ঘুমভাঙা রাতের গল্প

  • 17
    Shares

সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি

বিছানার উপর জুড়িসুড়ি হয়ে ঘুমিয়ে আছে উমা। এমন ঘুমন্ত অবস্থায় উমাকে একটা নিষ্পাপ পবিত্র শিশুর মত মনে হচ্ছে।

ঘরের মধ্যে রাখা গাছগুলো কিছু মারা গেছে কিছু গাছের নতুন পাতা গজিয়েছে। ডেক্সের উপর বইগুলো খোলা অবস্থায় এলোমেলো হয়ে রয়েছে, অ্যাকুরিয়ামটা শূন্য পরে আছে। ঘরের সবুজ জিরোলাইটের আলোই সব কিছুই সবুজ স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছে। বিছানার উপর ফোনটা বেজেই চলেছে একের পর এক। ফোনের শব্দে উমার ঘুম ভেঙে যায়। তবে সে রিসিভ করছে না।

বেশ খানিক বাদে উমা উঠে ফোনটা হাতে নেয়, ১৯ টা মিসকল আননোন একটা নম্বর থেকে। ১৯ একটা প্রাইম নম্বর। যে ফোন দিয়েছে সে হয়তো উমার মতই প্রাইম নম্বর ভালবাসে।

উমা ফোন রেখে আবার শুয়ে পরে। রাতে আর ঘুম হয় না। কারও সাথে কথা বলতেও ইচ্ছা করে না। তবে আজ তার ঘরে একটা স্নিগ্ধ আবহাওয়া এসেছে, এমন পরিবেশে একটা সিগারেট খেলে মন্দ হয় না। ড্রয়ার থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরিয়েছে। সিগারেটের প্যাকেটটা রাখতে গিয়ে দেখে প্যাকেটের গায়ে লেখা ‘ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর,এতে ক্যান্সার হতে পারে’।

কি আশ্চর্য্য প্যাকেটে এত বড় বড় করে লেখা তবুও সিগারেট কোম্পানি সিগারেট বানায় কেনো! আর মানুষই বা কেনো টাকা দিয়ে কিনে নেশা করে খাই। তবে এই মূহুর্তে উমার মনে হচ্ছে এটা সম্পূর্ন একটা ভুল কথা। কারণ উমার বড় ফুফু কখনো সিগারেট ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখেনি তবুও তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আর উমার ছোট মামা দিনে দু প্যাকেট সিগারেট চোখ বন্ধ রেখে শেষ করে দেন। তবে ছোট মামা এখনো দিব্বি সুস্থ সবল একজন মানুষ হয়ে ঘুরে বেরাচ্ছেন।

এ সব ভাবতে ভাবতে উমার সিগারেট শেষ হলে আর একটা সিগারেট ধরায়। বাতাসে তার ডেক্সের উপর খোলা বই এর পাতা একের পর এক উড়ে যাচ্ছে সেটা দেখতে উমার বেশ ভালোই লাগছে।

উমার এখন একটা গান শুনতে ইচ্ছা করছে তবে ইংরেজি গান নয়, বাংলা গান।

অনেক দিন বাংলা গান শোনা হয়নি। বাংলা গান শুনলে উমার মন খারাপ হয়ে যায়, মনে হয় তার ভীষণ কষ্ট। তাই সে বাংলা গান শোনে না। আজ হঠাৎ বাংলা গান শুনতে ইচ্ছা করছে। ল্যাপটপ অন করে একটা বাংলা গান দেন ‘আমি তোমারি তোমারি তোমারি নাম গায়,আমার নাম গাও তুমি’।

কিছুক্ষণ গান শোনার পর উমার মনে হলো সে কারও নাম গাইছে না তার মানে তার নামও অন্য কেউ গাইবে না।

কিছুক্ষণের মাঝেই উমার মন খারাপ হয়ে যায়। এই জন্যই বাংলা গান সে শোনে না।তাই গান বন্ধ করে আবার একটা সিগারেট ধরালো।

মন ভালো করার জন্য ওয়াইন খাওয়া যেতে পারে এখন। রুম থেকে বেরিয়ে ফ্রিজ থেকে ওয়াইন এর বোতল বের করে ছাদে চলে যায়।

ছাদে বসে আকাশ দেখে আর ওয়াইন খাই। ভাগ্যিস সে এখন বাংলাদেশে নেই, সেখানে থাকলে এখন ছাদে এসে ওয়াইন খেতে পারতো না। আকাশে আজ অনেক তারা, চাঁদও উঠেছে। সময়টা এত সুন্দর, এমন সময় পাশে প্রিয় মানুষ থাকলে মন্দ হত না।

তবে উমার কোনো প্রিয় মানুষ নেই। কারণ উমা মানুষ জাতিটাকে সহ্য করতে পারে না।

তবে সে একবার চাঁদ দেখেছিলো। তার বন্ধু স্বননের সাথে। সেদিন ছিলো বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। সেদিন অবশ্য স্বনন উমার হাত ধরে বলেছিলো দেখ চাঁদ উঠেছে কি সুন্দর। আজ আমরা দুজনে চাঁদ দেখবো এর থেকে ভালো সময় হয় নাকি!

সেদিন উমাও স্বননের সাথে চাঁদ দেখেছিলো। আকাশে সেদিন নতুন চাঁদ ছিলো।

উমার এখন স্বননের কথা ভাবতে ভালো লাগছে না। তার মস্তিষ্ক অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে চাই। তাই সে আকাশের তারা গোনা শুরু করেছে। উমা জানে তারা গুনে শেষ করতে পারবে না তবে সে গুনবে। উমা ভাবে তাঁরার সংখ্যা কি প্রাইম নম্বর হতে পারে!

উমার উড়তে ইচ্ছা করে, আকাশের দিক থেকে চোখ নামিয়ে ছাদের উপর থেকে নিচের দিকে তাকাই। রাস্তার গাড়িগুলো পিপঁড়ার মত দেখাচ্ছে। এখন যদি উমা এখান থেকে লাফ দেই সে কি উড়তে পারবে?

মনে হয় পারবে!

৩২ তলা থেকে লাফ দেওয়ার পর উমা বেঁচে থাকবে না, মরে যাবে। তবে সব কিছুতো পিপঁড়ার মত ছোট দেখাচ্ছে তাহলে নিশ্চয় উমার কিছু হবে না। বরং পিপঁড়ার মত গাড়িগুলো উমার ভরে ভেঙে যাবে।

উমার খুব হাসি পাচ্ছে। না থাক গাড়িগুলো ভাঙা ঠিক হবে না। উমা আকাশের দিকে তাকাঁয়। সেখানে চাঁদের বদলে একটা মুখের ছবি ভেসে উঠে। উমার প্রচণ্ড রাগ হয়। রাগের বসে তার হাতে থাকা ওয়াইন এর বোতলটা ফেলে দিয়ে চিৎকার করে উঠে।

বোতলের কাঁচে অনেকটা পা কেটে যায় উমার। তবু তার কোনো মাথাব্যথা নেই। রক্তাক্ত পা নিয়ে নিজের ঘরের এক কোনে গিয়ে বসে একটা সিগারেট ধরায়। এখন সিগারেটের মত সবকিছু পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে ইচ্ছা করছে উমার।

হঠাৎ ফোনের স্ক্রিনে আলো জ্বলে উঠল।

না কেউ ফোন করেনি।একটা ম্যাসেজ এসেছে, বাংলাদেশী নম্বার থেকে……..

‘Mam, work done. Tonima is no more. She is dead.’

মেসেজটা দেখার পর উমার মুখের কোনে পৈশাচিক এক হাসি ফুটে উঠে। সে হাসি রহস্যে ভরা, যেনো এক ভয়ঙ্কর রূপ।

 

এসবি/এমই


  • 17
    Shares