নৈরাজ্যের দায় বহু পক্ষের

  • 1
    Share

দ্বিতীয় ধাপের ৮৩৫টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা ছিল। আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই লিখেছিলাম, নির্বাচনকেন্দ্রিক চলমান সংঘাত-সহিংসতার দায় নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারে না। যে কোনো মূল্যে এই রক্তপাত বন্ধ করতে তাদের করণীয় সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে। কিন্তু আমরা অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনারদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, ‘সংঘাতের দায় প্রশাসন, পুলিশ বা নির্বাচন কমিশনকে দিলে চলবে না। ঘরে ঘরে, মহল্লায় মহল্লায় পাহারা দিয়ে নির্বাচনী সহিংসতা ঠেকানো সম্ভব নয়।’

আমরা মনে করি, এমন দায়িত্বহীন মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু তাদের দায়িত্ব পালনে এখতিয়ারের ব্যর্থতারই প্রকাশ ঘটাননি, একই সঙ্গে তার শপথও ভঙ্গ করেছেন। আমরা জানি, সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন-সংক্রান্ত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনকালীন সব কর্মকাণ্ড পরিচালনাসহ প্রশাসনিক স্তরগুলোর দায়িত্ব পালনে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক এখতিয়ার বলে নির্দেশ প্রতিপালনে অদক্ষতার যে চিত্র ফের দেখা গেল, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না।

শুক্রবার সংবাদমাধ্যমে দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে সাতজন নিহত, তিন শতাধিক আহতসহ ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, অস্ত্র ও বিস্ম্ফোরক ব্যবহার, ভোট বর্জন ও সহিংসতার যে মর্মন্তুদ চিত্র উঠে এসেছে, তাতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের দায়হীনতায় আমরা ক্ষুব্ধ। অস্বচ্ছ ও অনিয়মের চলমান ইউপি নির্বাচনের দুই ধাপে এ পর্যন্ত ৩৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ইউপি নির্বাচনের আরও ধাপ বাকি রয়েছে।

আমরা মনে করি, স্থানীয় সরকার কাঠামোর সর্বনিম্ন স্তরের চলমান এই নির্বাচনকে নির্বাচন বলা যায় না; এ যেন নৈরাজ্যের উৎকট প্রতিযোগিতা। নির্বাচন কমিশন এ অনিয়মকেই বৈধতা দিয়ে চলেছে। আমরা দেখছি, ইউপি নির্বাচনের প্রথম ধাপ থেকে দ্বিতীয় ধাপ আরও বেশি সহিংস ও সংঘাতময় হয়ে উঠেছে। দলীয় প্রতীকে সরকার কাঠামোর এই স্তরে চেয়ারম্যান পদে চলমান নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও তাদের অনুসারী অনেকেই স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও তাদের অবস্থা কোণঠাসা। দেখা যাচ্ছে, সংঘাত-সহিংসতা চলছে আওয়ামী লীগ মনোনীত ও তাদের বিদ্রোহী প্রার্থীর অনুসারীদের মধ্যে। এই ‘গৃহদাহ’ এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে তাতে সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী দলের নীতিনির্ধারকরাও কেউ কেউ ‘বিব্রত’ বলে জানা গেছে।

ইউপি সদস্য পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও এ নিয়ে উত্তাপ কম নয়, তাও আমরা জানি। দলের গৃহদাহ কীভাবে নির্বাপিত হবে, কীভাবে বন্ধ হবে নিজেদের মধ্যে হানাহানি-রক্তারক্তি এই সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা দলকেই নিতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের কোনো কোনো চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ভোটারদের যেভাবে হুমকি-ধমকি ও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তা সার্বিক আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নেও ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। এ ক্ষেত্রে কমিশনের ওপর দায় চাপিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হাত গুটিয়ে থাকতে পারে না।

আমরা মনে করি, নির্বাচন কমিশন সব পক্ষের জন্য সমতল মাঠ নিশ্চিত করতে না পারার ব্যর্থতার দায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকেও নিতে হবে। রাজনীতির নামে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বৃত্তায়ন, অনেক ক্ষেত্রেই মাঠ প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের কারও কারও দলীয় আনুগত্য যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তাতে কলুষতার ছায়াই বিস্তৃত হয়েছে। অবশ্য মূল নিয়ামক শক্তি নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতার দায় তাদেরই নিতে হবে।

আমরা নির্বাচন নিয়ে আর কোনো হতাহতের মর্মন্তুদ চিত্র দেখতে চাই না। তাদের ঘিরে বিদ্যমান পরিস্থিতি প্রবল নাগরিক অসন্তোষেরই শক্ত ভিত্তি দিচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এও বলেছেন, ‘সংঘাত-সহিংসতা এড়ানোর উপায় হলো নির্বাচন সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিদের সহনশীলতা।’ প্রশ্ন হচ্ছে, চোরে কি ধর্মের কাহিনি শোনে? আমরা মনে করি, ভোটাধিকার খর্বসহ সহিংসতায় ম্লান গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ নির্বাচনের ঔজ্জ্বল্য ফিরিয়ে আনতে নির্বাচন কমিশনের ‘উপায়’ বাতলে দিয়ে পার পাওয়ার অবকাশ নেই।

এসবি/জেআর


  • 1
    Share