনানিকালে বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি শাহেদ নুরউদ্দিনের বেঞ্চ বলেন, ধর্ষণ মামলা বিচারাধীন থাকাবস্থায় আপস করার এখতিয়ার ইউপি চেয়ারম্যান বা সদস্যের নেই। তাই শুনানি শেষে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভোলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারককে নির্দেশ দেন।

আইনে মামলা আপসের সুযোগ
সব ধরনের দেওয়ানি মামলায় বিচারের যে কোনো পর্যায়ে বাদী-বিবাদীপক্ষের মধ্যে আপসের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ফৌজদারি অপরাধগুলো সমাজের বিরুদ্ধে সংঘটিত বলে এসব অপরাধের বিচার সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের হাতে ন্যস্ত। তারপরও ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রেও কিছু অপরাধ পক্ষদ্বয়ের পারস্পরিক সমঝোতা বা চুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায়। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৩৪৫ ধারায় ‘আপসযোগ্য অপরাধ’বিষয়ক যাবতীয় বিধান উল্লেখ রয়েছে- যেসব অপরাধ তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ এবং যেগুলোয় রাষ্ট্রের স্বার্থের তুলনায় কেবল ব্যক্তিস্বার্থই ক্ষুণœ হয়ে থাকে, সেসবের বিচার আপসের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হতে পারে। ফৌজদারি মামলায় আপসের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি। ৩৪৫ ধারার অপরাধগুলোকে আপসযোগ্যতার ভিত্তিতে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ভাগে রয়েছে ১৭টি অপরাধের তালিকা, যেগুলোতে আদালতের অনুমতি ছাড়াই তৃতীয় কলামে উল্লিখিত ব্যক্তি আপস করতে পারবে। দ্বিতীয় ভাগে আছে আরও ৪৫টি অপরাধের তালিকা, যেগুলো আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে কলামে উল্লিখিত ব্যক্তি আপস করতে পারে। তবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায় উল্লেখ নেই, এমন অপরাধে আপস করা যাবে না।

যেসব অপরাধের আপস হয় : দাঙ্গা, অস্ত্র-সজ্জিত দাঙ্গা, গুরুতর আহত করা, গুরুতর আহত করতে উসকানি, মানুষের জীবন বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিঘিœত করা, মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে অবহেলাজনিত অপরাধ, কাউকে অবৈধভাবে আটক, চাঁদাবাজি, চুরি, অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ ও বিশ্বাসভঙ্গ, জালিয়াতি, প্রতারণা, কলহ-বিবাদসহ আরও বেশকিছু কম গুরুতর অপরাধ।

যেসব অপরাধের আপস হয় না : হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলাসহ বিশেষ আইনে দায়ের হওয়া কোনো মামলায় আপস চলে না। তবে ২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের যৌতুক সংক্রান্ত ১১(গ) ধারা সংশোধন করে আপসযোগ্য করার নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী আইনের ওই ধারাটি সংশোধন করে আপসযোগ্য করা হয়েছে। আপসযোগ্য না হলেও আইনের বিধান লঙ্ঘন করে আপস করা হলে তা ফৌজদারি কার্যবিধির ২১৩ ও ২১৪ ধারা আনুযায়ী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

আপসের পরিধি বাড়ানোর দাবি : ফৌজদারি মামলায় আপসের পরিধি বাড়ানোর দাবি উঠেছে অনেক আগেই। মামলা জট কমাতে ২০১০ সালে আইন কমিশন থেকে এ ব্যাপারে সরকারের কাছে একটি সুপারিশও গেছে। এ জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয় সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদের সময়ে। কিন্তু পরে সেটি আর এগোয়নি। তখন আইন কমিশন যে সুপারিশ করেছিল তাতে বলা হয়, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারা অনুসারে ফৌজদারি মামলায় আপসের যে বিধান রয়েছে তা অপর্যাপ্ত বলে পরিলক্ষিত হয়। দ-বিধিতে বর্ণিত অনেক মামলা পারিবারিক বা ভূমি বিরোধের কারণে দায়ের করা হয় যা পরে পক্ষগণ নিজেদের স্বার্থে তথা সমাজে শান্তিশৃৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আপস করেন। ওইসব মামলায় সাক্ষীর অভাবে বছরের পর বছর বিচারাধীন থাকার পর শেষ পর্যন্ত আসামিকে খালাস দিতে হয়। ফলে দ-বিধির ১৪৩, ৩০৭, ৩২৬, ৩৮৫, ৪০৪, ৪০৮, ৪১১, ৪১২, ৪২০, ৪৬৮, ৫০৬ (পার্ট-২) ধারাগুলো কেবল আদালতের অনুমতিক্রমে আপসযোগ্য করে ফৌজদাার কার্যবিধির ৩৪৫ ধারার পরিধি বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

আইন বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, যেসব অপরাধ গুরুতর সেগুলোতে আপস হয় না। কিন্তু অনেক সময় গ্রাম্য শালিসে আপস করা হয়। অনেকে অনেক সময় নানা ধরনের চাপে পড়ে বাধ্য হয় আপসে। কিন্তু আইনে যেগুলো আপসের সুযোগ রাখা হয়নি, সেগুলোতে কোনোভাবেই আপস করা যাবে না। এটা অজ্ঞতার কারণেও অনেক সময় করে থাকে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আপসযোগ্য নয় তারপরও সেটা করা হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, আপসের বিষয়টি নির্ভর করে অপরাধের ধরনের ওপর। যেসব অপরাধ খুবই জঘন্য, ঘৃণ্য সেগুলোতে কখনই আপস করা যাবে না। করলে সমাজে অস্থিরতা, অন্যায়-অবিচার বেড়ে যাবে। তবে যেসব অপরাধ গুরুতর নয়, সে ক্ষেত্রে বাদীপক্ষ চাইলেই আপস করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ৩৪৫ ধারায় যেগুলো উল্লেখ আছে, তার সঙ্গে আরও কিছু অপরাধ আযোগযোগ্য করে যুক্ত করা যেতে পারে। এটা করলে মানুষ দ্রুত বিচার পাবে বলে আমি মনে করি।


  • 1
    Share