খেলাপি ঋণে আটকা সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা


সাহেব-বাজার ডেস্ক : দেশের অর্থঋণ আদালতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ আদায় সংক্রান্ত মামলার পাহাড় জমেছে। বর্তমানে দেশের ৬০টি তফসিলি ব্যাংক ও ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুই লক্ষাধিক মামলা চলমান রয়েছে। এসব মাললায় আটকে আছে প্রায় সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা। বছরের পর বছর এসব মামলা ঝুলে থাকলেও নিষ্পত্তিতে তেমন গতি নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, মামলাগুলোতে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সংশ্লিষ্টতা থাকায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা কমে যাওয়াসহ তাদের নিয়মিত কার্যক্রমে গতিশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। সেই সঙ্গে দেশের অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ অবস্থায় খেলাপি ঋণ আদায়ে দায়ের করা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সম্প্রতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তিনটি প্রাক-পর্যালোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত অর্থঋণ আদালত স্থাপনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, বিকল্প বিরোধের বিধান প্রয়োগ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে র‌্যাপিড রিকোভারি টিম গঠন এবং প্যানেলভুক্ত আইনজীবীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আনুপাতিক হারে মামলা প্রদানসহ ১১টি প্রস্তাব গৃহীত হয়।

বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় প্রস্তাবগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঋণ মঞ্জুরির ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ প্রজেক্ট প্রোফাইল, গ্রাহকের ইক্যুইটি না থাকা, বন্ধকীকৃত সম্পত্তির মালিকানা সঠিক না হওয়া, প্রয়োজনের তুলনায় অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা কম হওয়া ও বিচারকের অভাব এবং আইনি মতামতের জন্য ব্যাংকের আইনজীবীকে পর্যাপ্ত সময় ও সহায়ক জামানতের পর্যাপ্ত দলিলাদি সরবরাহ করতে না পারায় অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়।

অন্যদিকে বিভিন্ন অনিয়ম ও যথাযথ নিয়মাচার ছাড়া বিতরণ করা ঋণ আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে খেলাপিদের বিরুদ্ধে প্রতি বছরই মামলায় যাচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে প্রতি বছরই অর্থঋণ আদালতে খেলাপি ঋণ আদায়ে করা মামলার পুঞ্জীভূত স্থিতি বাড়ছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ আদায়ের অনেক মামলা অনিষ্পন্ন রয়েছে। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে সম্প্রতি বেশ কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়। এসব প্রস্তাব নিয়ে ব্যাংকার্স সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। খেলাপি ঋণ হ্রাসসহ দেশের অর্থনীতির স্বার্থে প্রস্তাবগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, অর্থঋণ আদালতে ঝুলে থাকা মামলাগুলো যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কারণ অভিজ্ঞ আইনজীবীর অভাবে অনেক সময় মামলাগুলো দীর্ঘায়িত হয়ে পড়ে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যাংকের ঋণ আদায় কার্যক্রম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ৬০টি ব্যাংক ও ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করা মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৫৭ হাজার ২১৫টি। এসব মামলা জড়িত অর্থের পরিমাণ দুই লাখ ২৩ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকগুলোর দুই লাখ ৩৭ হাজার ২৩৮টি মামলায় আটকে আছে দুই লাখ ৯ হাজার ২২৭ কোটি টাকা। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ১৯ হাজার ৯৭৭টি মামলায় আটকে আছে ১৪ হাজার ১২৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মামলার সংখ্যা ছিল ৬৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ছিল এক লাখ ১২ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকগুলোর ৬১ হাজার ৮৬৮টি মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৭ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুই হাজার ৩৭৭ মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা।

জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২০-২৪ এর আইন বিভাগ সংশ্লিষ্ট অবজেকটিভ ৯-৪ (বি)-এর অ্যাকশন প্ল্যান-জি অংশে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মামলাধীন খেলাপি ঋণ নজরদারির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৌশলগত পরিকল্পনার ওই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর গভর্নর ফজলে কবির ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ হ্রাসের লক্ষ্যে মামলাধীন ঋণগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে প্রযোজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।

ওই নির্দেশনার আলোকে চলতি বছরের মার্চে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাক-পর্যালোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার পর্যালোচনা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইন বিভাগ থেকে একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন গতকাল ব্যাংকার্স সভায় উপস্থাপন করা হয়। এতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ আদায়ে করা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে গৃহীত ১১টি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।

আইন বিভাগের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকাভুক্ত বহুসংখ্যক প্যানেল আইনজীবী থাকা সত্ত্বেও দায়েরকৃত মামলাগুলোর বেশিরভাগ এক বা দুজন আইনজীবীর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনজীবী নিয়োগে দক্ষতার চেয়ে আইনজীবীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ফলে মামলার চাপ বেড়ে যাওয়ায় আইনজীবী ধার্য্য তারিখে সময়মতো মামলার শুনানিতে হাজির হতে পারছেন না।

অথবা তার জুনিয়র আইনজীবী দ্বারা মামলার শুনানি করছেন অথবা শুনানি না করে টাইম পিটিশন প্রদান করছেন। এতে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে এবং দুর্বল মনিটারিংয়ের কারণে কাক্সিক্ষত ফলও আসছে না। এ সমস্যা নিরসনকল্পে প্যানেলভুক্ত আইনজীবীদের মাঝে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আনুপাতিক হারে মামলা প্রদান করার প্রস্তাব করা হয়।

অন্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে আছে- দেশের বিভিন্ন স্থানে গুরুত্ব বিবেচনায় পর্যাপ্ত অর্থঋণ আদালত স্থাপনের লক্ষ্যে প্রয়োাজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের লিটিগেশন বিভাগকে আইন বিভাগের মাধ্যমে পত্র প্রেরণ করা; মামলা নিষ্পত্তিতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান প্রয়োগ করা; ঋণ প্রদানের আগে বন্ধকীকৃত সম্পত্তির দলিলাদি যথাযথভাবে যাচাই ও লিগ্যাল ভেটিং করানো এবং ঋণ প্রদানের আগে বন্ধকীকৃত সম্পত্তি অপর কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ধক রয়েছে কিনা তা যথাযথভাবে যাচাই করা; ঋণগ্রহণ করে যেসব গ্রাহক পলাতক রয়েছে বা দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ; নিয়ামাচারবহির্ভূত ঋণ প্রদান প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ; উচ্চতর আদালতের স্থগিতাদেশ ভ্যাকেট বা আপিল দ্রুত নিষ্পত্তি করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট আদালতের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ; ব্যাংক ও আর্থিক গ্রতিষ্ঠানসমূহের চলমান মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে কার্যকর কৌশল নির্ধারণ; খেলাপি ঋণ আদায়ের কার্যক্রমকে গতিশীল করার উদ্দেশে সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে র‌্যাপিড রিকোভারি টি গঠন; ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর চলমান মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সমন্বয়কারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে আদালত, আইনজীবী ও মামলার অপর পক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা, আইনজীবীর নিকট প্রয়োজনীয় দলিলাদি সময়মতো সরবরাহ করা, মামলা চলমান অবস্থায় যৌক্তিক কারণ ব্যতীত টাইম পিটিশন দাখিল না করা, মামলার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী তারিখের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হ্রাসকরণের লক্ষ্যে সেরেস্তা অফিসের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্যানেলভুক্ত আইনজীবীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আনুপাতিক হারে মামলা প্রদান করা।

 

এসবি/এমই