পশ্চিমা তেল রাজনীতির কাছে ধরাশায়ী ইরান!

  • 1
    Share

।। মনোয়ারুল হক ।।

মধ্যপ্রাচ্যের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হল শিয়া মুসলিম। তবে ওই অঞ্চলের মোট ১৮ টি দেশের মধ্যে একমাত্র দেশ ইরান যা শিয়া মুসলিম দ্বারা শাসিত। এই দেশটি ৮০ দশকের শেষে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে রাজতন্ত্র থেকে মুক্তি পায়। রাজা রেজা শাহ পাহলভী ক্ষমতাচ্যুত হন ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তেহরান থেকে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন রেজা শাহ। সেই থেকে শুরু আমেরিকার সাথে ইরানের শত্রুতা। তারপর দেশটি ইসলামি দেশ হিসাবে নিজেকে গড়ে তোলে।

তবে এক্ষেত্রে লক্ষণীয়, বাদ বাকি ১৭ টি সুন্নি মুসলিম শাসিত দেশ থেকে ইরান আলাদা। দেশটির ৯৩% শতাংশ মানুষ শিক্ষিত যেখানে বাদবাকি দেশগুলিতে মাত্র ৬২%। দেশটিতে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক। সুন্নি দেশগুলোর অনেকগুলোতেই ছেলে মেয়েদের সহশিক্ষা নিষিদ্ধ অথবা তালেবানদের আন্দোলনের শিকার। এদিক দিয়ে ইরানে তালেবানী বোরখার অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই ইঙ্গ-মার্কিন লবি মধ্যপ্রাচ্যর দেশগুলোর তেলের সন্ধান পায় ও বুঝতে পারে আগামী পৃথিবীর অর্থনীতি তেলনির্ভর হবে। এরপর থেকেই ইঙ্গ-মার্কিন জোট নানাভাবে এই দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে চলছে।

মাঝে মাঝে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব উষ্কে দিয়ে কিংবা অভ্যুত্থান সৃষ্টি করে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে হত্যা করে। লিবিয়া, সিরিয়া, মিসর, ইরাকে গত ৬০/৭০ বছর ধরে যতো রাজনৈতিক অস্থিরতা ঘটেছে তা ইঙ্গ-মার্কিন ষড়যন্ত্র।

ইরানই একমাত্র দেশে ইঙ্গ-মার্কিন ষড়যন্ত্রর বাইরে গত চল্লিশ বছর নিজেকে গড়ে তুলেছে। ন্যাটোসহ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সব দেশ অর্থনৈতিক অবরোধের হুমকির মুখে ২০১৫ সালে পারমানবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তিতে যায় ইরান। ইরানি পারমানবিক কর্মসূচি সরেজমিনে দেখতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দেশের সব জায়গায় পরিদর্শনের অনুমতি দেয় ইরান, যার ভিত্তিতে ইরানের উপর অবরোধ শিথিল করে এই সংস্থাগুলো। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে ইরানের উপর অর্থনৈতিক অবোরোধ সৃষ্টি করে। এর ফলে লাভবান হয় জাপান, ভারতসহ আরও অনেক দেশ। ট্রাম্পের অবরোধের কারণে দেশগুলি ইরানের তেল বাজার থেকে কম মূল্যে তেল সংগ্রহ করছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান ও সিরিয়া ছাড়া সবকয়টি দেশের অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আমেরিকা। ইরাক ও লিবিয়া থেকে ইঙ্গ-মার্কিন তেল কোম্পানি চক্র বিগত ১৫ বছর যাবত একরকম লুট করে যাচ্ছে।

মার্কিনীদের সবচেয়ে বড় ভয় ইরানিরা যদি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তেল রপ্তানি করতে পারে তাহলে তেলের বাজার নিম্নমূখী হবে। মধ্যপ্রাচ্যের সকল সংকটের মূল হল এই তেলের রাজনীতি।

ইরাক দখলের পর ইরাকের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছে আমেরিকা। সাদ্দামের মৃত্যুর পর ইরাকি শিয়ারা রাজনৈতিক ক্ষমতায়। ইরানি জেনারেল সোলায়মানিকে হত্যার পর ইরাকি পার্লামেন্ট সে দেশ থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি অপসারণের কথা বললে ট্রাম্প সরাসরি অস্বীকার করে।

পাকিস্তানি জাতির পিতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ জন্মসূত্রে একজন শিয়া ধর্মালম্বী, কিন্তু দেশটির অধিকাংশ মানুষ সুন্নি হওয়াতে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক গত পঞ্চাশ বছর ধরেই শীতল।

ইরান সবধরণের সহযোগিতা করার পরও ইঙ্গ-মার্কিন চক্র আন্তর্জাতিক বাজারের তেল ক্রয়ে বাধার সৃষ্টি করে ইরানকে ধ্বংসের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। পৃথিবীর প্রথম খনিজ তেল আবিস্কারের দেশ তেল বিক্রিতে বাঁধাগ্রস্ত হয়ে দেশের খাদ্যদ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশ্ব গণমাধ্যম মার্কিন প্রচার মাধ্যমের কাছে পরাজিত। ইরানে তরুণ শিক্ষিত বেকারের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে ।

হজ্জকে কেন্দ্র করে সুন্নি দেশগুলোর উপর সৌদি নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়েছে। সকল সুন্নি দেশ তাই দর্শক হয়ে গেছে। সুন্নি দেশগুলোর উচিত হজ্জ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব একক সৌদিদের উপর না রেখে মুসলিম দেশগুলোর যৌথ ব্যবস্থাপনায় নিয়ে নেওয়া।

ইউক্রেনের বিমান ভূপাতিত করে ইরান সমগ্র বিশ্বের কাছে প্রমাণ করে দিয়েছে সামরিক যেগ্যতায় দেশটি আর পিছিয়ে নেই।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এসবি/জেআর


  • 1
    Share