বাংলাদেশকে সস্তায় তেল দেবে রাশিয়া


সাহেব-বাজার ডেস্ক : রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেল, লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) ও কয়লাসহ সব ধরনের জ্বালানি পণ্যের দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অধিকাংশ দেশ উচ্চমূল্যে জ্বালানি পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশের কাছে ‘সস্তায়’ জ্বালানি তেল (ক্রুড বা অপরিশোধিত) বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া।

বাংলাদেশ এই প্রস্তাবে রাজি হবে কিনা, তা নিয়ে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ। এই বিশ্লেষণে দুটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথমত, অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করা কিংবা মজুদের সক্ষমতা বাংলাদেশের কতটুকু রয়েছে; দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার তেল কিনলে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে? অবশ্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরও ভারত ও চীন সস্তায় রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র যে এ বিষয়টি ভালোভাবে নিচ্ছে না, সেটাও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ রাশিয়ার প্রস্তাবের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিদ্যুৎ ভবনের বিজয় হলে ‘সাইবার সিকিউরিটি ইন পাওয়ার সেক্টর পলিসি অ্যান্ড অপারেশন পারসপেকটিভ’ শীর্ষক কর্মশালায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, রাশিয়ার কাছ থেকে ক্রুড অয়েল কেনার প্রস্তাব এসেছে। এখন তেল কেনার দরকার আছে কিনা, সেটা পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে।

এদিকে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, রাশিয়ার ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বাংলাদেশে বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে মঙ্গলবার বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার মান্টিটস্কি জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

জ্বালানি বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, রাশিয়ার ওপর আর্ন্তজাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। রাশিয়া যুদ্ধের আগে যে পরিমাণ তেল বিক্রি করত, এখন সেটা পারছে না। এ অবস্থায় যাদের কাছে বিক্রির সুযোগ রয়েছে, তাদের কাছে বিক্রির চেষ্টা করছে রাশিয়া।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘রাশিয়া জিটুজি ভিত্তিতে তেল বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে। সরকার তাদের প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে।’ প্রস্তাবের বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনো আসলে বিস্তারিত বলার মতো কিছু হয়নি। তেলের দাম কত হবে, কী প্রক্রিয়ায় আসবে, মূল্য পরিশোধ ডলারে না রাশিয়ান মুদ্রায় হবে, সেসব বিষয় এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘রাশিয়া হয়তো আর্ন্তজাতিক বাজারের চেয়ে কম দামে তেল দেবে। তবে বাংলাদেশ সেই সুযোগ হয়তো নিতে পারবে না। কারণ বাংলাদেশ বছরে ১৫ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল আমদানির করে এবং সরকারি পরিশোধন প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে পরিশোধন করে। এসব জ্বালানি তেল আমদানির বছরভিত্তিক ক্যালেন্ডার রয়েছে। জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের চেইন ঠিক রাখতে সব সময় পাইপলাইনে জ্বালানি তেল আমদানির প্রক্রিয়া থাকে। এছাড়া আমাদের যে রিফাইনারি প্রতিষ্ঠান, সেটা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ক্রুড অয়েল রিফাইনের উপযোগী। ফলে রাশিয়ার ‘উরাল ক্রুড’ অয়েল সেই রিফাইনারিতে রিফাইন হবে, কিনা সেটাও বিবেচ্য বিষয়।”

ওই কর্মকর্তার বক্তব্য, ‘মূলত মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ ছয়টি অঞ্চলে ক্রুড অয়েল উৎপাদন হয়। অঞ্চলভেদে ক্রুড অয়েলের বৈশিষ্ট্যে ভিন্নতা রয়েছে। ফলে রাশিয়ার তেল আমদানির ক্ষেত্রে অনেক বিষয় সরকাকে বিশ্লেষণ করতে হবে।’

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ এখন বছরে ৫০ লাখ টন ডিজেল, ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল, দুই লাখ টন ফার্নেস অয়েল এবং এক লাখ ২০ হাজার টন অকটেন আমদানি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় ভর্তুকি দিয়ে দেশের বাজারে বিক্রি করতে সরকারকে প্রতিদিন ১৫ কোটি ডলারের বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি দাম বাড়বে কিনা, এমন প্রশ্নে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখতে চাই। বাড়াতেও চাই না, কমাতেও চাই না। দাম যতটুকু কমেছে, তাতে করে এখনই সমন্বয় করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘জনগণের ওপর থেকে জ্বালানি খরচের চাপ কমাতে তরল জ্বালানির পরিবর্তে বিদ্যুৎচালিত গণপরিবহন চালু করা উচিত। এখন বৈদ্যুতিক থ্রি হুইলারগুলো চলছে। এগুলো জনগণকে খরচের ব্যাপারে স্বস্তি দিচ্ছে। ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক বাস ও অন্যান্য গণপরিবহন চালানোর উদ্যোগ নিতে হবে। রেল বিভাগ চাইলে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করতে পারে।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী বছর আমাদের বেশ কয়েকটি গ্যাসভিত্তিক ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হতে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমরা বেশকিছু তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে পারব। এতে জ্বালানি সাশ্রয় হবে।’

 

এসবি/এমই