ছাত্র রাজনীতির সোনালি অতীত

  • 1
    Share

গাজী মিজানুর রহমান: এ দেশে এমন একটা সময় ছিল, যখন মা-বাবা জানতেন, তাদের ছেলেমেয়ের রাজনীতিতে নাম লেখানো মানে নিজের খেয়ে পরের ঘরে বাতি জ্বালানো। রাজনীতি মানে, গরিব-দুঃখীর সঙ্গে এক ফ্লোরে বসে খাওয়া। কার ছেলে মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করে আর কলেজে পড়ার টাকা পাচ্ছে না; কার মেয়ের বিয়ের টাকা জোগাড় হচ্ছে না; কার ঘর ঝড়ে পড়ে গেছে- এসব দেখে দশজন মানুষ জোগাড় করে তাদের সাহায্য করা। তখনকার দিনে ছাত্র-রাজনীতিকরা এমন একজনকে আদর্শ মেনে নিয়ে রাজপথে নামত, যিনি সাধারণ পোশাক পরে মঞ্চে উঠলে গগনবিদারী চিৎকার উঠত- আমার ভাই, তোমার ভাই …! আর এই খুদে রাজনীতিকরা ভবিষ্যতে এ রকম ‘আমার ভাই, তোমার ভাই’ স্লোগান শোনা এবং ভবিষ্যতে বৃহৎ এক সামাজিক দায়িত্ব পালনের কর্তৃত্ব অর্জনের নেশায় রাজনীতির খাতায় নাম লেখাত। ভালো চাকরির হাতছানি বিসর্জন দিয়ে সে সময়ের অনেক ছাত্রনেতা রাজনীতি করতেন।

তখনকার দিনে মেধাবী ছাত্ররা আসতেন রাজনীতিতে। বিভাগের সেরা ছাত্রদের রাজনীতির আসরে দেখে সেই সমাবেশ সম্পর্কে একটা উচ্চ ধারণা তৈরি হতো সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। ছাত্রনেতারা যেমন মিছিল করতেন, বক্তৃতা দিতেন; তেমনি বইয়ের ভেতরেী ডুবে থাকতেন। বক্তৃতার জন্য তথ্য-উপাত্ত জোগাড় এবং ক্ষুদ্র পরিসরে অনুসারীদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রচুর পড়াশোনার দরকার হতো তাদের। ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন সবই জানতে হতো তাদের। এভাবে জ্ঞান, সাহসিকতা এবং পরিচিতির ক্ষেত্র বাড়িয়ে নিজেদের তারা যোগ্য করে তুলতেন। ফলে চাকরির পরীক্ষায়ও ছাত্র রাজনীতিকরা ভালো করতে পারতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সংসদ বা কেন্দ্রীয় সংসদের বিভিন্ন পদাধিকারী ছাত্রনেতারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে ভালো ভালো চাকরি পেয়ে যেতেন। তখন তাদের কেউ কেউ স্নাতক ডিগ্রিটা পকেটে করে রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়ে কর্মজগতে প্রবেশ করতেন।

বাংলাদেশের দুই দশক অতিক্রম করার পর সবকিছু পাল্টে যেতে থাকল। আগে যারা সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে বিভিন্ন ক্যাডারের প্রশাসক হতেন, তারা চাকরিতে গেলে আর আগের পরিচয় দিয়ে কোনো সুযোগ নিতে পারতেন না। আগের জীবন আর নতুন জীবন আলাদা- এই মন্ত্র পড়েই চাকরিতে ঢুকতে হতো। সময়ের পরিক্রমায় দেখা গেল, অনেকের ছাত্রজীবনে একবার নেতা নয়, কর্মী হিসেবে নাম রেজিস্ট্রি করা থাকলেই তার ফল আজীবন চলতে থাকল। চাকরিতে এসে তাই আর নতুন করে নিজের পেশাগত ভাবমূর্তি গঠনের পেছনে শ্রম দেওয়ার দরকার পড়ল না। অন্যদিকে, দশকের পর দশক ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনিয়মিত হয়ে পড়ায় ছাত্র রাজনীতিকদের নিজেদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি গঠনে কোনো আত্মত্যাগ-চর্চার প্রয়োজন পড়ল না। দলের একটা ছাপ নিয়ে কর্মজীবনে একবার ঢুকে পড়লে ভবিষ্যতে সবখানেই একটা লাল, সাদা, নীল, গোলাপি ব্যানার পাওয়া যাবে- এই ভেবে সবাই এক প্রকার ভারমুক্ত থাকতে লাগল।

আগেকার দিনে ছাত্র রাজনীতির একটা আলাদা ক্যারিয়ার পথ ছিল। যারা ছাত্র রাজনীতিতে ভালো করে কোনো নিয়মতান্ত্রিক সরকারি চাকরিতে না গিয়ে রাজনীতিবান্ধব পেশায় থাকতেন এবং রাজনীতিকেই ধরে রাখতেন, তাদের জন্য ওপরে ওঠার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। ছাত্রনেতারাই কালক্রমে জাতীয় নেতায় পরিণত হতেন। সে তুলনায় রাজনীতির বাইরে থেকে আসা নবাগতদের রাজনীতিতে ভালো করতে পারা কঠিন ছিল। সেই ধারা গেছে পাল্টে। সাম্প্রতিককালে নানা পেশার লোক মাঝপথে রাজনীতিতে নতুনভাবে যোগ দিয়ে নানা পদে মনোনয়ন পেয়ে ছাত্রনেতাদের টপকে যাচ্ছেন। এভাবে দুই দিক দিয়েই জাতির জন্য ক্ষতি হলো। একদিকে আমলাতন্ত্রের নিরপেক্ষ অবস্থানে চিড় ধরতে লাগল, অন্যদিকে রাজনীতির ধারাবাহিকতার জায়গায় ছাত্র রাজনীতি নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে অপারগ হয়ে হতাশ হতে থাকল। এই হতাশা কাটবে কবে বা আদৌ কি কাটবে? এ দেশে একবার যা হারায়, তা আর ফিরে আসে না- অভিজ্ঞতা সে কথাই বলে।

এসবি/জেআর


  • 1
    Share