বহিরাগত নেতৃত্বে শক্তিশালী হচ্ছে জামায়াত-শিবির


নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীতে জামায়াত-শিবিরের সাংগঠনিক শক্তি নেই ২০১১ সাল থেকে। ২০১৫ সালের পর থেকে হারিয়ে যায় তারা। বিভিন্ন সময়ে নাশকতা অভিযোগে তারা গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে তারা তৎপর ছিল রাজনীতির মাঠ গরম করার জন্য। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য তা পারেনি। রাজশাহীতে আবারও নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে দলটির নেতাকর্মীরা। রাজশাহীতে যারা বর্তমানে জামায়াত ইসলামের নেতৃত্বে আছে তারা সবাই বহিরাগত। এদের মধ্যে নাশকতা মামলার আসামিরাও আছে।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ১৯৮৮ সালে তৎকালীন ছাত্রশিবিরের রাজশাহী মহানগরের সভাপতি ছিলেন কেরামত আলী। তার নেতৃত্বে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি ডা. জামিল আক্তার রতনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হলে তিনি রাজশাহী ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর সুযোগ বুঝে তিনি তার এলাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ফিরে যান। সেখানে পরপর দুইবার উপজেলা চেয়ারম্যান থাকেন।

সম্প্রতি কেরামত আলীকে রাজশাহী মহানগর জামায়াতের আমির করা হয়েছে। তিনিই এখন জামায়াতকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন। নগরীর উপকণ্ঠ বায়া এলাকায় পরিচয় গোপন রেখে আবু মারুফ নামে বসবাস করছেন। সেখান থেকেই দলকে শক্তিশালী করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। পুলিশ জানিয়েছে, এ জামায়াত নেতা আত্মগোপনে রয়েছেন। তাই তাকে গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না।

রাজশাহী মহানগর জামায়াতের বর্তমান সেক্রেটারি এমাজউদ্দিন মণ্ডল। তিনি ঝিনাইদহ জেলার হরিনাকুণ্ডু উপজেলার বাসিন্দা। তার নামে হরিনাকুণ্ডু থানায় পাঁচটি নাশকতার মামলা আছে। গত ২২ এপ্রিল তিনি গোপন বৈঠক করার সময় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে জামিন নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

সম্প্রতি মহানগর শিবিরের সেক্রেটারি উসামা রায়হানকে ৬ সহযাগীসহ গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, তারা নাশকতার জন্য গোপন বৈঠক করছিলেন। উসামার বাড়ি খুলনা নগরীর নিউমার্কেট এলাকায়।

কক্সবাজারের ফরিদ উদ্দীন আক্তার আগে ছিলেন চট্টগ্রাম শিবিরের নেতা। তিনি এখন রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গা থানা জামায়াতের আমির। চট্টগ্রামের এই সাবেক শিবির নেতা এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাজশাহী জামায়াত-শিবিরের। পুলিশের হাতে তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছেন একাধিকবার। এমন অনেক বহিরাগতকে দিয়েই রাজশাহীতে জামায়াতকে শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে।

নাটোরের বড়াইগ্রামের বাসিন্দা রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি শাহাদাত হোসেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে জন্ম নেওয়া সিরাজুল ইসলাম এখন রাজপাড়া থানা জামায়াতের আমির। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের বাসিন্দা মাইনুল ইসলাম রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি। এরা সবাই মসজিদ মিশন অ্যাকাডেমি স্কুল ও কলেজে শিক্ষকতা করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মসজিদ মিশন অ্যাকাডেমিকে নিয়ন্ত্রণ করেই আগে জামায়াত নিজেদের শক্তিশালী করেছে। ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত মসজিদ মিশন অ্যাকাডেমিতে জামায়াত-শিবিরের নেতারাই চাকরি পেয়েছেন। এমপিওভুক্ত হলেও এই প্রতিষ্ঠানটি কখনোই সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল না।

তবে পাঁচ মাস আগে এর পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্যানেল মেয়র শরিফুল ইসলাম বাবু। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি নিয়ম মেনে চলছে।

শরিফুল ইসলাম বাবু বলেন, ১৯৮২ সাল থেকেই মসজিদ মিশন অ্যাকাডেমির জন্ম। তখন থেকেই জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে। এখন পুরোপুরি সরকারের নিয়মে চলছে। এসেই তো আর সব পরিবর্তন করতে পারি না। চাকরির বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে কেউ কোনো নাশকতায় জড়ালে আমরা তার দায়-দায়িত্ব নেব না। অনেকের নামেই নাশকতার মামলা আছে। তাদের কেউ সাজাপ্রাপ্ত হলে বা চার্জশিটভুক্ত আসামি হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।

মসজিদ মিশন অ্যাকাডেমির অধ্যক্ষ নুরুজ্জামান খান বলেন, অ্যাকাডেমিতে জামায়াতের কোনো মিটিং হয় না। তাদের কোনো কার্যক্রম নেই এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে। অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেওয়ার পর সব বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আহসান উল হক পিন্টু বলেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ সব সংগঠনেই মহানগরের স্থানীয় নাগরিকরা নেতৃত্ব পান। কিন্তু জামায়াতের বেলায় দেখা যায় ভিন্নতা। জামায়াত-শিবির অন্য এলাকার নাশকতার আসামিদের এনে রাজশাহীর নেতৃত্বে রাখছে। এটা জামায়াতের একটি পুরোনো কৌশল। সারাদেশেই তারা এভাবে নেতৃত্ব তৈরি করে। এক জেলার মানুষ আরেক জেলায় নেতৃত্ব দেয়। এর মূল কারণ হলো, নিজ এলাকার মানুষকে সবাই চেনে। কিন্তু অন্য এলাকার মানুষকে চেনা যায় না। এর ফলে সেই বহিরাগত মানুষগুলো নিরাপদে নাশকতা ঘটিয়ে সরে যেতে পারে।

রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার আবু কালাম সিদ্দিক বলেন, সম্প্রতি জামায়াত-শিবিরের বেশ কয়েকটি গোপন বৈঠকে পুলিশ অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা আর আগের মতো নাশকতা ঘটাতে পারবে না। পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

 

এসবি/এমই