বছরজুড়ে রাজশাহীতে ছিল যত আলোচিত ঘটনা


নিজস্ব প্রতিবেদক : ২০২২ সাল চলে গেছে। শুরু হয়েছে নতুন এক বছর। পুরো বছরটি কেটে গেছে নানা ঘটন অঘটনের মধ্যে দিয়ে। এই বছরটা সাধারণ মানুষকে ভুগিয়েছি দ্রব্যমূল্যে। এর মধ্যে বিবেককে নাড়া দেয়ার মতোও ঘটনা ঘটেছে রাজশাহীতে।

এ বছরের সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনা ছিল দুই কৃষকের মৃত্যু। সেচের পানি না পেয়ে ও হয়রানির শিকার হয়ে গোদাগাড়ী উপজেলার নিমঘটু গ্রামের দুই কৃষক কীটনাশক পান করেন। তারা হলেন অভিনাথ মারান্ডি (৩৬) ও তার চাচাতো ভাই রবি মারান্ডি (২৭)। তাদের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ প্রথমে অভিনাথ মারানডির স্ত্রী রোজিনা হেমব্রমের কাছ থেকে সাদা কাগজে সই নিয়ে একটি ইউডি মামলা করে। পরের দিন রোজিনা হেমব্রম থানায় গিয়ে গভীর নলকূপের অপারেটর সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন। দুই কৃষকের মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয় দেশজুড়ে। সাখাওয়াত হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অনিয়মের প্রমাণ পেয়ে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) তাকে বরখাস্ত করেছে। এ মামলায় পরে পুলিশ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

এবার বেশ আলোচিত হয়েছে সংসদ সদস্য কর্তৃক কলেজ অধ্যক্ষকে পেটানো। গত ৭ জুলাই রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী তার ব্যক্তিগত কার্যালয়ে ডেকে এই ঘটনা ঘটান। পরবর্তিতে রাজাবাড়ি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজা চাপে পরে ঘটনাটি অস্বীকার করেন। পরে সংসদ সদস্য ও অধ্যক্ষ এক সাথে সংবাদ সম্মেলনে করে পুরো ঘটনা অস্বীকার করেন। এর কয়েকদিন পর অধ্যক্ষকে মারধরের একটি কল রেকর্ড বের হয়। সেখানে অধ্যক্ষ নিজেই বলেছেন মারধরের কথা। এ ঘটনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়। তদন্ত কমিটি মারধরের সতত্যাও পায়।

রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতা শুরু থেকেই ব্যাপক আলোচনায় ছিলেন। কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে গঠিত এই কমিটি দায়িত্ব পালন করেছে মাত্র সাত মাস। এর মধ্যে এই দুই নেতার বিরুদ্ধে উঠে বিভিন্ন অভিযোগ। নৈতিক স্খলনের কারণে ১৯ অক্টোবর রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাকিবুল ইসলাম বহিষ্কার এবং সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর আগে চাকরি না পেয়ে সংগঠনটির সাবেক এক নেতা সাকিবুলের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এ ছাড়া তার আপত্তিজনক একটি ফোনালাপ ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ফেনসিডিল সেবনের ভিডিও ফাঁস হয়েছে। তার বিরুদ্ধে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) লাগানো কক্ষে থাকাসহ আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠে। এছাড়াও সাধারণ শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ আছে।

রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ট্রাকচাপায় শিক্ষার্থী মাহমুদ হাবিব হিমেল মারা যান। নতুন ভবন নির্মাণের সামগ্রী নিয়ে ট্রাকটি ক্যাম্পাসে ঢুকেছিল। ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা ঘটনার রাতেই পাঁচটি ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেন। আন্দোলনের মুখে ওই রাতে প্রক্টরকে প্রত্যাহার করা হয়। এ ঘটনায় দুই দিন উত্তাল ছিল ক্যাম্পাস। মাহমুদ ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। এ ঘটনার পর চারুকলা অনুষদসহ অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের কাছে বেশ কিছু দাবিদাওয়া তুলে ধরেন।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন এটিএন নিউজের প্রতিবেদক বুলবুল হাবিব ও ভিডিওগ্রাফার রুবেল ইসলাম। গত ৫ সেপ্টেম্বর সকালে সরকারি কর্মকর্তাদের অফিসে আসা-যাওয়া নিয়ে লাইভ করছিলেন। এসময় হামলার শিকার হন তারা। ওইদিন থানায় মামলা করেন বুলবুল হাবিব। এ ঘটনায় দুজনকে সাময়িক বহিষ্কার করে বিএমডিএ। পরে তাদের ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিছুদিন পর জামিনে বের হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সময় লাঞ্ছিত হয়েছেন সাংবাদিকরা।

রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হলের বারান্দা থেকে পরে মারা যান শিক্ষার্থী কেজিএম শাহরিয়ারের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলা এনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভাঙচুর চালায় রাবি শিক্ষার্থী। সে রাতেই তদন্ত কমিটি করা হয়ে। পরে আলাদা তদন্ত কমিটি করে রাবি ও রামেক হাসপাতাল। পাল্টাপাল্টি বেশি কিছু আন্দোলনও চলে।

বছরের শুরু ও শেষ থেকে উত্তপ্ত ছিল রাজনৈতিক অঙ্গন। বছরের শুরুতে রাজশাহী ওয়াসা পানির দাম তিন গুন বাড়িয়ে দেয়। পানির দাম কমানোর দাবিতে আন্দোলন শুরু করে ওয়ার্কার্স পার্টি। তারা বিভিন্ন মিছিল সমাবেশ করে। বছরের শেষে এসে বিএনপির সমাবেশ ঘিরে রাজনীতির অঙ্গন ছিল উত্তপ্ত। এ সময় আ.লীগের কর্মীরাও মাঠে ছিল।

এ বছর যৌথভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সঙ্গে রাজশাহী ফজলি আমের জিআই স্বত্ব লাভ করেছে। আগে আমটির ভৌগোলিক নির্দেশক নাম ছিল ‘রাজশাহীর ফজলি আম’। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের পক্ষ থেকে ফজলি আমকে সে জেলার ফসল বলে দাবি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ মে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, ডিজাইন অ্যান্ড ট্রেডমার্ক অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রারের দপ্তর শুনানির আয়োজন করে। সেখানে দু জেলাকে এর স্বীকৃতি দেয়।

বছরের শুরু থেকেই ছিল কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত। নেশা, ছিনতাই খুনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। গত ৩ জুলাই রাতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতে খুন হন সনি (১৭)। ওইদিন তার জন্মদিন ছিল। তিনি নগরীর দড়িখরবনা এলাকার বাসিন্দা। যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তারা সবাই ছিল কিশোর। তাদের সাথে যুক্ত ছিল নারীও। এছাড়াও বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার হয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।

এছাড়াও বছরজুড়ে বিভিন্ন খুন-ধর্ষণ আলোচনায় ছিল।

 

এসবি/এমই