গলার কাঁটা লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ


সাহেব-বাজার ডেস্ক : নানা উদ্যোগ ও ছাড় দিয়েও খেলাপি ঋণের লাগাম টানা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ফের এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তবে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ এর দ্বিগুণেরও বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ আবার মন্দমানের খেলাপি ঋণ। আর মন্দমানের খেলাপি ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয় ব্যাংকগুলোকে। তাই এই লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবে, বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদালতের স্থগিতাদেশ, পুনঃতফসিল ও ‘রাইট অফ’ (ঋণ অবলোপন) ঋণও রয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা সফরকালে খেলাপি ঋণ নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বারবার ঋণখেলাপিদের সুবিধা ও ছাড় দেওয়াটা ইতিবাচক কিছু বয়ে আনছে না। বরং সরকারের এই নমনীয় নীতিতে তারা পার পেয়ে যাচ্ছেন। আবার যে ঋণগুলো পুনঃতফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত করা হচ্ছে, কিছুদিন পরে সেটা আবারও খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। আর এই খেলাপি ঋণই অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এখানে মূল দুর্বলতা হলো- খেলাপি ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়, সেগুলো পরিপালন হয় না। ঋণখেলাপিরা যেসব সুযোগ চায়, সেটাই আবার দেওয়া হয়। খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে না গিয়ে এভাবে বারবার সুবিধা ও ছাড় দেওয়া মোটেও ঠিক হচ্ছে না। এর ফলে তাদের মধ্যে এ ধারণা জন্মেছে যে, চাইলেই সুবিধা পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোরও খেলাপি ঋণ আদায়ে যথেষ্ট তৎপরতার অভাব রয়েছে। আবার তদন্ত করে কোনো কিছু পাওয়া গেলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, এটাও অত্যন্ত দুঃখজনক। বাংলাদেশ ব্যাংক শক্ত না হলে, সুশাসন প্রতিষ্ঠান করা না গেলে এবং সর্বোপরি সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি থাকলে খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বাড়তেই থাকবে।’

২০১৯ সালে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছিলেন, খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না; ধীরে ধীরে কমবে। এর পরেই খেলাপি ঋণ নগদ আদায়ে জোর দেওয়ার পরিবর্তে বিভিন্ন ছাড়ের পথ উন্মুক্ত করা হয়। অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে ওই বছরের ১৬ মে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিটসংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা জারি হয়। এর আওতায় যেসব ঋণ ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর মন্দমানে শ্রেণিকৃত রয়েছে, সেসব খেলাপির অনুকূলে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট আদায় সাপেক্ষে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদে পুনঃতফসিল এবং ৩৬০ দিন মেয়াদে এককালীন ‘এক্সিট’ সুবিধা দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই সুবিধা বহাল ছিল। এই সুবিধা নিয়ে তখন বিপুল অঙ্কের খেলাপিঋণ পুনঃতফসিল হয়। তার পরও ওই বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার আগে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। পরের বছরের মার্চেই প্রথমবারের মতো তা ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়? ওই তিন মাসে খেলাপি ঋণ ১৬ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকায়। পরের তিন মাসে ১ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা বেড়ে জুনে তা দাঁড়ায় ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটিতে। এর পরের তিন মাসে আরও ৩ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা বেড়ে সর্বোচ্চ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকায় ওঠে। তবে ওই বছরে শেষ তিন মাসে বিপুল অঙ্কের ঋণ পুনঃতফসিলে খেলাপি ঋণ কমে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকায় নেমে আসে। তার পরও ওই বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছিল ৪২০ কোটি টাকা।

২০২০ সালে মার্চে করোনার কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে ব্যবসায়ীদের স্বল্পসুদে প্রণোদনার ঋণ দিয়ে সহযোগিতার পাশাপাশি বছরজুড়েই ঋণ পরিশোধে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। ফলে ওই সময়ে বকেয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করেও কেউ খেলাপি হননি। ২০২১ সালে এই বিশেষ সুবিধা বহাল রাখা না হলেও ঋণ পরিশোধে ছাড় অব্যাহত রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিদ্যমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বকেয়া কিস্তির ২৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করা হলে ওই ঋণ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি করা যাবে না। আর ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি মধ্যে বকেয়া কিস্তির ২৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করা হলে ওই ঋণ ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত খেলাপি হবে না মর্মে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তার পরও খেলাপি ঋণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণস্থিতি ছিল ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয় ১ লাখ এক হাজার ১৫০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ চলতি বছরের ৯ মাসের হিসাবে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১২ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। এই খেলাপি ঋণের বড় অংশই রয়েছে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে। তবে ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ অনেকটা কমবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ঋণখেলাপিদের একের পর এক সুবিধ দেওয়া হচ্ছে। আবার কাগজে-কলমে খেলপি ঋণের পরিমাণ ও ঋণখেলাপির যে সংখ্যাটা বলা হয়, তাও সঠিক নয়। কারণ এর বাইরে ঋণ অবলোপন (রাইট অফ) ও আদালতে মামলায় স্থগিতাদেশ আটকে থাকা (নিয়মিত) বিপুল পরিমাণ ঋণও রয়েছে।’ তার মতে, ‘খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে দরকার দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যাতে খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এ ছাড়া আইনের ভেতরে যে দীর্ঘসূত্রতা, সেটা কাটানোর জন্য গভর্নর ও অর্থসচিব প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সেই ব্যবস্থা নিতে পারেন।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘করোনায় ব্যবসা-বাণিজ্যে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, সেই প্রভাব কাটিয়ে ব্যবসায়ীরা এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। ফলে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণ যথাসময়ে ফেরতও দিতে পারছেন না। এ কারণে ২০২০ সালের পর ২০২১ সালেও ঋণের কিস্তি পরিশোধে কিছুটা ছাড় অব্যাহত রাখা হয়।’

খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ হিসেবে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাইট অফ নীতিমালাও শিথিল করা হয়। এখন থেকে ৩ বছর হলেই মন্দমানের (কু-ঋণ) খেলাপি ঋণ অবলোপন করতে পারবে ব্যাংকগুলো। আগে মন্দ বা কু-ঋণ ৫ বছর না হলে অবলোপন করা যেত না। এ ছাড়া আগে মাত্র ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত খেলাপি ঋণ মামলা ছাড়াই অবলোপন করা যেত; এখন মামলা ছাড়াই অবলোপন করা যাবে ২ লাখ টাকার ঋণও।

গত তিন বছরে বিভিন্ন ছাড়-সুবিধার বাইরে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এর অংশ হিসেবে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, অর্থঋণ আদালত আইন ও দেউলিয়া আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এরই মধ্যে এ সংক্রান্ত আইনগুলোর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। খসড়া আইনে সেখানে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞাসহ বাড়ি-গাড়ি ও সম্পত্তি নিবন্ধন করতে না দেওয়া, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের সদস্য পদে অযোগ্য ঘোষণা ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার অযোগ্য ঘোষণার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া খেলাপি ঋণ বিক্রির জন্য একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরশেন প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অকেজো থাকা দেউলিয়া আইন সংশোধন করতেও খসড়া তৈরি করা হয়েছে। তবে এসব খসড়া আইনের কোনোটিই সংসদে পাস হওয়ার মতো চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়নি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

 

এসবি/এমই