প্রেক্ষাগৃহের স্মৃতি ধরে রাখল মণ্ডপ

  • 29
    Shares

নিজস্ব প্রতিবেদক : দুর্গাপূজার মণ্ডপের সাজসজ্জায় প্রতিবছরই ব্যতিক্রমই আয়োজন থাকে রাজশাহীর পূজামণ্ডপগুলোতে। নগরীর এসব মণ্ডপ দেখে অভিভূত হন সবাই। প্রতিবছর তৈরি হয় নিত্যনতুন আদলে তৈরি করা পূজামণ্ডপ। করোনার এই সময়ে ব্যতিক্রম ঘটেনি। রাজশাহীর প্রেক্ষাগৃহ হারিয়ে গেছে আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে। শেষ প্রেক্ষাগৃহটি ২০১৮ সালের ১২ অক্টোবর ভেঙে ফেলা হয়।

সেই প্রেক্ষাগৃহের দাবিতে এবার রাজশাহীতে হলো পূজামণ্ডপ। এই মণ্ডপটি তৈরি করেছে নগরীর সাগরপাড়া শিবমন্দির (শিবালয়)। আয়োজকরা জানিয়েছেন, রাজশাহীতে প্রেক্ষাগৃহের দাবি নিয়ে তৈরি করা হয়েছে মণ্ডপটি। সেখানে শোভা পাচ্ছে রাজশাহীর উৎসব সিনেমা হল। এই সিনেমা হলের আদলে তা তৈরি করা হয়েছে।

সাগরপাড়ায় মণ্ডপটিতে ঢুকতেই দেখা যায়, বিশাল এক তোরণ সেখানে শোভা পাচ্ছে একটি সিংহ। ভিতরে প্রবেশ করতে দেখা মিলে ৮০ ও ৯০ দশকের ব্লকবাস্টার কিছু সিনেমার পোস্টার। ঠিক যেমনটি প্রতিটা সিনেমা হলের সামনে দেখা যেত। আরেকটু সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখা যায় উৎসব সিনেমা হলের আদলে তৈরি করা মণ্ডপটি। মণ্ডপটি তৈরি করা হয়েছে তিনতলা। প্রথম তলায় রয়েছে দুই পাশে টিকিট কাউন্টার ও মাঝে বিশাল দরজা। দোতলায় আছে বিশাল আকৃতির দুই পাশে দুইটা জানালা। আর তৃতীয় তলায়ও আছে জানালা। ঠিক উৎসব সিনেমা হলকে তৈরি করা হয়েছে।

উৎসব সিনেমা হলের আগে নাম ছিলো ‘কল্পনা’। মণ্ডপটির প্রায় ৫ শ গজ দূরেই ছিল কল্পনা সিনেমা হল। এখনও ওই মোড়টিকে কল্পনা সিনেমা হলের মোড় বলে ডাকা হয়। কিন্তু এখন সেখানে গিয়ে বোঝার উপায় নেই এখানে এক সময় সিনেমা হল ছিল। হলের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে গগনচুম্বী ‘স্বচ্ছ টাওয়ার’। এই টাওয়ারের নিচেই চাপা পড়েছে কল্পনা সিনেমা হল। ব্রিটিশ আমলে নগরীর আলুপট্টি এলাকায় কল্পনা সিনেমা হল চালু হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় কল্পনার অংশীদাররা সবাই ভারতে পাড়ি জমান। ১৯৭১ সালের পর রাজশাহী সিন্ডিকেটের ম্যানেজার দীনবন্ধু দেশে ফিরে হলটি হস্তান্তর করেন ঢাকার মোশাররফ চৌধুরীর কাছে। তার মৃত্যুর পর হলের নিয়ন্ত্রণ যায় রাজশাহীর রাজপাড়ার বাসিন্দা আব্দুর রহমানের কাছে। তিনি কল্পনা পরিবর্তন করে নাম দেন ‘উৎসব’।

সাগরপাড়া শিবমন্দিরের সহ-সভাপতি সিতানাথ বণিক বলেন, রাজশাহী আজ অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু বিভাগীয় শহর হিসেবে রাজশাহীতে একটি সিনেমা হলও নেই। যা রাজশাহীবাসীর জন্য খুব কষ্টের। এক সময় আমরা বন্ধুবান্ধব নিয়ে সিনেমা হলে যেতাম। পরবর্তিতে সিনেমার মান খারাপ হওয়ায় আমরাও যাওয়া কমিয়ে দেয়। কিন্তু এখন দেশে ভালো মানের সিনেমা তৈরি হচ্ছে। সাথে তৈরি হচ্ছে ভালো মানের ওয়েব সিরিজ। রাজশাহীতে সিনেমা হল অথবা সিনেপ্লেক্স তৈরি করে সুস্থ ধারার বিনোদন ফিরিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব।

রাজশাহীর এক ব্যবসায়ী স্বপন শীল তার মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন পূজামণ্ডপ দেখতে। তিনি বলেন, রাজশাহী সিনেমা হল ফিরিয়ে নিয়ে আসতে একটি অভিনব প্রতিবাদ। উদ্যোগটিও চমৎকার। আমরা চাই রাজশাহীতে সিনেমা হল ফিরে আসুক। সবার সুস্থ ধারার বিনোদনের প্রয়োজন আছে।

সাগরপাড়া শিবমন্দিরের সাধারণ সম্পাদক দেবাশিষ প্রামানিক দেবু বলেন, রাজশাহীর হলগুলোতে এক সময় সিনেমাগুলো ব্যবসা সফল হতো। আশির দশক থেকে ৯০ দশক পর্যন্ত আমরা ভালো মানের সিনেমা পাই। কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে সিনেমা ইন্ড্রাস্ট্রিতে অসাধু কিছু ব্যক্তিদের কারণে এই শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়ে। দেশে চলচ্চিত্রের জোয়ার ছিল। কিন্তু গতানুগতিক গল্পের মানহীন সিনেমা নির্মাণের ফলে দর্শক সিনেমার প্রতি আগ্রহ হারাতে শুরু করল। দেশে দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মিত না হওয়ায় দর্শক সিনেমা হলে যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, জাতি গড়ার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র একটি শক্তিশালী মাধ্যম। চলচ্চিত্র অবরুদ্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্য দিয়ে পারিবারিক, সামাজিক জীবন দেখানো হতো। বর্তমান প্রজন্মকে পারিবারিক, সামাজিক জীবনে সঠিক পথে পরিচালনা করার জন্য ভাল ছবি নির্মাণ যেমন জরুরি, তেমনি বন্ধ সিনেমা হলগুলো চালুরও দাবি জানান তিনি। এজন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। বাঁচাতে হবে এই শিল্প।

আশির দশক থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ভালোই চলছিল রাজশাহীর সিনেমা হল। মানহীন চলচিত্র এসে ঝিমিয়ে পড়ে হল ব্যবসা। ফলে একে একে বন্ধ হতে থাকে রাজশাহীর সব সিনেমা হল। রাজশাহী জেলায় কাগজে-কলমে হল ছিল ৫৫টি। এখন শিক্ষানগরী খ্যাত রাজশাহী শহরে কোনো সিনেমা হল নেই। তবে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় চারটি সিনেমা হল রয়েছে। এছাড়া নগরীর উপকণ্ঠ কাটাখালীতে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে রাজতিলক নামের একটি হল।

রাজশাহীর সবচেয়ে প্রাচীন সিনেমা হলের নাম ভিক্টোরিয়া ড্রামাটিক ক্লাব ‘রাজা প্রমথ নাথ টাউন হল’। ১৯৭১ সালে অলকা নাম দিয়ে শুরু হয় সিনেমা প্রদর্শন। নব্বইয়ের দশকে এটি স্মৃতি সিনেমা হল নামে পরিচালিত হতো। ২০০৭ সালে সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ করে ভেঙে ফেলা হয় হলটি। বাংলাদেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম সিনেমা হল ছিলো বর্ণালী। ১৩৭৩ আসনের এ হলটি ২০০৯ সালে সিনেমা হলটি কিনে নেয় ডেসটিনি ২০০০ গ্রুপ। ২০১০ সালে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় হলটি। আইনি জটিলতায় বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করতে পারেনি ডেসটিনি গ্রুপ।

নগরীর কল্পনার মোড় দেখে বোঝার উপায় নেই এখানে একসময় সিনেমা হল ছিল। হলের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে বহুতল ভবন। ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া কল্পনা সিনেমা হলের পরবর্তিতে নাম হয় ‘উৎসব’। ২০১০ সালের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে উৎসবে প্রদর্শনী বন্ধ করা হয়। নগরীর পশ্চিম প্রান্তে একসময় চলতো ‘লিলি সিনেমা’ হল। ২০১০ সালে বন্ধ হয়ে যায় লিলি। পরে প্লট আকারে বিক্রি হয় হলের জমি।একে একে সব হল বন্ধ হলেও টিকে ছিল উপহার হলটি। ২০১৮ সালের ১২ অক্টোবর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। সাড়ে ২৪ কাঠা আয়তনের এ জায়গায় এখন গড়ে উঠবে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন।

এসবি/এমই/এআইআর


  • 29
    Shares