খাদ্য নিরাপত্তায় বোরোতে প্রণোদনা সরকারের


সাহেব-বাজার ডেস্ক : বিশ্বে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে বলে দীর্ঘ দিন ধরে সতর্ক করে আসছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। সম্ভাব্য এ সংকট মোকাবিলায় নানাভাবে ফসল উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে বিভিন্ন দেশ। খাদ্যপণ্যের উৎপাদন বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ সরকারও।

কিন্তু ভালো ফলনেও অনেক খাদ্যপণ্যের দাম কমছে না। এবার সারাদেশে আমনের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে চালের দাম কমেনি। এ অবস্থায় আগাম সতর্কতা হিসেবে আসছে বোরো মৌসুমে উৎপাদন বাড়ানোয় জোর দিচ্ছে সরকার।

এ জন্য চলতি বোরো মৌসুমে ১৭০ কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের। এই প্রণোদনার আওতায় বোরোর আবাদ ও উৎপাদন বাড়াতে ২৭ লাখ কৃষককে বিনামূল্যে দেওয়া হবে বীজ ও সার।

তিনটি শ্রেণিতে মিলবে এসব প্রণোদনা। হাইব্রিড ধানের উৎপাদন বাড়াতে প্রায় ৮২ কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়া হবে। এ শ্রেণিতে ১৫ লাখ কৃষককে বিনামূল্যে ২ কেজি করে ধানের বীজ দেওয়া হবে। উচ্চফলনশীল জাতের উৎপাদন বাড়াতে বরাদ্দ রয়েছে ৭৩ কোটি টাকার প্রণোদনা। এর আওতায় ১২ লাখ কৃষককে বিনামূল্যে এক বিঘা জমির জন্য ৫ কেজি বীজ, ১০ কেজি ডিএপি ও ১০ কেজি এমওপি সার দেওয়া হবে। এ ছাড়া কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের সুবিধার্থে একটি মাঠে একই সময়ে ধান লাগানো ও কাটার জন্য ১৫ কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় ৬১টি জেলায় ১১০টি ব্লক বা প্রদর্শনী স্থাপিত হবে। প্রতিটি প্রদর্শনী হবে ৫০ একর জমিতে, খরচ হবে ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

জানা যায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত বাজেট কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাত থেকে এ প্রণোদনা দেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে এসব প্রণোদনা কার্যক্রম চলমান আছে। ইতোমধ্যে গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ প্রণোদনা বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। এবার উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ধানের আবাদ বাড়ানো হচ্ছে। নতুন করে ৫৩ হাজার হেক্টর জমি বোরো চাষের আওতায় আনা হয়েছে। হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যার আশঙ্কা বিবেচনায় রেখে আগাম জাতের ধান উৎপাদনে জোর দেওয়া হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বেনজীর আলম জানান, এ বছর ৪৯ লাখ ৭৭ হাজার ৬শ হেক্টরের জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড ধানের চাষ হবে ১৫ লাখ হেক্টর জমিতে। উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ধান আবাদ হবে ৪৩ লাখ ৭৩ হাজার ৮৩০ হেক্টর জমিতে। স্থানীয় জাতের ধান চাষ হবে ২৫ হেক্টর জমিতে। গত বছর বোরো আবাদ হয়েছিল ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে। গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় ৯৩ হাজার ৮৪০ হেক্টর জমিতে বেশি বোরো ধান আবাদ হবে। এ বছর বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন।

এদিকে বোরো মৌসুম সামনে রেখে বাড়ানো হয়েছে সার ও ডিজেলের পর্যাপ্ত মজুদ। বোরোতে সেচ কাজে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ রাখতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত চলে বোরো আবাদ। এ সময় সেচের জন্য বিদ্যুতের ব্যাপক চাহিদা থাকে। সরকার এ সময়ে প্রয়োজনে শহরে লোডশেডিং করে সেচের জন্য গ্রামে বিদ্যুৎ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই সঙ্গে ডিজেল ও সার পাচার রোধে বিজিবিসহ সীমান্ত এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে বিশেষ টাস্কফোর্স। বোরো উৎপাদনে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সংস্থা একসঙ্গে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কাজ করার বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে খোলা হচ্ছে মনিটরিং সেল। মাঠ ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হচ্ছে। মাঠ তদারকির জন্য কর্মকর্তাদের তালিকা করার প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে ।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ) বলাই কৃষ্ণ হাজরা বলেন, সরকার এ বছর কৃষি উৎপাদন বাড়াতে প্রণোদনা বাড়িয়েছে। বোরো মৌসুমে ২৭ লাখ কৃষকের মধ্যে সার ও বীজ বিতরণ করা হবে; গত বছর এই প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল ২১ লাখ কৃষককে।

গত ৬ ডিসেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভা হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয়, সেচ মৌসুমে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতকরণ করা হবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির পরিমাণ ছিল ৬৯ লাখ ১৫ হাজার ১০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে কৃষি খাতে ডিজেল ব্যবহার হয় ২৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০২২-২০২৩ সালের কৃষিসেচ মৌসুমে ডিজেলের চাহিদা রয়েছে (নভেম্বর ২০২২ থেকে মে ২০২৩) ১৩ লাখ ৯৭ হাজার ১২৯ মেট্রিক টন। ও লুব অয়েলের চাহিদা ৫৪ হাজার ৯৭১ মেট্রিক টন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, বছরে দেশে ২৬ লাখ টন ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত বোরো মৌসুমে প্রয়োজন হয় প্রায় ১৪ লাখ টন। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয় ৩ লাখ ৯৬ হাজার টন। ফেব্রুয়ারিতে ৪ লাখ ১৫ হাজার টন, আর মার্চ মাসে প্রয়োজন হয় প্রায় আড়াই লাখ টন। ইতোমধ্যে সরকার বোরো মৌসুমের জন্য ১৭ লাখ টন সার মজুদ করেছে।

বিশ্বব্যাংকের কৃষিবিষয়ক পরামর্শক কৃষিবিদ ড. শহীদুল ইসলাম জানান, চালের মূল্য বৃদ্ধির লাগাম টানতে এবং বৈশ্বিক যে মহামন্দার খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা মোকাবিলার জন্য সরকার আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকারের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদ আছে এবং মাঠেও রয়েছে প্রচুর খাদ্যশস্য। বিশ্বের অন্যান্য দেশে দুর্ভিক্ষ হলেও বাংলাদেশে তা হবে না। সরকারের এই প্রণোদনা এবং গৃহীত পদক্ষেপ সময় উপযোগী এবং কৃষকদের উৎসাহ জোগাবে।

 

এসবি/এমই