নৌপথে শৃঙ্খলা আসবে না?

  • 1
    Share

নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীতে রোববার একটি কার্গোর ধাক্কায় লঞ্চডুবির ঘটনা যেমন বেদনাদায়ক, তেমনি বিক্ষোভ জাগানিয়া। দুর্ঘটনার পর সোমবার পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া অন্তত ২৯টি প্রাণহীন দেহ আমাদের নতুন করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বেশ কিছু পুরোনো প্রশ্নের সামনে। নৌপথে শৃঙ্খলা কি আসবে না? আমরা জানি, বাংলাদেশের বিস্তৃত নৌপথে প্রাকৃতিক কারণে জলযান দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু নেহাত কম নয়। কিন্তু শীতলক্ষ্যার দুর্ঘটনাটি এমন সময় ঘটল, যখন সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের ফলে নৌ-দুর্ঘটনা ক্রমেই কমে আসছে। আমাদের মনে আছে, সর্বশেষ বড় ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছিল ২০১৯ সালের মার্চ মাসে বুড়িগঙ্গা নদীতে। যাত্রীবাহী লঞ্চের ধাক্কায় খেয়া নৌকার ছয় আরোহীর প্রাণ গিয়েছিল। ওই বছর জানুয়ারি মাসে মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে বালুবাহী নৌযানডুবিতে ২০ শ্রমিকের করুণ মৃত্যু ঘটেছিল। লক্ষণীয়, তিনটি দুর্ঘটনাই ঘটেছে সন্ধ্যা বা রাতের বেলা। এর অর্থ, নানা ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে দিনের আলোয় নৌযান দুর্ঘটনা কমানো গেলেও রাতের নৌপথ এখনও ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে।

আমাদের প্রশ্ন- দুর্ঘটনা হ্রাস পাওয়ায় নজরদারি ও সতর্কতা কি কমে এসেছে? আমরা আশঙ্কা করি- রাত নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে যেমন প্রকৃতিতে আলস্য দেখা দেয়, তেমনি নৌপথের নিয়ম ও বিধিবিধান প্রয়োগেও সম্ভবত শৈথিল্য চলে আসে। আর এর বলি হতে থাকে মূল্যবান প্রাণ। এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। বস্তুত দুর্ঘটনার সতর্কতা হিসেবেই রাতের বেলা মালবাহী নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। তারপরও শীতলক্ষ্যার কার্গোটি রাতের বেলা চলছিল কেন? আমরা জানি, এ ধরনের নৌযানে দুর্ঘটনা এড়াতে নানা ব্যবস্থা থাকে। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অবশ্য মালবাহী জাহাজটির বেপরোয়া যাত্রার চিত্রই স্পষ্ট। দুই নৌযান যখন বিপজ্জনক দূরত্বে এসে পৌঁছেছিল, তখন আক্রান্ত লঞ্চ থেকে কার্গোটির গতিপথ পরিবর্তনের সংকেত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দৃশ্যত তা মানা হয়নি। মানা হলে হয়তো এত প্রাণ হারাতে হতো না। স্বীকার করতে হবে, যাত্রীবাহী নৌযানেরও সতর্কতায় ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। আক্রান্ত লঞ্চটিও এ ক্ষেত্রে দায় এড়াতে পারে না। বিশেষত, এতে ধারণক্ষমতার অনেক বেশি যাত্রী ছিল বলে উদ্ধার হওয়া যাত্রীরা জানাচ্ছেন।

আমরা মনে করি, নৌপথে শৃঙ্খলা আনতে হলে ছোট-বড় সব পক্ষকেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। কিন্তু যত বড় নৌযান, তাদের দায়িত্বশীলতা তত বিস্তৃত হওয়া উচিত। আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকে। বিশেষত বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যার মতো সদাব্যস্ত নদীপথে রাতে বা দিনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া চলবে না। আমরা প্রায়ই দেখছি, বালুবাহী, যাত্রীবাহী, মাছধরা ও খেয়া নৌযানের মধ্যে পারস্পরিক দুর্ঘটনা ঘটছে। সংখ্যায় কম হলেও হতাহতের ঘটনা ঘটছে। মনে রাখতে হবে, এসব ‘ছোট’ দুর্ঘটনায় নির্লিপ্ততাই বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। আমরা নিশ্চয় চাইব, শীতলক্ষ্যার দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাবে। যে নৌযানের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটাকেও আনতে হবে আইনে আওতায়।

গঠিত তদন্ত কমিটি যাতে যথাসময়ে প্রতিবেদন জমা দেয় এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সে ব্যাপারেও আমরা নজর রাখব। কিন্তু এসব করেই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করতে নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা। সড়কপথের মতো নৌপথেও নিশ্চয় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। বড় বড় নদীপথে আমরা বয়া ভাসিয়ে পথ চিহ্নিত করার ব্যবস্থা দেখি। বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যার মতো নদীপথে দুর্ঘটনা রোধে আরও উদ্ভাবনীমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে এ ধরনের নৌপথে ‘নৌ-ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’ চালু করা যায় কিনা, ভেবে দেখতে বলি। দেশের অন্যান্য নদীবন্দর ও নদীপথের জন্যও এই সুপারিশমালা প্রযোজ্য। শীতলক্ষ্যার নৌ-দুর্ঘটনাটিই হোক কান্না ও বেদনার শেষ অধ্যায়। সব পক্ষ আন্তরিক হলে তা অসম্ভব হতে পারে না।

এসবি/জেআর


  • 1
    Share