তারা ছুটছেন মানবসেবায়


মাহী ইলাহি: রাত বাজে আড়াইটা। নগরীর একটি মসজিদের মোয়াজ্জিন নুরুল ইসলামের স্ত্রীর শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। নীরব রাতে কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। তার বাসা থেকেও দ্রুত মেডিকেলে যাওয়ার উপায় নেই। চলছে লকডাউন। তার ওপর গভীর রাত। উপায় না দেখে ফোন দেন শহিদ জামিল বিগ্রেডের হটলাইন নাম্বারে। শ্বাসকষ্টে ভুগছেন তার স্ত্রী। দ্রতই মেডিকেলে নিতে হবে। কালক্ষেপণ না করে ছুটে যায় শহিদ জামিল বিগ্রেডের অ্যাম্বুলেন্স। তার বাসার সামনে পৌঁছে ঠিক রাত দুইটা ৫০ মিনিটে। তার স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসতাপাতালে। ভর্তিও করা হয়।

রাজশাহীর একটি কলেজের শিক্ষক তানিয়া আফরিন প্রীতি। করোনায় আক্রান্ত হয়ে শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন তিনি। তার স্বামী ফোন দেন জামিল বিগ্রেডের হটলাইনে। সেখানেও ছুটে যায় জামিল বিগ্রেডের অ্যাম্বুলেন্স। অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় দেখা যায় কলেজ শিক্ষক তানিয়ার চোখেমুখে ভয়ের ছাপ। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় তিনি বলছিলেন বাঁচতে পারবেন কি না। তাকে দ্রতই শহিদ জামিল বিগ্রেডের অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়া হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

নুরুল ইসলামের স্ত্রী বেঁচে ফিরলেও বাঁচতে পারেননি কলেজ শিক্ষক তানিয়া আফরিন প্রীতি। করোনা কেড়ে নেয় তার প্রাণ। তিনি করোনার সাথে যুদ্ধে পেরে উঠতে পারেননি। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুইদিন পর তিনি মারা যান। বর্তমানে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন নুরুল ইসলামের স্ত্রী।

রাজশাহীর একটি সেচ্ছাসেবী সংস্থার নাম শহিদ জামিল বিগ্রেড। এ বছরের মে থেকে তাদের কার্যক্রম শুরু হলে অল্প দিনেই রাজশাহীতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তারা মানবসেবায় দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। শুধু অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নয়, বিনামূল্যে বাসায় গিয়ে পৌঁছে দিচ্ছে অক্সিজেনও। ফোন দিলেই ছুটছে অক্সিজেন নিয়ে। তারা নিজেরা গিয়ে করোনারোগীর নাকে ন্যাজাল ক্যানোলা লাগিয়ে দিয়ে আসছে। হোক রাত আর দিন, রাজশাহীর মানুষের সেবায় ছুটে চলেছে এক ঝাঁক তরুণ।

কথা হয় শহিদ জামিল বিগ্রেডের প্রধান সমন্বয়কারী দেবাশিষ প্রামানিক দেবুর সাথে। তিনি বলেন, রাজশাহীতে করোনার ভয়াবহতা আমরা চোখে দেখছি। করোনায় আক্রান্ত হলে পরিবারের অনেকেই ভয়ে পাশে থাকছে না। এরকম দৃশ্যও আমরা দেখেছি। এসব দৃশ্য দেখে ঘরে বসে থাকা যায় না। রাজশাহীর মানুষকে নিজের স্বজন মনে করে আমরা সহযোগিতা করছি।
তিনি আরও বলেন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল তার পরিধি অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। আমাদের শহরে এমন অনেক গরিব মানুষ আছেন, যারা করোনায় আক্রান্ত হলে আর্থিক ও বিভিন্ন কারণে অ্যাম্বুলেন্স, অক্সিজেনের মতো জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এসব মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশার সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও নির্দেশনায় আমরা সকলকে বিনামূল্যে সহযোগিতা করছি।

রাজশাহীতে এ পর্যন্ত শহিদ জামিল বিগ্রেড ১৮০ জনকে অক্সিজেন সেবা দিয়েছে। আর অ্যাম্বুলেন্স সেবা দিয়েছে ১২০ জনকে। বর্তমানে তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলছে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স। অক্সিজেন সিলিন্ডারও রয়েছে ৫০টা যা তাদের সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে। এছাড়াও ছুটছেন মানুষকে সচেতন করার জন্য বাড়িতে বাড়িতে। মাস্কও বিতরণ করা হচ্ছে।

শহিদ জামিল বিগ্রেডে রয়েছে একঝাঁক তরুণ। আর এই সেচ্ছাসেবীদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ওয়ার্কার্স পার্টির মহানগর সাধারণ সম্পাদক দেবাশিষ প্রামানিক দেবু। সেচ্ছাসেবী এই সংগঠনটির পৃষ্ঠপোষক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা। এমপি বাদশা করোনার শুরু থেকেই রাজশাহীর মাঠে আছেন। করোনা সচেতনার প্রচার, মাস্ক, স্যানিটাইজার-সাবান, খাদ্যসামগ্রী দিয়েও সহায়তা করছেন। সবশেষ তিনি ‘শহিদ জামিল বিগ্রেড’ প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৮৮ সাল। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস শেষবর্ষের ছাত্র ছিলেন শহিদ জামিল আখতার রতন। আর অল্প কিছুদিন পরই ডাক্তার হয়ে মানবসেবার জন্য বের হতেন তিনি। এর মধ্যে আন্দোলন চলছিলো স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে। আর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আন্দোলন চলছিলো রাষ্ট্রধর্ম বিল বাতিলের দাবিতে। সে আন্দোলনে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল ছাত্র সমাজ এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। সমগ্র দেশে এই বিলের বিরোধিতা করে গড়ে ওঠে তীব্র ছাত্র আন্দোলন। যে ছাত্র আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখে রাজশাহীর প্রগতিশীল ছাত্র সমাজ।

জামিল আখতার রতন তখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি। স্বাভাবিকভাবেই এই আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন অকুতোভয় সৈনিক শহিদ জামিল আখতার রতন। এই আন্দোলন দমনের জন্য মাঠে নামে তৎকালীন স্বৈরশাসকের দোসর সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ইসলামী ছাত্রশিবির। ৩১ মে সকালে ৩৫ জন শিক্ষক ও প্রায় সহস্রাধিক ছাত্রদের সামনে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে শিবিরের সন্ত্রাসীরা। সেখানেই থেমে যান শহিদ জামিল আখতার রতন। শহিদ জামিল আখতার রতনের নামেই মানুষের সেবায় রয়েছে ‘শহিদ জামিল বিগ্রেড’।

 

এসবি/এসকে