প্রতি দশজনে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত


সাহেব-বাজার ডেস্ক : ডায়াবেটিস একটি মারাত্মক এবং প্রাণঘাতী রোগ। সারাবিশ্বেই রোগটি অনেকটা মহামারী আকার ধারণ করেছে- যা ব্যক্তি এবং তাদের পরিবার, সেই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ২০২১ সালে ৫৩ দশমিক ৭ কোটি মানুষ বা প্রতি ১০ জনে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। এই সময়ে ৯৬৬ বিলিয়ন ডলার স্বাস্থ্য ব্যয় হয় ডায়াবেটিসের কারণে, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয়ের ৯ শতাংশ।

বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশে আজ ১৪ নভেম্বর ‘বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস’ পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য- ‘আগামীতে নিজেকে সুরক্ষায় ডায়াবেটিসকে জানুন’। ১৯৯১ সালে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন (আইডিএফ) দিনটিকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০৭ থেকে সারাবিশ্বে দিবসটি পালন শুরু হয়। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অনুরোধে, বাংলাদেশ সরকার ১৪ নভেম্বর দিবসটি পালনের জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাব করে। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘে এ প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

বৈশ্বিক পরিস্থিতি : আইডিএফ ডায়াবেটিস এটলাস-২০২১ এর তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫৪ কোটি। রোগটি ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য। এখনই এ রোগের প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলে ২০৪৫ সাল নাগাদ প্রায় ৭৮ কোটিতে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাদের অধিকাংশই টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৪ জনের মধ্যে ৩ জনেরও বেশি লোক নিম্ন ও মধ্যআয়ের দেশে বাস করে। প্রায় ২ কোটি নারী (প্রতি ৬ জনে একজন) গর্ভাবস্থায় হাইপারগ্লাইসেমিয়ায় (উচ্চরক্তের গ্লুকোজ) আক্রান্ত হয়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত দুই তৃতীয়াংশ মানুষ শহরাঞ্চলে বাস করে এবং তিন চতুর্থাংশ কর্মজীবন কালের। ১২ লাখেরও বেশি শিশু ও কিশোর (০-১৯ বছর) টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ২০২১ সালে বিশ্বে ৬৭ লাখ মানুষের ডায়াবেটিসের কারণে মৃত্যু হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৬৪ দশমিক ৩ কোটিতে এবং ২০৪৫ সালে এই সংখ্যা ৭৮ দমমিক ৩ কোটিতে পৌঁছতে পারে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ২৪ কোটি মানুষ বা প্রতি ২ জনে একজন জানেন না যে, তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

দেশের অবস্থা: আইডিএফ ডায়াবেটিস এটলাস-এর তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নারী। ডায়াবেটিস আছে, এমন অর্ধেকেরও বেশি লোক জানেই না যে, তারা রোগটিতে আক্রান্ত।

গবেষণায় যা এসেছে: বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ১০০ জনের মধ্যে ২৬ জন নারীই গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। যাদের ৬৫ শতাংশই পরবর্তীকালে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারী ও গর্ভস্থ শিশুদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস যদি নিয়ন্ত্রণ না করা সম্ভব না হলে পরবর্তীতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এ অবস্থায় পরিকল্পিত গর্ভধারণ ও গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে: অতিরিক্ত ফাস্টফুড ও চর্বিযুক্ত খাবার খেলে, শারীরিক পরিশ্রম না করলে, নিয়মিত শরীরচর্চা না করলে, স্বাভাবিকের চেয়ে মাত্রাতিরিক্ত ওজন বেড়ে গেলে ডায়াবেটিস হতে পারে। কাজেই যাদের ডায়াবেটিস নেই তারা যদি এই বিষয়গুলো জানতে পারেন, তাহলে তারা সচেতন হয়ে নিজেদের সুরক্ষা করতে পারবেন। অন্যদিকে যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদেরও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে হবে। এটি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হার্ট-অ্যাাটাক, স্ট্রোক, কিডনি ফেইলিউর, অন্ধত্ব এবং নিম্নঅঙ্গ বিচ্ছেদের মতো মারাত্মক এবং প্রাণঘাতী ঝুঁকি থাকে।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. একে আজাদ খান বলেন, ডায়াবেটিস আছে এমন রোগীদের অন্তত ৫০ শতাংশ জানেনই না যে, তারা রোগটিতে আক্রান্ত। আমাদের সবারই উচিত নিয়মিত রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করা। দেশের ১ কোটি ৩০ লাখ ডায়াবেটিক রোগীর মধ্যে প্রায় ৫৯ লাখেরও বেশি, প্রায় ৪৫ শতাংশ রোগীকে ডায়াবেটিস-সেবার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। বারডেম, বিআইএইচএস ও ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক (এনএইচএন)-এর ৩৫টি কেন্দ্র, ৬১টি অধিভুক্ত সমিতি ও ২৯টি সাব এফিলিয়েটেড অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে রাজধানীসহ সারাদেশে ডায়াবেটিস-সেবা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ‘ডিসটেন্স লার্নিং প্রজেক্ট’-এর মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৩৪তম ব্যাচ পর্যন্ত প্রায় ১৯ হাজার ৯৯৫ জন জেনারেল প্র্যাকটিশনারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বিনামূল্যে ইনসুলিন ও ওষুধ বিতরণ বাবদ গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯০ কোটি টাকা।

প্রসঙ্গত, ১৪ নভেম্বর ইনসুলিনের আবিষ্কারক ফ্রেডেরিক ব্যান্টিংয়ের জন্মদিন। ১৯২১ সালে ডা. ফ্রেডেরিক ব্যান্টিং ও তার সহকর্মী চার্লস বেস্ট গবেষণার মাধ্যমে কুকুরের শরীর থেকে ইনসুলিন আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। এই ইনসুলিন ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।

এদিকে দিবসটি উপলক্ষে প্রতিবারের মতো এবারও নানা কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছে ডায়াবেটিক সমিতি। সচেতনতামূলক পোস্টার, লিফলেট বিতরণ ছাড়াও আজ সকাল সাড়ে ৮টায় রোড শোর আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া সকাল ১০টায় বারডেম মিলনায়তনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও রোগীদের আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং বিকাল ৩টায় আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে।

 

এসবি/এমই