বছরে নষ্ট কোটি টন খাদ্য অপুষ্টিতে ৩ কোটি মানুষ


সাহেব-বাজার ডেস্ক : ঢাকার মোহাম্মদপুরের সূচনা কমিউনিটি সেন্টারে দীর্ঘদিন বাবুর্চির কাজ করেন দিদার আলম। মাসে অন্তত ১২-১৫টি বিয়ের অনুষ্ঠানে রান্নার ডাক পড়ে তার। প্রতি অনুষ্ঠানে অতিথি থাকে ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ পর্যন্ত। দিদারের মতে, এক হাজার জনের একটি অনুষ্ঠানে কমপক্ষে ২০০ জন মানুষের খাবার নষ্ট হয়। মাথাপিছু এ খাবারের মূল্য ৫০০ টাকা ধরলে নষ্ট হওয়া মোট খাবারের দাম দাঁড়ায় ১ লাখ টাকা। এভাবে মাসে গড়ে ১০টি অনুষ্ঠান ধরে হিসাব করলে শুধু সূচনা কমিউনিটি সেন্টারেই মাসিক খাদ্য নষ্টের আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় ১০ লাখ টাকা।

এই তো গেল কমিউনিটি সেন্টারের সামাজিক অনুষ্ঠানের কথা। ঢাকার অভিজাত হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও ক্লাবগুলোর অবস্থা জানতে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নেওয়া হয়। কিন্তু খাবার নষ্টের তথ্য সংবাদমাধ্যমে দিতে কেউই রাজি হননি। অনেক চেষ্টার পর পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ধানমন্ডির একটি রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপক কথা বলেন। তিনি জানান, রেস্টুরেন্ট কর্র্তৃপক্ষের মাধ্যমে খাবার নষ্ট হয় খুবই সীমিত। যা হয় ভোক্তাপর্যায়ে। বুফে পদ্ধতির কারণে এসব রেস্টুরেন্টে খাবারের তিন ভাগের এক ভাগই নষ্ট করে ফেলে ভোক্তারা। দৈনিক যার আর্থিক মূল্য কমপক্ষে ৪-৫ হাজার টাকা।

বছরে কমিউনিটি সেন্টারে প্রায় ৬ কোটি টাকার খাদ্য নষ্ট: রাজধানীতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মালিকানায় কমিউনিটি সেন্টার রয়েছে ৪৯টি। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৬টি ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৩টি। ঢাকা মহানগর কমিউনিটি সেন্টার মালিক সমিতির হিসাবে রাজধানীতে বেসরকারি কমিউনিটি সেন্টারের সংখ্যা প্রায় ১৫০টি। সামাজিক অনুষ্ঠানে কীভাবে খাদ্য নষ্ট হয় তার একটি উদাহরণ দিয়েছেন ধানমন্ডির সাইয়েদানা কমিউনিটি সেন্টারের সুপারভাইজার গোলাম কবির।

তিনি জানান, স্বাভাবিক সময়ে মাসে অন্তত ১৫-২০টি বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। কমিউনিটি সেন্টারে নিম্ন, মাঝারি ও উচ্চ এ তিন ক্যাটাগরির খাদ্য তৈরি হয়। মাঝারি মানের মাথাপিছু খাবারের ব্যয় থাকে ৫২০-৫৫০ টাকা। গড়ে ১০টি করে অনুষ্ঠান ধরলে ২০০টি কমিউনিটি সেন্টারে মাসে অনুষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়ায় দুই হাজার। প্রতি অনুষ্ঠানে গড়ে ৪০০ করে অতিথি থাকলে এ সংখ্যা হয় আট লাখ। ৪০০ জনের অনুষ্ঠানে ৫০ জন মানুষের খাবার নষ্ট হলে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার। এবার ১০ হাজার মানুষের মাথাপিছু ওই খাবারের মূল্য গড়ে ৫০০ টাকা ধরলে এর দাম দাড়ায় ৫০ লাখ টাকা। বছরে যা হয় ৬ কোটি টাকা।

ঢাকার বর্জ্যর ৬৮ ভাগ খাদ্য: রাজধানীসহ সারা দেশে কী পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হয় তা জানতে গত ৪ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ঢাকা কার্যালয়ে একটি ই-মেইল পাঠানো হয়। এ সংক্রান্ত সংস্থাটির নিজস্ব কোনো গবেষণা না থাকায় বিভিন্ন সূত্র থেকে অনেক তথ্য সরবরাহ করেছে সংস্থাটি। বিশ্ব ব্যাংকের এক হিসাবের উদ্ধৃতি দিয়ে এফএও জানায়, বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে বছরে মোট উৎপাদিত বর্জ্যরের পরিমাণ প্রায় আড়াই কোটি টন। এই বর্জ্যরে মোট ৩৭ ভাগ ঢাকায় উৎপন্ন হয়। প্রতিদিন গড়ে রাজধানীতে আট হাজার মেট্রিক টনের মতো বর্জ্য উৎপাদিত হয়। ইউরোপভিত্তিক গবেষণা সংস্থা রিসার্চগেটের ২০১৭ সালের একটি উপাত্ত দিয়ে এফএও বলছে, ঢাকায় উৎপাদিত এই বর্জ্যরে ৬৮ শতাংশই খাদ্য ও খাদ্যজাতদ্রব্য।

এ বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্টের জন্য দায়ী হিসেবে ভিন্ন দুটি গবেষণায় উঠে এসেছে রেস্টুরেন্ট ও হোটেলের নাম। ঢাকা শহরের রেস্টুরেন্টগুলোর খাদ্য নষ্ট নিয়ে ২০০৫ সালে একটি গবেষণা করেছিল জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা (জাইকা)। তাতে দেখা যায়, প্রতিদিন রেস্টুরেন্টগুলো থেকে ৩৪ টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। যার বেশিরভাগই খাদ্য। ডব্লিউআরএপি নামে একটি ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ২০১৩ সালে আরেকটি গবেষণা করে। তাতে দেখা যায়, ঢাকায় উৎপাদিত বর্জ্যরে ৩৪ শতাংশ রেস্টুরেন্টগুলো থেকে আসে।

ঢাকার রেস্টুরেন্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: বর্তমান অবস্থা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক একটি গবেষণা করেন মুসলিমা জাহান ও ইসরাত লায়লা নামে দুজন গবেষক। এটি গত বছর সেপ্টেম্বরে জার্নাল অব এশিয়া এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটিতে প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা গেছে, নগরীর রেস্টুরেন্টগুলোতে যে খাদ্য নষ্ট হয় তার ৫৬ শতাংশ হয় ভোক্তার খাবার থালা থেকে। ১৪ শতাংশ হয় রান্নার প্রস্তুতির পর্যায়ে, ১৩ শতাংশ খাবার সংরক্ষণজাত অবস্থায়, ৪ শতাংশ হয় খাবার বিতরণের সময়। বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির পরিসংখ্যান বলছে, রাজধানী ঢাকায় ছোট-বড় মিলে রেস্তোরাঁর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। আর সারা দেশে এর সংখ্যা ৫৫-৬০ হাজার। শুধু ঢাকার ১০ হাজার হোটেল-রেস্টুরেন্টে দৈনিক গড়ে ৩ হাজার টাকার খাদ্য নষ্ট হলে এক বছরে এই পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি টাকা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির সভাপতি খন্দকার রুহুল আমিন বলেন, ‘মালিকদের তরফ থেকে রেস্টুরেন্টে খাবার নষ্ট হয় কম। যা নষ্ট হয় ভোক্তাদের টেবিল থেকে।’

ক্ষুধিত ৩ কোটি, বাসাবাড়িতে খাদ্য নষ্ট ১ কোটি টন: ২০১৯ সালের জুলাই মাসে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাংলাদেশে যথেষ্ট খাদ্যের অভাবে পুষ্টিহীনতার শিকার ২ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ। আর গত বছর জানুয়ারিতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানায়, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে অপুষ্টিজনিত মানুষের সংখ্যা তিন কোটি। জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে যথেষ্ট খাদ্যের অভাবে প্রতি ছয়জনের একজন পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। গত এক দশকে অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা অন্তত ১০ লাখ বেড়েছে।

একই বছর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নগর দরিদ্রদের নিয়ে সারা দেশে একটি জরিপ পরিচালনা করে। এতে দেখা যায়, ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরীর ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ খানা (হাউজহোল্ড) ক্ষুধিত থাকে। দেশের অন্যান্য শহরে এ সংখ্যা ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। ঢাকায় দিনে অথবা রাতে না খেয়ে থাকে এমন খানার সংখ্যা ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ।

দেশে না খেয়ে থাকা মানুষের এই যখন অবস্থা তখন জাতিসংঘের আরেক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে খানাপ্রতি বছরে খাদ্য নষ্টের পরিমাণ ৬৫ কেজি। উন্নত বিশ্বের দেশ রাশিয়া (৩৩ কেজি), যুক্তরাষ্ট্র (৫৯ কেজি), অস্ট্রিয়া (৩৯ কেজি) ও নেদারল্যান্ডসের (৫০ কেজি) চেয়েও যা অনেক বেশি। এই হিসাবে বাংলাদেশে (বাসাবাড়ির) বছরে খাদ্য নষ্ট হয় ১০ মিলিয়ন টন বা ১ কোটি টন।

এগ্রো বিজনেস অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন বিশেষজ্ঞ মুজিবুল হক বলেন, ‘আমাদের পচনশীল খাদ্যের শুরুতে ৩৫ ভাগ নষ্ট হয়, অপচনশীল খাদ্যের ২৫ ভাগ এবং দানাদার শস্য নষ্ট হয় ১৫ শতাংশের মতো। আমার অভিজ্ঞতা বলে, বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত পরিবারে টেবিলে ১৫ শতাংশ, মধ্যবিত্তের ৭-৮ শতাংশ এবং নিম্নবিত্ত পরিবারে কমপক্ষে ২ শতাংশ খাদ্য নষ্ট হয়।’

খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রণীত জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতি-২০২০-এ বলা হয়েছে, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। এছাড়াও ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতসহ কিছু নেতিবাচক প্রবণতা ক্ষুধার অবসান, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টি অর্জনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এখনো দেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বেশি সুষম খাবারের ঘাটতিতে আছে।

এফএওকে যে মেইল পাঠিয়েছিলেন এই প্রতিবেদক তার উত্তরে সংস্থাটি বলেছে, বছরে বিশ্বে যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন হয় তার তিন ভাগের এক ভাগ নষ্ট হয়ে যায়। যার পরিমাণ ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন টন। এ খাদ্যের ২৫ শতাংশও যদি বাঁচানো যায় তাহলে বিশ্বের ৮৭০ মিলিয়ন ক্ষুধিত মানুষকে পেটভরে বছরব্যাপী খাওয়ানো সম্ভব। এফএও বলছে, উচ্চ-দরিদ্রের ঢাকায় নষ্ট হওয়া খাদ্যের একটি অংশ বাঁচানো এবং যথাযথ বিতরণের ব্যবস্থা করা গেলে টেকসইভাবে অপুষ্টি ও ক্ষুধা দূর করা সম্ভব।

সব খাদ্য নষ্ট হয় না: বাসাবাড়ি, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও কমিউনিটি সেন্টারে যখন টন টন খাদ্য নষ্ট হচ্ছে তখন বেঁচে যাওয়া খাদ্য বিতরণে ভালো উদ্যোগও আছে বাংলাদেশে। রাজধানীর বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে বেঁচে যাওয়া খাবার সংগ্রহ করে দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। ২০১৮ সাল থেকে ঢাকার বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টার ও ক্লাবে বিয়ের বেঁচে যাওয়া খাবার সংগ্রহ করে সংগঠনটি।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের হেড অব কমিউনিকেশন সালমান খান ইউনুস বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে আমরা ঢাকার এক-একটি বড় ক্লাব থেকে ৬০০-৮০০ মানুষের খাবার সংগ্রহ করে বিতরণ করেছি। বৃহস্পতি থেকে শনি এ তিন দিন আমাদের কাছে অনেক ফোন আসে। ঢাকার রাওয়া ক্লাব, অফিসার্স ক্লাব, গলফ ক্লাবের একটি অনুষ্ঠান থেকে কমপক্ষে ৭০০-৮০০ মানুষের খাবার বেঁচে যায়। কিন্তু এর বাইরেও আরও অসংখ্য ক্লাব ও কমিউনিটি সেন্টার আছে যেগুলোর খাবার আমরা পাই না।’

 

এসবি/এমই