পরিমিত সার ব্যবহারে কম খরচে ভাল ফলন


নিজস্ব প্রতিবেদক : কোন জমিতে কতটুকু সার ব্যবহার করতে হবে তা অনেক কৃষকই জানেন না। অনেক কৃষকই প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহার করেন। এতে নষ্ট হচ্ছে মাটির স্বাস্থ্য। কমছে ফলন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারি-বেসরকারি ১২টি প্রতিষ্ঠান গবেষণা করে পরিমিত সারের পরিমাণ বের করেছেন। তাদের পরামর্শে পরিমিত সার ব্যবহার করে রাজশাহীর কৃষকরা সুফল পেয়েছেন। চাষাবাদে চাষিদের খরচ কমেছে, কিন্তু বেড়েছে ফলন।

অস্ট্রেলিয়া সরকারের অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল রিসার্চ (এসিআইএআর), অস্ট্রেলিয়ার মারডক বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বিসিএএসপিএ, বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন ও কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন মাটি পরীক্ষা করে পরিমিত সারের পরিমাণ নির্ধারণ করেছে।

এখন পরিমিত সার ব্যবহারে সুফল মিলবে কি না তা পরীক্ষা করতে দেশের সাতটি জেলার ৯টি উপজেলায় পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার এসিআইএআর এবং কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে ‘মাটির পুষ্টি ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এক প্রকল্পের আওতায় এর কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের অধীনে রাজশাহীর পবা ও গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষকেরা গত আমন এবং বোরো মৌসুমে গবেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমিত সার ব্যবহার করেন।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে চাষিদের আমন মৌসুমের আগে একটি করে কার্ড দেওয়া হয়েছিল। জমিতে কোন সার কতটুকু ব্যবহার করতে হবে সেসব তথ্য লেখা ছিল আছে কার্ডে। এই কার্ড দেওয়া হয়েছিল সার ও কীটনাশকের পরিবেশকদেরও। এই কার্ডে লেখা পরিমিত সার ব্যবহারে কী ফল পাওয়া গেল তা জানতে বৃহস্পতিবার সকালে গোদাগাড়ী উপজেলার ছয়ঘাটি ঈদগাহ মাঠে কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।

এতে প্রধান অতিথি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার মারডক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ড. রিচার্ড ডব্লিউ বেল। শতাধিক কৃষক এ সভায় উপস্থিত হয়ে জানান, পরিমিত পরিমাণ সার ব্যবহার করে তাঁরা সুফল পেয়েছেন। গোগ্রাম এলাকার কৃষক হযরত আলী জানালেন, কার্ডে লেখা পরামর্শ অনুযায়ী সার ব্যবহার করে তাঁর বিঘাপ্রতি অন্তত এক হাজার টাকা সাশ্রয় হয়েছে। প্রতি বিঘায় তিনি ২০ মণ করে বোরো ধানের ফলন পেয়েছেন। এত ফলন আগে কখনও পাননি।

কমলাপুর গ্রামের কৃষক নিয়াজ উদ্দিন বলেন, আগে প্রতি বিঘা বোরো ধানে তিনি ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতেন ৬০ কেজি। এ ছাড়া ডিএপি ৫০ কেজি এবং পটাশ ৫ কেজি দিতেন। এবার মাত্র ২৬ কেজি ইউরিয়া ও ২০ কেজি ডিএপি দিয়েছেন। এ ছাড়া পটাশ বাড়িয়ে ২৬ কেজি করেছেন। পরিমিত সার প্রয়োগের কারণে জমিতে রোগ-বালাই ও কীটনাশকের আক্রমণ হয়নি। তাই কীটনাশকও কম লেগেছে। ফলে খরচ কমেছে। বোরো ধানে বিঘাপ্রতি তাঁর প্রায় এক হাজার টাকা সাশ্রয় হয়েছে। নিয়াজ বলেন, জমিতে ফলনও হয়েছে বিঘাপ্রতি ২০ মণ। ঝড়ে ধান গাছ পড়ে না গেলে আরও ভাল ফলন হতো।

এই সভায় উপস্থিত হয়েছিলেন বিজয়নগর গ্রামের নারী তাজকিরা বেগম। তিনি বলেন, ‘সম্রাট ভাই (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ সহকারী) আমার বাড়িতে গিয়ে এই কার্ড দিয়ে আসেন। তখন আমি আমার স্বামীকে এটা দেখিয়ে বলি, এভাবে কম সারেই ভাল ফলন হবে। তখন আমার স্বামী খিটমিট করে আমাকে বলেছিলেন, এত কম সারে ফসল হয় নাকি! মেয়ে মানুষ শুধু বেশি বোঝে। তখন আমি বলেছিলাম, প্রতিবছর তোমার ইচ্ছামত সার দাও, এবার এভাবে দিয়ে দেখো। শেষে আমার স্বামী রাজি হন। এভাবে কম সার দিয়ে আমাদের ফলন বিঘাপ্রতি পাঁচ মণ বেশি হয়েছে। ধান চাষে খরচও কম হয়েছে।’

রাজাবাড়িহাটের সার ও কীটনাশকের পরিবেশক শহিদুল ইসলামও চাষিদের এই কার্ড অনুযায়ী সার কিনে প্রয়োগের পরামর্শ দিতেন। সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘চাষিরা প্রথমে বিশ্বাসই করতেন না যে এত কম সারে ফলন হয়। তাঁরা বলতেন, ফসল না হলে কিন্তু দায় তোমার। আমি তাও সাহস করে এভাবেই সার দিতে বলতাম। পর পর দুই মৌসুমে এভাবে ৪০০ কৃষককে আবাদ করালাম। কেউ অভিযোগ করেননি যে ফলন কম হয়েছে। বরং চাষিরাই এখন এসে বলছেন কম খরচে বেশি ফলন পাওয়া গেছে।’

অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ার মারডক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ড. রিচার্ড ডব্লিউ বেল বলেন, পরিমিত সার ব্যবহার করলে জমির ফসল ভাল থাকে। এতে রোগ-বালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়। তখন কীটনাশকেরও ব্যবহার কম করতে হয়। এর ফলে খরচ কমে। মাটির উর্বরত ঠিক থাকে। তাই তিনি কৃষকদের এভাবে পরিমিত সার ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জগদীশ চন্দ্র বর্মন বলেন, না জেনে চাষিরা ইচ্ছেমত সার প্রয়োগ করেন। এতে মাটি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। ফসলের ফলন কমছে। তাই হিসাবনিকাশ করে সার ব্যবহার করতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিবছর সরকার আমদানি করা সারে কৃষকের জন্য ২৮ থেকে ৩০ কোটি টাকা ভুর্তুকি দিয়ে থাকে। এই টাকায় একটা পদ্মাসেতু হয়ে যায়। অতিরিক্ত সার ব্যবহারে ভুর্তুকিও বাড়ে। তাই সবাইকে সচেতন হবে। তাহলে সবদিক থেকেই উপকার পাওয়া যাবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও ছিলেন, মারডক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ প্রধান অধ্যাপক ড. এনামুল হক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের রাজশাহী বিভাগের প্রধান ড. সাইদুর রহমান, জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সারমিন সুলতানা। এছাড়াও গোদাগাড়ী উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান, প্রকল্পের কারিগরি কর্মকর্তা আরিফ উজ-জামান, কমিউনিটি ডেভলেপমেন্ট অফিসার রেজিয়া বেগম, অ্যাডমিন অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অ্যাসোসিয়েট রুবিনা আক্তার বিনা, কৃষি বিভাগের মাঠ সহকারী সম্রাট আলী, রাশেদ রানা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এসবি/আরআর/এআইআর