পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু


সাহেব-বাজার ডেস্ক : মক্কা ও মদিনার আকাশে হেলিকপ্টারের বিরামহীন চক্র। পথে পথে নিরাপত্তা তল্লাশি। এমন চিত্রই বলে দিচ্ছে কাল পবিত্র হজ। সেলাইবিহীন দুই টুকরো সাদা কাপড় পরে হজের নিয়তে ১৫০টির বেশি দেশ থেকে আসা ১০ লক্ষাধিক ধর্মপ্রাণ মুসল্লির মুখে এখন একটিই ধ্বনি- ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাক’।

যার অর্থ- হে আল্লাহ! আমরা আপনার ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছি! আমরা উপস্থিত হয়েছি। আমরা আপনার একত্ববাদ ও ইবাদতের স্বীকৃতি দিচ্ছি। আপনার পূর্ণ রাজত্বের প্রতি আত্মসমর্পণ করছি। এটি হাজিদের এক মহাগুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন, যার মাধ্যমে তারা বিশ্বজগতের প্রতিপালক করুণাময় আল্লাহর দাসত্ব ও তার পূর্ণ আনুগত্যের ঘোষণা দেন।

পুরুষরা উচ্চস্বরে আর নারীদের নিম্নস্বরে তালাবিয়া পাঠের এই ধ্বনিতে অদ্ভুত এক পবিত্র গুঞ্জরণ ছড়িয়ে পড়েছে তাঁবুর নগরীখ্যাত মিনার আনাচে-কানাচে। দুই বছর বন্ধ থাকার পর এবার বাংলাদেশ থেকে সীমিতপরিসরে আসা প্রায় ৬০ হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লি যোগ দিয়েছেন হজের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে। এতদিন পবিত্র আল্লাহর ঘর কাবায় ইবাদত বন্দেগিতে নিমগ্ন ছিলেন হাজিরা। বাংলাদেশ থেকে আসা সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের সর্বশেষ ফ্লাইটে মঙ্গলবার মক্কায় পৌঁছেছেন অবশিষ্ট হাজিরা। পবিত্র নগরীতে পৌঁছাই তড়িঘড়ি করে ওমরাহ সম্পন্ন করেছেন তারা। কোনো বিরাম ছাড়াই তাৎক্ষণিক প্রস্তুতিতে ছুটে এসেছেন মিনায়।

এখানে পৌঁছে রাজকীয় সৌদি সরকারের নেওয়া পদক্ষেপে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন তারা। নতুন যারা হজে এসেছেন, তাদের নানাভাবে সরানো হচ্ছে ধর্মের প্রকৃত বাণী। বুঝিয়ে বলা হচ্ছে- হজে আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য- আল্লাহর ভালোবাসা, তার ডাকে সাড়া দেওয়া, তার অনুগ্রহ ও সওয়াবের আশা এবং তার শাস্তির ভয়। লোকদেখানো কিংবা গৌরবের জন্য নয়। মানুষ বলবে, ‘অমুক হজ করেছে’ কিংবা হাজি উপাধি দিবে সে জন্যও আসেননি।

সৌদি কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন বুকলেট এবং অ্যাপসের মাধ্যমে হাজিদের কীভাবে সঠিক এবং সহিহ উপায়ে হজপালন করা যাবে, সেসব নির্দেশনা দিচ্ছেন বাংলায় অনুবাদ করে। মক্কা থেকে বাসে করে পায়ে কিংবা হেঁটেই মিনার উদ্দেশ্যে রওনা করেছেন হাজিরা।

নিয়মানুযায়ী পবিত্র নগরী মক্কা থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে মিনায় এ দিন জোহরের আগেই হজে অংশগ্রহণকারীদের সবাইকে মিনায় পৌঁছানোর কথা। সেখানে তারা ৫ ওয়াক্ত (জোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও হজের দিন ফজর) নামাজ আদায় করবেন। সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় যথাযথ নিরাপত্তার মাধ্যমে হজে অংশগ্রহণকারীদের পবিত্র নগরী মক্কা থেকে ইতোমধ্যে মিনায় নেওয়া হয়েছে।

মিনায় গিয়ে অবস্থানকারী হজ পালনকারীরা শুক্রবার ফজরের নামাজের পর আরাফাতের ময়দানে গিয়ে অবস্থান নেবে। সেখানে তারা সকাল থেকে দিনভর ইবাদত-বন্দেগিতে সময় অতিবাহিত করবে। সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করবেন তারা।

এদিকে বয়সের বিধিনিষেধের কারণে এবার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও হজে অংশগ্রহণ করতে পারেনি ধর্মপ্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান। পরিবর্তে দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন।

আমাদের সময়কে জানান, ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ। আমরা হাজিদের নিয়ে নিরাপদে মিনায় পৌঁছেছি। প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে হাজিদের বিষয়ে খোঁজখবর রাখছেন বলেও জানান তিনি।

এ বছর হজে আরাফাত ময়দানে মসজিদে নামিরায় হজের খুতবা দেবেন শায়খ ড. মোহাম্মদ বিন আবদুল কারিম আল-ঈসা।

ইতোমধ্যে হারামাইন শারিফের জেনারেল প্রেসিডেন্সি বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এর আগে সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ এক রাজকীয় ফরমানে এ বছর হজের খুতবার জন্য তাকে নিযুক্ত করেন।

শায়খ ড. মোহাম্মদ বিন আবদুল কারিম আল ঈসাকে। যিনি সৌদি রাজনীতিক এবং দেশটির সাবেক বিচারমন্ত্রী। বর্তমানে তিনি ‘রাবেতাতুল আলামিল ইসলামির’ (দ্য মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ) সেক্রেটারি জেনারেল ও ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক হেলাল অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।

সৌদির স্থানীয় সময় আগামী ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে শায়খ মোহাম্মদ আল ইসা হাজিদের উদ্দেশে খুতবা দেবেন। এই আরাফাতের ময়দানেই মহানবী হজরত মোহাম্মদ (স) বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন।

এ বছরও বাংলাসহ মোট ১৪টি ভাষায় শোনা যাবে হজের খুতবা।

এ বছর হজের খুতবার বাংলা অনুবাদক হিসেবে মনোনীত হয়েছেন দুজন। তারা হলেন- মোহাম্মদ শোয়াইব রশীদ ও তার সহকারী খলিলুর রহমান। মোহাম্মদ শোয়াইবের বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায়। তিনি মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাদিসের ওপর পিএইচডি করছেন। তিনি আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের শিক্ষক। এ ছাড়া তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব। তার স্ত্রীও উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে শোয়াইব তিন মেয়ে ও এক ছেলের বাবা। খলিলুর রহমান মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি ভাষা ও সাহিত্যে পিএইচডি করেছেন।

 

এসবি/এমই