ধর্ষণের শিকার কিশোরীকে আসামিপক্ষে বক্তব্য দিতে বাধ্য করার অভিযোগ


নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীতে ধর্ষণের শিকার এক কিশোরীকে আসামিপক্ষ তুলে নিয়ে গিয়ে আদালতে তাদের পক্ষে জবানবন্দী দিতে বাধ্য করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে বুধবার এ অভিযোগ করা হয়েছে। সকালে রাজশাহী মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগারে এই সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে ওই কিশোরীর মা ও ভাই উপস্থিত ছিলেন।

রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা সাধুজন মেরী ভিয়ান্নি মিশনের গির্জায় তিন দিন আটকে রেখে সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছিল। ২০২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে তিন দিন ওই কিশোরীকে আটকে রাখা হয়েছিল। ঘাস কাটতে গিয়ে ওই কিশোরী নিখোঁজের প্রথম দিনই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল।

পরের দিন গির্জার ফাদারের কক্ষে ওই কিশোরীর সন্ধান মেলে। এরপর থানা থেকে জিডি প্রত্যাহারের শর্তে ওই কিশোরীকে ফেরত দিতে চায় কর্তৃপক্ষ। জিডি না তুললে পরিবারটিকে সমাজচ্যুত করারও হুমকি দেওয়া হয়। পরে জিডি প্রত্যাহার করে নিয়েছিল পরিবার। তবে বিষয়টি নিয়ে সে সময় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে পুলিশ ওই কিশোরীকে উদ্ধার করে তাঁর শারীরীক পরীক্ষা করে। এ ব্যাপারে থানায় ধর্ষণের মামলাও হয়।

ওই কিশোরীর ভাই বাদী হয়ে গির্জার ফাদার প্রদীপ গ্রেগরীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। এই মামলা দায়েরের আগেই ফাদার প্রদীপ গ্রেগরী আত্মগোপন করেন। পরে র‌্যাবের অভিযানে তিনি গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে তিনি জামিন পান। ওই কিশোরী এখন নবম শ্রেণির ছাত্রী। তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আসামিপক্ষে জবানবন্দী দিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে মামলার বাদী ওই কিশোরীর ভাই বলেন, বর্তমানে মামলাটি রাজশাহীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুন্যাল-১ এ বিচারাধীন। পুলিশ অভিযুক্ত ফাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রও দিয়েছে। এখন সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। মামলার বাদী গত ২৭ এপ্রিল সাক্ষ্য দিয়েছেন। আর তাঁর ভুক্তভোগী বোন জবানবন্দী দেয় গত ২৩ মে। সেসময় আসামিপক্ষের আইনজীবী তাদের জেরা করেন। এরপর এ মামলার ধার্য্য তারিখ ছিল ২০ জুন। সেদিন মামলার বাদী ও তাঁর এক কাকা আদালতে হাজির হন। সেদিন ভুক্তভোগীর আসার কথা ছিল না। কিন্তু সেদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে আদালতে যায় সে।

ওই কিশোরীর ভাই বলেন, ‘আমাদের অগোচরে আমার বোনকে স্কুলে যাওয়ার পথে আসাসি প্রদীপ গ্রেগরীর লোকজন ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে রাজশাহী আসে। এক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে আন্না মারিয়া, যাচিন্তা হেমব্রম, ফাদার প্যাট্টিক রোজারিও ও আসামি প্রদীপ গ্রেগরি নিজে। তারা আমার বোনকে নানান হুমকি-ধামকি ও কৌশলে তাদের সাজানো বক্তব্য আদালতের নিকট উপস্থাপন করতে বাধ্য করে। এ সময় আমার বোন প্রকারন্তে ভীতসস্ত্রস্ত ছিলো এবং তার চোখে মুখে এক প্রকার চাপা আতঙ্ক দেখা যাচ্ছিলো।’

তিনি বলেন, শেষদিন তাঁর বোন আদালতে বলেছে আগের দিন যে বক্তব্য সে দিয়েছে তা সঠিক ছিল না। মামলার বাদী বলেন, ‘আমার বোন নবম শ্রেণি পড়ুয়া ১৫ বছর বয়সী একজন শিশু মাত্র। ধর্ষণের মতো ভয়ংকর অভিজ্ঞতার শিকার একজন শিশুকে তার অভিভাবকের অগোচরে এভাবে অপহরণমূলক কায়দায় কোর্টের সামনে পেশ করা রীতিমতো অন্যায় এবং আমাদের জন্য উদ্বেগজনক। আমরা মনে করি এই ঘটনার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন যাতে ভবিষ্যতে তারা বিচারকার্যের স্বাভাবিক ধারা ব্যহত করতে না পারে।’

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘ঘটনার পরই ওই ফাদারকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। চার্চ প্রশাসন আসামি প্রদীপ গ্রেগরীকে কোন প্রকার সহায়তা প্রদান না করার আশ^াস দিলেও আদালতে ফাদার প্যাট্টিক রোজারিও উপস্থিতি এখনও অভিযুক্ত প্রদীপ গ্রেগরীর পক্ষে চার্চ সমর্থন ও অপতৎপরতার প্রমাণ দেয়। আমরা চার্চ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির এমন আচারণের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। একইসঙ্গে আমরা প্রশাসন ও আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

ভুক্তভোগীর ভাই জানান, তিনি রাজশাহী ধর্ম প্রদেশীয় যাজকদ্বারা পরিচালিত একটি সেন্ট রিটার্স হাই স্কুলে ইংরেজির সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওই মামলা করার কিছু দিন পর তাকে চাকরি থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারের অর্থনৈতিক করুণ ও দৈন্যদশার মধ্যেও আমি এবং আমার পরিবার ন্যায় বিচার প্রাপ্তির আশায় নানা ধরনের জটিলতা, হুমকি ও ফাদার প্রদীপ গ্রেগরীর লোকজনের সমঝোতার নামে নানামুখী চাপে থাকা সত্ত্বেও মামলাটি লড়ে যাচ্ছি। এত কিছুর পরেও আমরা যখন মামলা থেকে এতটুকুও পিছপা হইনি তখন তারা মামলার স্বাক্ষীদের নানাভাবে ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও মামলায় জড়ানোর হুমকি দেয়। এতেও তারা ক্ষান্ত হয়নি, আমার পরিবারকে সামাজিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা এখনো জারি রেখেছে। শেষে আমার বোনকে জোর করে তুলে এনে ভয়ভীতি দেখিয়ে আদালতে মিথ্যা কথা বলানো হলো।’

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে মামলার আসামি প্রদীপ গ্রেগরীর মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে। আর মুন্ডুমালা সাধুজন মেরী ভিয়ান্নি মিশনের ফাদার প্যাট্টিক রোজারিও বলেছেন, ওই কিশোরী যে আদালতে গিয়ে দ্বিতীয়দফা বক্তব্য দিয়েছে, সেটি তিনি শুনেছেন। তবে তাকে জোর করে নিয়ে যাওয়া কিংবা আসামিপক্ষে বক্তব্য দিতে বাধ্য করার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। এসবের সঙ্গে তিনি জড়িতও নন।

এসবি/আরআর/এআইআর