বিরূপ প্রভাব পড়বে কৃষির সব ক্ষেত্রেই


সাহেব-বাজার ডেস্ক : সরকার সামগ্রিকভাবে দেশের কৃষি খাতের বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বললেও সামগ্রিক কার্যক্রমে তা প্রকাশ পাচ্ছে না। এমনিতেই এ বছর বন্যা, অতিবৃষ্টি ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে। তার ওপর ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে নিত্যপণ্যসহ সব কৃষিপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। প্রতিদিনই বাড়ছে চাল-ডাল, চিনি ও তেলসহ প্রায় সব কিছুর দাম।

এতে চোখে অন্ধকার দেখছেন কৃষকরা। এদিকে হঠাৎ করেই গত ১ আগস্ট ইউরিয়া সারের দাম কেজিতে বাড়ানো হয় ৬ টাকা। এই ধাক্কার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আগাম কোনো ঘোষণা ছাড়াই ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ৩৪ টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে সেচকাজে। সব মিলিয়ে এখন দিশাহারা কৃষক। এত সংকটের মধ্যে উৎপাদন ধরে রাখার বিষয়টিকে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সামনের বোরো ও রবিশস্য আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ মোট বার্ষিক ধান উৎপাদনের ৬০ শতাংশই বোরো, যা মূলত সেচনির্ভর। দেশে সেচযন্ত্রের মোট সংখ্যা ১৬ লাখ ১০ হাজার। এর মধ্যে ১৩ লাখ ৪০ হাজার ডিজেলচালিত। বাকি ২ লাখ ৭০ হাজার সেচযন্ত্র চলে বিদ্যুতে।

বোরো ছাড়াও রবিশস্য আবাদে সেচের ব্যবহার বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে এখন আমনেও সেচ দিতে হচ্ছে। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষি উৎপাদন খরচ প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা বিশেষভাবে বিপাকে পড়েছেন। কৃষির খরচ জোগাতে ব্যর্থ হবে অনেক কৃষক। অনেকে আবার উচ্চসুদের ঋণের জালে আটকে যাবেন। উচ্চউৎপাদন খরচ মিটিয়ে ফসলের ন্যায্যমূল্য কৃষক পাবে কি না, তা নিয়েও ব্যাপক সংশয় রয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষি উৎপাদনে। প্রথমত সেচ খরচ বেড়ে যাবে প্রায় দ্বিগুণ। কৃষিপণ্য উৎপাদনের প্রতিটি স্তরে বাড়বে খরচ। যে কারণে উৎপাদনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং উৎপাদন কমে যাবে। .

যন্ত্রনির্ভর চাষ, সেচ, পরিচর্যা ও উত্তোলনসহ সব স্তরেই কৃষককে গুনতে হবে বাড়তি টাকা। কারণ এগুলো সবটাই জ্বালানিনির্ভর। সেই হিসেবে সরকারের কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কার্যক্রম ব্যাহত হবে। পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের পরিবহন খরচ বেড়ে যার কয়েকগুণ। এ কারণে কৃষিপণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এতে করে সাধারণ ক্রেতা কম কিনবে। ফলে কৃষক উৎপাদনে আগ্রহ হারাবে এবং নিরুৎসাহিত হবে।’

দেশে খাদ্য উৎপাদন কম হলে আমদানিনির্ভরতা ও সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে বলে উল্লেখ করেন ড. জাহাঙ্গীর। তাই কৃষির জন্য ব্যবহৃত ডিজেলের ক্ষেত্রে সরকারকে আরও চিন্তা করা উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা থাকে। কোনো কারণে যদি এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হয় তাহলে আমদানির উপর নির্ভর করতে হবে। আমরা যেন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়েই চাহিদা পূরণ করতে পারি, তার জন্য যা যা করণীয় সে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। যেহেতু এখন বৈশ্বিক সংকট চলছে, তাই আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে হবে।

সাংবাদিক, কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ বলেন, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। এখন আমন মৌসুম চলছে। এ বছর এমনিতেই খরার কারণে কৃষক আমনে বিরাটভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে সময় বৃষ্টির মৌসুম সে সময় খরা, এটা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব। এমন অবস্থায় যেসব কৃষক একটু সচ্ছল তারা সেচ দিয়ে আমন রোপণ করছেন। এখন ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেচ দিয়ে অনেক কৃষক আমন ধান রোপণ করতে পারবেন না। আর যদি সেচ দিতে না পারে তাহলে চারা মারা যাবে। সে ক্ষেত্রে কৃষক জমি ফাঁকাই রাখবে।

এতে মোট আমনের উৎপাদন অনেকাংশেই কমে যাবে। এর মধ্যে যেসব এলাকায় বৃষ্টি হয়েছে সেখানকার কৃষক আমন রোপণ করতে পারছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এমন বিরূপ প্রভাবের মধ্যে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি কৃষকের মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এটা তো গেল আমন ফসলের ওপর। এরপর বোরো ও রবি মৌসুম তো রয়েছেই। এখানে আমাদের বোরো মৌসুম পুরোটাই সেচনির্ভর। শুধু তাই না, আমাদের ডিজেলচালিত কৃষিযন্ত্র যেমন, চাষ থেকে শুরু করে ফসল উত্তোলন এবং পণ্যপরিবহন সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়বে। এ ছাড়া মাছ চাষের ক্ষেত্রের এর প্রভাব পড়বে। মোটকথা হলো কৃষি খাতের সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়বে বলে আমি মনে করছি।

 

এসবি/এমই