প্রতি ১৩ সেকেন্ডে মারা যায় একজন


সাহেব-বাজার ডেস্ক : বিশ্বে প্রতি ১৩ সেকেন্ডে একজন মানুষের মৃত্যু হয় নিউমোনিয়ায়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। এই বয়সী শিশুদের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের (২০ শতাংশ) মৃত্যু হয় এই রোগ। এ ছাড়া বিশ্বে প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে ৮ জনেরই মৃত্যু হয় নিউমোনিয়ায়।

মূলত নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা বা ‘হাইপোক্সিমিয়া’। সারাবিশ্বে প্রতিবছর ৭ কোটি ৩০ লাখ মানুষ মারাত্মক অক্সিজেন ঘাটতিতে ভোগেন। যার মধ্যে তিন কোটি ২০ লাখই শিশু। দরিদ্র জনগোষ্ঠীতে এই রোগে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।

নিউমোনিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের প্রায় ৪২ শতাংশই হাইপোক্সিমিয়ায় ভোগে। যদিও মাত্র ৭ শতাংশ জেলা হাসপাতালে বেসিক অক্সিজেন থেরাপি প্রদানের সক্ষমতা রয়েছে। ফলে দেশে প্রতিবছর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২৫ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়, যা সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য।

এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব নিউমোনিয়ায় দিবস। এবারে প্রতিপাদ্য ‘ক্যাম্পেইনিং দ্য ফাইট টু স্টপ নিউমোনিয়া’ বা ‘নিউমোনিয়া প্রতিরোধে চাই সবার সচেতন অংশগ্রহণ’। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র- আইসিডিডিআর,বি’র মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী বিজ্ঞানী ড. আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন, হাইপোক্সিমিয়ায় আক্রান্ত যে কোনো রোগীর চিকিৎসা হিসেবে অক্সিজেন থেরাপি প্রয়োজন। বিভিন্ন ধরনের শারীরিক পরিস্থিতিতে হাইপোক্সিমিয়া ঘটতে পারে। শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত নবজাতক থেকে শুরু করে নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়া, সেপসিস এবং যক্ষ্মা আক্রান্ত শিশু। এ ছাড়া প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), হৃদরোগ ও হাঁপানিসহ আরও অনেক ক্ষেত্রে এই থেরাপি দিতে হয়।

বাংলাদেশ হেলথ ফ্যাসালিটি সার্ভে ২০১৭-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের চার ভাগের এক ভাগের কম স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অক্সিজেনের তিনটি উৎসের যে কোনো একটি রয়েছে। যার মধ্যে ১৩ শতাংশ স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ছিল। ফ্লো-মিটারসহ অক্সিজেন ভর্তি সিলিন্ডার পাওয়া যায় ২১ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে। মাত্র ৬ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অক্সিজেন সরবরাহ বা বিতরণের ব্যবস্থা এবং পালস অক্সিমিটার আছে।

২০২০ সালের এপ্রিল-মে মাসে আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৬০টি জেলা হাসপাতালের মধ্যে ৭২ শতাংশ হাসপাতালে পালস অক্সিমেট্রি যন্ত্র রয়েছে। মাত্র ৭ শতাংশের ক্ষেত্রে ‘আর্টারিয়াল ব্লাড গ্যাস এনালাইসিস’ (রক্তে অক্সিজেন, কার্বন-ডাই অক্সাইডের পরিমাণ, অক্সিজেনের ঘনত্ব, এসিড-ক্ষারের ব্যালেন্স ইত্যাদি পরিমাপ) পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। মাত্র ১৮ শতাংশ হাসপাতালে অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর যন্ত্র ছিল। বন্ধ স্টোরেজ ট্যাঙ্কে তরল অক্সিজেন ছিল ২ শতাংশ হাসপাতালে এবং ৩ শতাংশ হাসপাতালে একটি অক্সিজেন প্ল্যান্ট ছিল। এ ছাড়া সেন্ট্রাল ও সাব সেন্ট্রাল পাইপিং শুধু ১৭ শতাংশ জেলা হাসপাতালে পাওয়া গেছে। এক-চতুর্থাংশ জেলা হাসপাতালে নন-ইনভেসিভ ভেন্টিলেশনসহ লো-ফ্লো অক্সিজেন থেরাপি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। যেখানে মাত্র ৭ শতাংশ জেলা হাসপাতাল নন-ইনভেসিভ এবং ইনভেসিভ দুই ধরনের ভেন্টিলেশনের সঙ্গেই বেসিক অক্সিজেন থেরাপি দিয়ে থাকে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার ও রেসপারেটরি মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, দেশে নিউমোনিয়ায় মৃত্যুহার আগের চেয়ে কমেছে। তবে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। নিউমোনিয়া হলো প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংক্রামক ঘাতক। তাই সবাইকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করতে হলে অবশ্যই নিউমোনিয়ার টিকা নিতে হবে। হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় শিষ্টাচার মেনে চলতে হবে। ধূমপান পরিহার করতে হবে। পুষ্টিকর খাবার, ফলমূল ও বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। নবজাতক ও শিশুদের পরিচর্যার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। খাবার গ্রহণের আগে ও শৌচকাজের পরে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুতে হবে। অ্যালকোহল বর্জন করতে হবে।

 

এসবি/এমই