টাকায় মিলছে উজি পিস্তল

  • 4
    Shares

সাহেব-বাজার ডেস্ক : অস্ত্রের লাইসেন্স সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন, বিধিবিধান ও প্রজ্ঞাপনের অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে দেশে আমদানি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক সেমি-অটোমেটিক অস্ত্র। বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্সের বিপরীতে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য কেনাবেচাও হচ্ছে এসব শক্তিশালী আগ্নেয়াস্ত্র।

আমদানি হওয়া এমন অত্যাধুনিক উজি পিস্তলের ৫৩টি ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানতে পেরেছে গোয়েন্দারা। এমনকি অনেক মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীরাও ব্যবহার করছে এসব অত্যাধুনিক পিস্তল, যা দেশের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

উজি হচ্ছে ওপেন বোল্ট ও ব্লোব্যাক পরিবারভুক্ত একটি অস্ত্র। এর ছোট আকৃতির সংস্করণগুলো ‘মেশিন পিস্তল’ নামে পরিচিত। এটি পিস্তলের মতো হাতের মুঠোয় স্থাপন করে ব্যবহার করা যায়। ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত মেজর উজিয়েল গাল ১৯৪০ সালের দিকে এর নকশা করেন। তার নামানুসারে অস্ত্রটির নামকরণ হয় ‘উজি’। তুলনামূলকভাবে হালকা এবং প্রতি মিনিটে গুলির হার অনেক বেশি হওয়ায় অস্ত্রটি বেশি জনপ্রিয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্সের বিপরীতে কেনাবেচা হচ্ছে শক্তিশালী উজি পিস্তল। .২২ বোর রাইফেলের লাইসেন্সের বিপরীতে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা এসব পিস্তল বিক্রি করছেন বলে প্রমাণ পেয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। প্রাথমিক তদন্তে ডিবি জানতে পেরেছে, এটি একটি মিলিটারি গ্রেডেড অস্ত্র। যা বাংলাদেশে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেলজিয়াম আর্মড ফোর্সেস ও ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সে এটি ব্যবহৃত হয়। দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহৃত পিস্তলের চেয়ে এটি অত্যাধুনিক। এর ম্যাগাজিনের ধারণক্ষমতা ২০ রাউন্ড। অন্যদিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত পিস্তলের সর্বাধিক ম্যাগাজিন ধারণক্ষমতা ১৫ রাউন্ড।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অস্ত্রের লাইসেন্সসংক্রান্ত বিদ্যমান আইন, বিধিবিধান এবং প্রজ্ঞাপনে অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে লাইসেন্সধারী বৈধ ব্যবসায়ীরা দেশে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক, সেমি-অটোমেটিক অস্ত্র আমদানি করছে। পরে সেসব অস্ত্র বিভিন্ন অপরাধী ও সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে চলে যাচ্ছে এসব অত্যাধুনিক অস্ত্র। প্রকাশ্যে জনসম্মুখে মাদক কারবারিদের মতো অপরাধীরাও এসব অবৈধ অস্ত্র দেখিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। আর এর মাধ্যমে নির্বিঘ্নে মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করে আসছে তারা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ ধরনের অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র জঙ্গিদের হাতে পৌঁছে গেলে তা দেশের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। সার্বিক বিবেচনায় এ ধরনের অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র সাধারণ মানুষের কাছে থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় চরম বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈধ লাইসেন্সের বাইরে জালিয়াতির মাধ্যমে অত্যাধুনিক এসব অস্ত্র যদি সাধারণ মানুষের হাতে চলে যায়, আর সেগুলো যদি ট্র্যাকিং করে নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে জননিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এ পর্যন্ত ১০৯টি উজি পিস্তল দেশে আমদানি হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছি। অত্যাধুনিক এই পিস্তলের ৫৩টি ইতিমধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রিও হয়ে গেছে। বাংলাদেশে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এই পিস্তল। এরই মধ্যে মিনাল শরীফ নামে এক মাদক কারবারির কাছ থেকে একটি উদ্ধারও করা হয়েছে। টতও চওঝঞঙখ ঈঅখ.২২খ.জ.ঐঠ (ইউজেডআই পিস্তল সিএএল.২২এল.আর.এইচভি) মডেলের এই পিস্তলটি সে ২০১৬ সাল থেকে ব্যবহার করছে। এসব পিস্তল কারা কিনে ব্যবহার করছে তা জানা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এগুলো খুবই অত্যাধুনিক পিস্তল এবং সাধারণ মানুষে কাছে এর লাইসেন্স দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এরপরও এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ী এই পিস্তল বিক্রি করছে।’

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ বলেন, ‘কী অস্ত্র কেনা যাবে সেটি লাইসেন্সে ঠিক করা থাকে। লাইসেন্সের বাইরে কোনো অস্ত্র কিনে কেউ এটাকে বৈধ করতে পারে না, সেটি অবৈধ। যেকোনো অস্ত্র অত্যাধুনিক হলে, আর সেটি সাধারণ মানুষের হাতে চলে গেলে তা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি। ব্যক্তি নিরাপত্তার কারণে যেসব অস্ত্র বৈধভাবে দেওয়া হয় তার মধ্যেই থাকতে হবে। কোনোরকম প্রতারণা করে বা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অস্ত্র আনলে, আর সেগুলো যদি ট্র্যাকিং করে নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে জননিরাপত্তার জন্য তা হুমকি সৃষ্টি করে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২০ আগস্ট ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগের একটি দল রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানা এলাকা থেকে একটি প্রাইভেটকারসহ মো. মিনাল শরীফ (৫৬) নামে এক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে। তার গাড়ি তল্লাশি করে বিদেশি মদ, বিয়ার ও একটি .২২ বোর রাইফেলের লাইসেন্স পায় ডিবি। পরে মিনাল শরীফের দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তার ধানম-ির ভাড়া বাসায় তল্লাশি চালিয়ে ৪৪ রাউন্ড কার্তুজসহ একটি (ইউজেডআই) পিস্তল পাওয়া যায়। অস্ত্রের ধরন ও লাইসেন্সের গরমিল দেখে তা জব্দ করা হয়। পরে ধানম-ি মডেল থানায় এ বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। এরপর আদালতের অনুমতি নিয়ে তদন্তের জন্য জব্দ করা পিস্তলের বিষয়ে বিক্রেতা এমএইচ আর্মস কোম্পানির মালিক মোকাররম হোসেন খান রিপনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চায় ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

লিখিত বক্তব্যে মোকাররম হোসেন খান রিপন বলেন, তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে অস্ত্র আমদানি করেন। আর ঢাকা কাস্টমস হাউজে নিয়মিত শুল্ক পরিশোধ করে খালাসের পর রাইফেল হিসেবে বিক্রির জন্য গুদামজাত করেন। বৈধ লাইসেন্সের বিপরীতে ইউজেডআই পিস্তল বেচাকেনার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবির তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, ‘এক মাদক কারবারির কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া একটি .২২ বোর রাইফেলের লাইসেন্সের সূত্র ধরে ইউজেডআই পিস্তলটি উদ্ধার করা হয়েছে। এ বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে একটি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার ঘোষিত অস্ত্রের লাইসেন্স প্রদানসংক্রান্ত পরিপত্র অনুযায়ী উজি পিস্তল বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। .২২ বোর রাইফেলের লাইসেন্স সরকার দেয়। কিন্তু এটি রাইফেল না, পিস্তল। রাইফেলের লাইসেন্স নিয়ে এই পিস্তল ব্যবহার করছে অনেকে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উজি পিস্তলের বিষয়ে ডিবি কর্মকর্তাদের সন্দেহ হলে বিশেষজ্ঞ মতামতের প্রয়োজন মনে করেন তারা। জব্দ করা উজি পিস্তল ও লাইসেন্সটি ঢাকা সেনানিবাসের পরিচালক, সদরদপ্তর, লজিস্টিকস এরিয়া (ইএমই) শাখা বরাবর পাঠানো হয়। সেখান থেকে সম্প্রতি পাঠানো মতামতে বলা হয়, অস্ত্রের লাইসেন্সে .২২ বোর রাইফেলের কথা উল্লেখ থাকলে তা দিয়ে উজি পিস্তল (সেমি অটোমেটিক) কেনা যাবে না। উজি পিস্তল এবং উজি রাইফেল দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র। অস্ত্র দুটির মধ্যে স্পেয়ার পার্টস, ওজন ও দৈর্ঘ্য ছাড়াও বিভিন্ন পার্থক্য রয়েছে।

ওই মতামতে আরও বলা হয়, উজি পিস্তল একটি মিলিটারি গ্রেডেড অস্ত্র। জানা গেছে, বেলজিয়াম আর্মড ফোর্সেস ও ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সে এই অস্ত্রটি ব্যবহৃত হয়। দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্রের (পিস্তল) চেয়ে এটি অত্যাধুনিক অস্ত্র (পিস্তল)। কারণ এর ম্যাগাজিনের ধারণক্ষমতা ২০ রাউন্ড। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত পিস্তলের সর্বাধিক ম্যাগাজিন ধারণক্ষমতা ১৫ রাউন্ড। এজন্য এটাকে মিলিটারি গ্রেডেড অত্যাধুনিক অস্ত্র বলা যেতে পারে। মতামতে আরও বলা হয়, এটি ক্ষুদ্রাস্ত্র শ্রেণির আগ্নেয়াস্ত্র। আপাতদৃষ্টিতে এটি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা ভিআইপিদের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। তাছাড়া অস্ত্রের লাইসেন্সে ক্যালিবার ব্যতীত অস্ত্রের ধরন সুর্নির্দিষ্ট থাকা প্রয়োজন। অস্ত্রের লাইসেন্সে পিস্তল অথবা রাইফেল সুর্নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও ম্যাগাজিনের ধারণক্ষমতা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

এসবি/এমই


  • 4
    Shares